13/08/2026
বাংলাদেশের রাজনীতির ‘শান্ত মানুষ’: রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন মির্জা ফখরুল
====================
দ্য ডেইলি ওয়াদা
১৩ আগস্ট ২০২৬
অনুবাদিত সারমর্ম
====================
বাংলাদেশের উচ্চকণ্ঠ, সংঘাতপূর্ণ ও প্রায়ই অশালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবরই তুলনামূলকভাবে শান্ত, সংযত এবং ভদ্র রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে আলাদা করে রেখেছেন।
বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাঁর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। তিনি হবেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি এবং যার বয়স হবে ৭৮ বছর।
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়, যা তিনি কখনো রাজনৈতিকভাবে বাজারজাত করেননি
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রচারাভিযানের একটি ভিডিওতে ফখরুল ইসলাম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য মানুষকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি শেখ হাসিনার শাসনে দেশ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার আশঙ্কার কথা বলেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে নিজের লড়াইয়ের কথাও উল্লেখ করেন।
অনেক বাংলাদেশির কাছে তখন সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য ছিল — মির্জা ফখরুল নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় বৈধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে এক ধরনের মালিকানার লড়াই তৈরি হয়েছিল।
বিরোধীদের অনেককেই ১৯৭১-এর ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা বা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভূমিকাও খাটো করার চেষ্টা হয়েছে।
ফলে ফখরুলের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ যে ব্যাপকভাবে অজানা ছিল, তা খুব আশ্চর্যের নয়। তবে ফখরুল সাহেব নিজেও তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে কখনো রাজনৈতিক পদক হিসেবে প্রদর্শন করেননি।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সেই ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেননি। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিস্তারিত জানান।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করা, পুলিশ অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ, পাকিস্তানি সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে একটি সেতু ভেঙে দেওয়া, নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও অস্থায়ী অস্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন এবং স্থানীয় প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর নাগর নদী পার হয়ে ভারতে যাওয়ার কথা তিনি বলেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে তিনি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণশিবির সংগঠিত করেন; এর একটি শিবির ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহায়তায় পরিচালিত হয়েছিল।
এই জীবনীকে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের সহজ ছকে ফেলা কঠিন।
তিনি মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু সেটি নিয়ে প্রচার করেননি; বামপন্থী রাজনীতি দিয়ে শুরু করলেও পরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন; আবার বিএনপির মতো জাতীয়তাবাদী দলে থেকেও তিনি রবীন্দ্রনাথপ্রেমী, বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যনির্ভর ও উদারপন্থী।
ফলে এক পক্ষ তাঁকে যথেষ্ট ‘দেশপ্রেমিক’ মনে করেনি, আর অন্য পক্ষ তাঁকে যথেষ্ট ‘ইসলামপন্থী’ মনে করেনি।
‘ভদ্রলোক’ — কিন্তু নীরব বা দুর্বল নন
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে ফখরুল দীর্ঘদিন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের নির্বাসনের সময় দলের প্রধান প্রকাশ্য মুখ ছিলেন।
এই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে তিনি প্রচুর ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্রূপ সহ্য করেছেন। কিন্তু তাঁর সাধারণ প্রতিক্রিয়া ছিল ক্লান্ত-শান্ত মুখভঙ্গি, তারপর আরেকটি সংবাদ সম্মেলন।
২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও ফখরুলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ওবায়দুল কাদেরও তাঁকে ‘ভদ্রলোক’ ও ‘ভালো মানুষ’ বলেছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে তিনি বলেছিলেন, ফখরুলকে কখনো গালাগাল করতে শোনেননি।
এটি তুচ্ছ বিষয় নয়। হাসিনা আমলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা অত্যন্ত অশালীন হয়ে উঠেছিল।
সেই পরিবেশে পুলিশ বিএনপির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে, নেতাকর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন, সমাবেশে কাঁদানে গ্যাস ও গ্রেপ্তার হয়েছে — আর ফখরুল নিয়মিত নয়া পল্টনে হাজির হয়েছেন।
তাঁর সাদা পাঞ্জাবি বা সাদা শার্ট, চশমা এবং পাকাচুল যেন তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতিরই প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন বড় বড় নাটকীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি তৈরি হয়েছে নিয়মিত উপস্থিত থাকার মাধ্যমে — নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
এর মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার বিএনপির সমাবেশ সহিংসতায় পরিণত হওয়ার পর পুলিশ তাঁর বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় ১০০-তে পৌঁছেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়, যখন বিএনপির অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে যান।
