Upalabdhi Foundation

Upalabdhi Foundation “উপলব্ধি” সমাজ সেবা মূলক একটি অরাজনৈতিক মানবিক প্রতিষ্ঠান।

‘উপলব্ধি’ ও আমি।
২০১০ সালের কথা। তখন আমি পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে কর্মরত ছিলাম। চট্টগ্রাম সদরঘাটের পাশেই আমার অফিস। জিইসি মোড়ের কাছাকাছি এক আবাসিক এলাকায় আমার বাসা। বটতলী পুরানো রেলওয়ে স্টেশনের পাশ দিয়ে অফিসে আমার যাওয়া আসা। মাঝেমধ্যে সেখানে কিছু মেয়েশিশুকে আমি ঘুরাঘুরি করতে দেখতাম। কিছুদিন পর দেখতাম, তারা আর নেই। আবার নতুন শিশুর মুখ দেখতাম, তারাও একদিন হারিয়ে যেত। আমার জানতে ইচ্ছা হলো এই শিশুরা কোথা

থেকে আসে আবার কোথায় একদিন হারিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারলাম - যে মেয়েশিশু অজানা কোন কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হারিয়ে যায় অথবা যারা সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে ফুটপাত-রাস্তায় আশ্রয় নেয় একটি দুষ্ট চক্র বিভিন্ন কৌশলে নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে এখানে নিয়ে আসে। তারপর একদিন অন্ধ-গলিতে বিক্রি করে দেয় অথবা বাধ্য করে নানাবিধ অসামাজিক কাজে যুক্ত হতে। আমি অবাক বিস্ময় অন্তহীন মনকষ্ট নিয়ে নীরবে সে-দিন একাকী কেঁদেছিলাম। মনেমনে ভেবেছিলাম কত মেয়েশিশু আমার চোখের সামনে হারিয়ে গেল কিছুই আমি করতে পারলাম না, শুধু নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে দেখলাম। আমার মানবিকতা, আমার ধর্ম বিশ্বাস আমাকে প্রশ্নবিধ করলো! নিজেকে মানুষ ভাবতে নিজের কাছে কষ্ট হলো। নিজ হাতে চোখ মুছে বুঝাতে চেষ্টা করলাম নিজেকে, কান্নার কোন দাম নেই এই পৃথিবীতে। আমি যদি এদের পাশে দাঁড়াতে পারি, এদের জন্যে কিছু করতে পারি, এদেরকে এ-পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি তবে সে-টিই হবে এদের জন্যে আমার কান্নার চেয়ে অধিক দামী। কিন্তু কি ভাবে এদের পাশে দাঁড়াবো, কি করলে এ পথ বন্ধ হবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। এভাবে ভাবতে ভাবতে বেশ অনেকটা সময় চলে গেলো। আরও অনেক নতুন শিশু আমার চোখের সামনে হারিয়ে গেলো। চোখের সামনে এভাবে হারিয়ে যাওয়ার দুঃসহ স্মৃতি, কিছু করতে না পারার অসহ্য যন্ত্রণা আমার মধ্যে বেদনাবোধ তীব্র হতে লাগলো। এই বেদনাবোধ একদিন নতুন চিন্তার জন্ম দিলো। সেই চিন্তা একদিন আমার মাঝে বিশ্বাস জন্মাল - আমি যদি এমন একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি, কোন শিশু অজানা কোন কারণে রাস্তায় বেরিয়ে আসার পর দুষ্ট চক্রের হাতে পড়ার আগে তাকে যদি এই প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসতে পারি তাহলে তাকে নিশ্চিত অবাঞ্ছিত অন্ধকার জীবনের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। আস্তে-আস্তে একদিন তাকে জীবনের মূল স্রোতধারায় ফিরে আনা যাবে। আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই উপলব্ধি আর বিশ্বাস আমাকে এ পথে নিয়ে এসেছে। আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে হারিয়ে যাওয়া অথবা নিঃস্ব স্বজনহারা অসহায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতে। মূলত এই ইচ্ছাকে হৃদয় ধারণ করে ২০১০ সালের শেষের দিকে আমি তাদেরকে নিয়ে কাজে শুরু করি এবং 'উপলব্ধি' নামক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলি। কিন্তু নানাবিধ জটিল আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আমাকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে হয় ২০১২ সালের শেষের দিকে।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি বিশ্বাস করি নারীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা প্রতিটা পুরুষের নৈতিক দায়িত্ব। নারীর অমর্যাদা, অসম্মান মানবজাতির অপমান। নারী হচ্ছে মানব জাতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, উৎস স্থল। নারী হচ্ছে মানব জাতির কারিগর, নির্মাতা, মা। প্রতিটা মানুষের প্রাণের প্রথম উন্মেষ ঘটে কোন না কোন নারীর গর্ভে। তাঁরই খাদ্য খেয়ে মানবশিশুকে বেড়ে উঠতে হয়, তাঁর অক্সিজেন শেয়ার করে তাকে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে হয়। তাঁর ইচ্ছা, ভালোবাসা আর হৃদয়ের গভীর আকুতি ছাড়া এ পৃথিবীতে আমাদের আসা সম্ভব ছিলোনা। তাঁরই ভালবাসায় সিক্ত হয়েই আমরা এ পৃথিবীতে প্রথম পা রাখি। চোখ মেলে ঐশ্বর্যময় এ নান্দনিক সুন্দর পৃথিবীকে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখি। কোন কিছুর বিনিময় এ ঋণ শোধ হবার নয়। এ ঋণ কোন দিন শুধিবার নয়। তাই আর কোন কারণে না হলেও অন্তত: এ ঋণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে শ্রদ্ধা আর সম্মানের সাথে প্রতিটা পুরুষের হৃদয়ে নারীর জন্যে নির্মল পবিত্র আসন থাকা উচিৎ। চিন্তা-চেতনায় কাজে-কর্মে তাঁকে সেই আসনে বসানো উচিৎ। তাঁর অসম্মান, তাঁর অমর্যাদা পুরুষের হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হওয়া উচিৎ। আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই অনুভূতি আর নিজ চোখে দেখা নারীর প্রতি নির্মম অমানবিক বর্ণনাতীত অমর্যাদা আমার হৃদয়ে যে বেদনাবোধ সৃষ্টি হয়েছিলো তা একদিন আমাকে জীবন সম্পর্কে নতুন ভাবে ভাবতে, নতুন ভাবে চিন্তা করতে, নতুন ভাবে জীবনকে উপলব্ধি করতে শিখিয়ে গেছে।