২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয় এবং দল নির্বাচন বর্জনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও ফখরুল কারাগারে ছিলেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্টদায়ক ঘটনাগুলোর একটি ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম গুরুতর অসুস্থ হয়ে অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
রাত প্রায় তিনটার দিকে পুলিশ ফখরুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে নিয়ে যায়। পরে তিনি লিখেছিলেন — স্ত্রী যখন অস্ত্রোপচার করাচ্ছিলেন, তখন তিনি কারাগারে ছিলেন।
তাঁর মেয়ে ঢাকায় ছুটে আসেন, আর কারাগারে বসে ফখরুল শুধু খবরের অপেক্ষা করতে পারেন। তবুও তিনি এসব ঘটনাকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বানাননি।
বরং বহু বছর ধরে তিনি ‘আমাদের দল’, ‘আমাদের মানুষ’, ‘আমাদের দেশ’ — এই বহুবচনেই কথা বলেছেন; এমন একটি পেশায় যেখানে অনেক রাজনীতিক প্রথম পুরুষ একবচনেই কথা বলতে অভ্যস্ত।
পারিবারিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
ফখরুল সাহেব ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে এমন একটি পরিবারে জন্ম নেন, যেখানে রাজনীতি ছিল প্রায় পারিবারিক পেশা।
তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও সংসদ সদস্য। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ সংসদের স্পিকার এবং পরে মন্ত্রী হন।
আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য যুব শিবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর বাবার ১৯৭১ সালের ভূমিকা অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। আওয়ামী লীগসহ অন্যরা অভিযোগ করেছে, মুসলিম লীগ-ঘনিষ্ঠ রুহুল আমিন পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ফখরুল ইসলাম এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তাঁর বাবা যুদ্ধের প্রায় পুরো সময় ভারতেই ছিলেন। এই ধরনের বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন — যেখানে মৃত ব্যক্তিদেরও সমকালীন রাজনৈতিক লড়াইয়ে টেনে আনা হয়।
ফখরুলের নিজের প্রাথমিক রাজনীতি বিএনপির চেয়ে অনেক বেশি বামপন্থী ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন এবং ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন।
স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়ান, সরকারি চাকরি করেন এবং জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বের সময় উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান।
সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে দলের নেতৃত্বে চলে আসেন।
২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর জাতীয় পর্যায়ের উত্থান শুরু হয়। ২০০৯ সালে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পাঁচ বছর পরে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন।
অর্থাৎ তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি মন্ত্রণালয় পরিচালনার চেয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সঙ্গেই বেশি জড়িত ছিল।
বামপন্থী অতীত থেকে উদার গণতন্ত্রে
ফখরুল নিজেকে একজন উদার গণতন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, একসময় তিনি বামপন্থী বিপ্লবী রাজনীতি করতেন, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে যে অগ্রগতি কেবল গণতন্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব।
তবে তাঁর পুরোনো বামপন্থী মানসিকতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সার্বজনীন মানবতাবোধ, ধর্মীয় রাজনীতি সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ, বহুত্ববাদ এবং সাংস্কৃতিক উদারতার কারণে বিএনপির বৃহত্তর আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের রক্ষণশীল অংশের কাছেও তিনি কখনো কখনো অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছেন।
জামায়াত, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ১৯৭১
ফখরুল সাহেবকে ‘ভদ্রলোক’ বলা হলেও তিনি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নন। তাঁর নিজস্ব আদর্শগত পছন্দ-অপছন্দ রয়েছে, এবং শেখ হাসিনার পতনের পর প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে সেগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কিছু তরুণ রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন ১৯৭১-এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছিল, তখন ফখরুল বারবার মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বের কথা বলেছেন।
২০২৫ সালের মার্চে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞে সহায়তাকারীরা আবারও জোরালোভাবে কথা বলছে এবং সতর্ক করেছিলেন যে ১৯৭১-এর গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে এমন ভান করা যাবে না।
ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান নিয়ে তাঁর অস্বস্তির কারণে কেউ কেউ তাঁকে এমন এক পুরোনো বামপন্থী হিসেবে দেখেছেন, যিনি সর্বত্র প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দেখতে পান।
অন্যদিকে, তিনি বাংলাদেশের বাস্তব রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কেও বাস্তববাদী।
২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিএনপির লক্ষ্য নয় এবং শব্দটিও বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে খুব মানানসই নয়; বরং তিনি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের কথা বলতে চান।
এটি ছিল এমন এক রাজনীতিকের সতর্ক ভাষা, যার ব্যক্তিগত সামাজিক অবস্থান তাঁর দলের অনেক ভোটারের তুলনায় স্পষ্টতই বেশি উদার।
তবে সবসময় সেই সতর্কতা বজায় থাকেনি।