আমার এই বিশ্বাস আর অনুভূতি নীরবে আমার মাঝে ভিন্ন এক ভালবাসা, অন্যরকম এক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করেছিলো। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে, সেই ভালোবাসার টানে ২০১০ সাল থেকে পর থেকে চট্টগ্রাম শহরের অলি-গলি, বস্তি, ফুটপাত-রাস্তায় আমি অনেক হেঁটেছি। কখনো দিনে কখনো বা রাতে একা একা ঘুরেছি, অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী আমি। হৃদয় ছিড়ে যাওয়া চোখের জলে ভিজে যাওয়া অনেক করুণ অমানবিক বর্ণনাতীত দৃশ্য আমি নিজ চোখে দেখেছি। নারী তথা মায়ের প্রতি অমর্যাদা, অবহেলা আর অপমান আমাকে হতবাক বিস্মিত করেছে। সন্তান সম্ভবা মাকে আমি রাতের পর রাত খোলা আকাশের নীচে থাকতে দেখেছি। অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল মেয়েকে আমি ফুটপাত-রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি মা হবার অপেক্ষায়। আলো ঝলমল বৈভবে ভরা রঙিন এই শহরের সিনেমা প্যালেসের পাশের ফুটপাতে এক সন্তান সম্ভবা মাকে আমি কষ্ট আর বেদনায় কাঁদতে দেখেছি। কথা বলতে গেলে অজানা এক ভয়ে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো। রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃণায় শব্দহীন প্রতিবাদ সেদিন ছিলো তার অসহায়তা প্রকাশের একমাত্র হাতিয়ার। আমি অবাক বিস্ময়ে অশ্রুসিক্ত চোখে নবজাতক শিশুকে সীমাহীন ঐশ্বর্যময় এই পৃথিবীতে রাস্তায় ভূমিষ্ট হতে দেখেছি। মাকে নষ্ট মেয়ে বলে ধিক্কার দিতে শুনেছি কিন্তু তার পাশে দাঁড়াতে আমি খুব কম মানুষকে দেখেছি। এমনকি সন্তানের জন্মদাতা পুরুষটিকে আমি কখনো দায়িত্ব পালনের অক্ষমতার জন্যে লজ্জিত হতে দেখিনি।

অমানবিকতার বর্ণনাতীত নির্মম কাহিনী এখানেই শেষ নয়, আমি অনেক মাকে নবজাতক সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে একাকী বিনিদ্রায় রাতের পর রাত রাস্তায় থাকতে দেখেছি। সামান্য অসতর্কতার কারণে আঁকড়ে থাকার শেষ সম্বল হৃদয়ের ধন সন্তানকে আমি চুরি হয়ে যেতে দেখেছি। সন্তানহারা মাকে আমি পাগলের ন্যায় ছোটাছুটি করতে দেখেছি, বুকফাঁটা গগনবিদারী আর্তচিৎকারে মায়ের করুণ আকুতি আমি শুনেছি, অসহায় মায়ের অশ্রুসিক্ত নিষ্ফল ফরিয়াদ আমি দেখেছি। নানান মানুষের নানান তীর্যক মন্তব্য আমি শুনেছি কিন্তু খুব কম মানুষকে দেখেছি তার পাশে দাঁড়িয়ে তার হয়ে দু'টি কথা বলতে। নারী অধিকার সংরক্ষণবাদী অনেক সংগঠনের নেতা-নেত্রীকে অনেক বেফাঁস কথা বলতে শুনেছি। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষকেও আমি নিঃশব্দে এ দৃশ্য দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখেছি। ভাবখানা এমন, এ বিষয়গুলো ধর্মের চৌহদ্দির বাইরে। তাই এ নিয়ে আমরা ভাবতে চাইনা, সময় নষ্ট করতে চাইনা। আমরা ধরে নিয়েছি এরা নষ্ট মেয়ে, এরা সোৎসাহে এ পথ বেছে নিয়েছে। তাই সব দ্বায়ভার তাকেই বইতে হবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এমন অনেক ঘটনার গভীরে গিয়ে দেখেছি প্রত্যেকটা ঘটনা দিবালোকের মত পরিষ্কার, কোন না কোন মানুষ নামধারী মানুষখেকো পুরুষ তাদেরকে বাধ্য করেছে এ পথে আসতে, এ পথে নামতে। কিন্তু সব দোষ আজ নন্দ ঘোষ।


হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা বিহীন ভাসমান মেয়েশিশুদের নির্মম জীবন কাহিনী ও তাদের শেষ পরিণতি আমার কাছে মনে হয়েছে সরাসরি নারী তথা মায়ের প্রতি অসম্মান। তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে সরে আসা, স্বার্থপরের মতো আচরণ করা। আমার ভেতরের মানবিক সত্তা, আমার মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, আমার মেয়ের প্রতি আমার ভালবাসা, নারী প্রতি আমার দায়বদ্ধতা, আমার ধর্ম, আমার বিশ্বাস ধীরে ধীরে এ পথে আমাকে নিয়ে এসেছে, এ কাজ করতে সাহস জুগিয়েছে। এই অসহায় মেয়েশিশুদের কষ্টের স্মৃতি তাই আর কোনদিন আমি মুছে ফেলতে পারিনি। কোথায় যেন সব সময় একটা নাড়ীর টান অনুভব করতাম। অজানা ভালোবাসার এক তীব্র আকুতি আমাকে প্রায়ই আবেগ আপ্লুত করে ফেলতো। আমার সব তনুমন তাদেরকে ঘিরে অপার্থিব এক অজানা বিশ্বাস ও সাহসে বলীয়ান হয়ে উঠতো। যে মেয়ে শিশুটা আজ অজানা কোন কারণে রাস্তায় ঠাই নিয়েছে, বাধ্য হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে সেতো একদিন আমার মেয়ের মতো বুক ভরা আশা নিয়ে বেড়ে উঠার স্বপ্ন দেখতো। মানুষের মুখোশ পরা কিছু অমানুষ তার সেই অধিকার কেঁড়ে নিয়েছে, তার সেই স্বপ্নিল স্বপ্নকে দু'পায় দলে পথের পাশে ফেলে যাচ্ছে। আমি সেদৃশ্য দেখছি আর ভদ্রলোক সেজে নীরবে পথ চলছি, আনন্দে দিন পার করছি, ধর্মীয় অনুশাসনও মেনে চলছি! জীবনের হিসাব কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না, কোথায় যেন গোঁজামিল থেকেই যাচ্ছে, অপরাধ-বোধ কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না আমার। নিজের কাছে নিজেকে খুব অসহায় ও অপরাধী মনে হতে লাগলো। যতবার এই শিশুদের কথা ভাবতাম, মনের অজান্তে ততবার আমার মেয়ের ছবি ভেসে উঠতো হৃদয় কোণে। আমি তখন বাবা, দুই মেয়ে আমার। মেয়েদের উষ্ণ স্পর্শ, তাদের ভালোবাসা, তাদের মুখে বাবা ডাক আমার কাছে তখন এ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী। সারাদিন অপেক্ষায় থাকতাম অফিসে তাদের সান্নিধ্যের অপার্থিব আনন্দের মোহে। বাসায় ফিরে আসার জন্য মন ব্যকুল হয়ে উঠতো, এ ব্যাকুলতা বুঝতে হলে বোধহয় নিজেকে বাবা হতে হয়। বাসায় এসে বাবার আসনে নিজেকে বসিয়ে এই শিশুদের বাবার কথা ভাবতে গিয়ে বহুবার আমি মনের অজান্তে কেঁদে ফেলেছি। আমার কাছে মনে হতো, আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যে-ভাবে স্বপ্ন দেখছি, আদর করছি তাদের বাবারাও একদিন আমার মতো তাদেরকে আদর করতো, ভালবাসতো, তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। বাবা-মেয়ের সেই অধিকার, সেই ভালবাসা, সেই স্বপ্নিল রঙিন স্বপ্ন তাদের কাছ থেকে আজ আমার সমাজ কেঁড়ে নিয়েছে। যতবার আমি এই শিশুদের ভাবতে গিয়েছি ততবার মনে অজান্তে আমি আমার মেয়েকে অনুভব করেছি। হৃদয়ের গভীরে কল্পনায় আমি আমার মেয়ের পাশে এই শিশুদের বসিয়েছি। অনুভব করতে চেষ্টা করেছি তাদেরকে, তাদের হৃদয়ের আকুতিকে, তাদের অব্যক্ত কথাগুলোকে। আমার কাছে বাস্তবতা আর কল্পনা একি মনে হয়েছে। কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝে পার্থক্য আমি খুঁজে পাইনি। এই শিশুদের উষ্ণ স্পর্শ আমি অনুভব করেছি। আমার মনে হয়েছে তারা বলছে, আমি স্পষ্ট শুনছি 'আরও কাছে এসে হাত ধরো, মানুষখেকো হিংস্র জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষা করো, আমরা তো তোমার মেয়ে, শুধু জন্মদাতা হলেই বাবা হওয়া যায় না, বাবার মতো আগলে রাখতে পারলে, ভালবাসতে পারলে-ও বাবা হওয়া যায়'। তাদের এই অব্যক্ত কথা গুলো আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে হারিয়ে যাওয়া অথবা রাস্তায় থাকা নিঃস্ব মেয়েশিশুদের নিয়ে কাজ করতে। আমি মনেমনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই শিশুদের আমি আমার মেয়ের মতো ভালবাসবো, পথ থেকে তুলে নিয়ে নিরাপদে রাখবো, ভাল মানুষ হিসেবে বড় হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেব। স্বাদ ছিল অনেক, সাধ্য ছিল কম। তাই বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে অজানা অচেনা দীর্ঘ এ পিছল পথ চলতে হয়েছে অনেকটা একা একা আমাকে। তবে এ কথা সত্য, এই পথশিশুদের আমি নিজ সন্তানের মতো ভালবাসতে পেরেছিলাম। পেরেছিলাম বলেই আমার রক্তের মধ্যে এই শিশুদের চিৎকার আমি নিদ্রাহীন শুনতে পেতাম।