চলতি আগস্টে রংপুরে ফখরুল মন্তব্য করেন, অঞ্চলটি পিছিয়ে রয়েছে কারণ সেখানকার মানুষ বারবার বিএনপির পরিবর্তে অন্য দল — প্রথমে জাতীয় পার্টি, পরে জামায়াতকে ভোট দিয়েছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে তারা উন্নয়ন আশা করে কীভাবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এর প্রতিবাদ করেন এবং তাঁকে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে রংপুরে মিছিল করে। এই সমালোচনা যৌক্তিক ছিল — দলীয় ভোটের সঙ্গে উন্নয়নকে যুক্ত করা কোনো মন্ত্রীর জন্যই অস্বস্তিকর যুক্তি, বিশেষ করে এমন একজনের জন্য যিনি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হতে চলেছেন।
বিএনপি-জামায়াতের তীব্র প্রতিযোগিতার সময় আরও কিছু ঘটনায় সেই শান্ত ‘সাবেক শিক্ষক’কে একজন নির্বাচনী প্রার্থীর মতোই শোনাতে দেখা গেছে।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় গণতান্ত্রিক ন্যায্যতার কথা শান্তভাবে বলা সহজ; কিন্তু নিজের দল যখন সরকার পরিচালনা করে, তখন একই নীতি মেনে চলা কঠিন।
ভারত নিয়ে তাঁর অবস্থান
জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীদের আরেকটি অভিযোগ হলো ভারত। নয়াদিল্লির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে ফখরুলের অবস্থানের কারণে তাঁকে কখনো ভারতের প্রতি নরম, এমনকি ‘র’-এর এজেন্ট বলেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই অভিযোগ কিছুটা সাংঘর্ষিক। ফখরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আওয়ামী লীগ-বহির্ভূত বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষও তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল এবং যুদ্ধ সংগঠিত করার সময় তাদের মতো কর্মীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
তিনি এসব অভিযোগের জবাব দিয়েছেন, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে লাভজনক হতে পারে এমন নাটকীয় ভারতবিরোধিতা গ্রহণ করেননি।
কোনো নির্দিষ্ট নীতির চেয়েও এই বৈশিষ্ট্যটি তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বেশি ভালোভাবে তুলে ধরে। ফখরুল ইসলাম সাধারণত কোনো বিতর্কে ঘরের সবাইকে হারিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যান না।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে
জানুয়ারিতে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারণার সময় ফখরুল সাহেন বলেন, তাঁর পরিবার রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য পূর্বপুরুষের জমি বিক্রি করেছে, রাজনীতি করে ধনী হয়নি।
তিনি ভোটারদের বলেন, তাঁদের দেওয়া আস্থার সঙ্গে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।
রাজনীতিবিদদের এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত সাংবাদিকদের সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। কিন্তু ফখরুলের ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের আর্থিক বিতর্কের অনুপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
তাঁর ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতার দাবির চেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সেই দাবিকে খণ্ডন করার মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের অভাবই তাঁর ভাবমূর্তির ভিত্তি তৈরি করেছে।
এখন তাঁকে দলীয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির পদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত।
একই সঙ্গে ফখরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমানের জন্যও একটি বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে।
দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়া দীর্ঘদিনের মহাসচিবকে সম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়া এবং একই সঙ্গে দলের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়া হচ্ছে।
তবে এই পদটি ফখরুলের নিজের জন্যও উপযুক্ত হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গুণগুলোর একটি হলো সংযম — যে গুণের জন্য তাঁকে কখনো কখনো উপহাসও করা হয়েছে।
শেষ কথা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন নীরব সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী।
তিনি ১৯৬৯-এর রাজপথে ছিলেন, ১৯৭১-এ প্রতিরোধ সংগঠিত করেছেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন এবং হাসিনা আমলে সমাবেশ, দলীয় কার্যালয়, আদালত ও কারাগারের মধ্যে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন।
হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি আবার মন্ত্রী হিসেবে ফিরে এসেছেন — কিন্তু তাঁর কথা বলার ধরন রয়ে গেছে সেই পুরোনো অর্থনীতির শিক্ষকের মতোই মাপা ও শান্ত।
২০১৮ সালের সেই নির্বাচনী ভিডিওটিও এখন নতুন অর্থ পায়। গণতন্ত্রের কথা বলা সেই বৃদ্ধ রাজনীতিবিদ এমন এক মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছিলেন, যেখানে তাঁর নিজের ভূমিকা তিনি কখনো তেমনভাবে প্রচার করেননি।
এমন একটি দেশে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকে দীর্ঘদিন দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছিল এবং পরবর্তী প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানের পর কে ইতিহাসের মালিক — তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেখানে নিজের সত্যিকারের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সেটিকে রাজনৈতিকভাবে বাজারজাত না করা ফখরুলের একটি বিরল বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের, বেশি কর্তৃত্বশীল, বেশি উদ্ধৃতিযোগ্য এবং অবশ্যই বেশি উচ্চকণ্ঠ রাজনীতিক এসেছে।
কিন্তু কয়েক দশক জনজীবনে থেকে নিজের রাজনৈতিক ভাষায় অশালীনতাকে জায়গা না দেওয়া প্রবীণ রাজনীতিক খুব বেশি আসেননি।
বাংলাদেশের রাজনীতির সেই ‘ভদ্রলোক’ এখন সম্ভবত দেশের রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক জীবনের পরও এই উপাধিটি তাঁর ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিদ্রূপাত্মক শোনাচ্ছে না — এটাই সম্ভবত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
====================================
বি:দ্র: মূল ইংরেজি লেখাটির সংযুক্তি পাবেন প্রথম মন্তব্যে।