এই শিশুদের ভালোবাসার দাবী মিটাতে গিয়ে বহুবার আমি জীবনকে নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখেছি, খুব কাছ থেকে জীবনকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। একবার একুশের বই মেলায় গিয়েছিলাম তাদেরকে নিয়ে। কথা দিয়েছিলাম পছন্দের বই কিনে দেবো বলে। মেলায় ঘুরে ঘুরে বই কিনছিলাম। তারা আমাকে বাবা বলে ডাকছিলো, চারিদিকে বইয়ের দোকানে ছুটাছুটি করছিলো, বই কিনে আবার আমার কাছে ফিরে আসছিলো। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো আর মনেমনে হয়তোবা ভাবছিলো এক বাবার এতগুলো সন্তান, তা হয় কি করে! সে-এক ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন অনুভূতি। যা শুধু অনুভবের, প্রকাশের নয়। হঠাৎ অজানা-অচেনা পরিপাটি পোশাক পরা এক মেয়ে এসে জানতে চাইলো আমার কাছে, সে-কি একবার বাবা বলে আমাকে ডাকতে পারে? আমি অবাক বিস্ময় তাকিয়ে দেখলাম চোখ দু'টি তার বৃষ্টি ভরা মেঘের মতো জল ছলছল করছে, কণ্ঠ ভারী হয়ে গেছে। কথার গভীরে না গিয়ে বললাম, কেন না মা! কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কেঁদেছিলো সে। বাবার জন্যে তিলেতিলে জমিয়ে রাখা তার নির্মল স্নিগ্ধ ভালোবাসায় সে-দিন সে সিক্ত করেছিলো আমায়। এমন অনেক ঘটনার মুখোমুখি প্রায়ই আমাকে হতে হয়। বাবা যে কত নির্ভরতার, হৃদয়ের কত গভীরের চাওয়া বহুবার আমি বহুভাবে বুঝেছি তা। নির্জলা নিঃস্বার্থ ভালবাসা সে-যে কত প্রশান্তির, কত পরিতৃপ্তির, কতটা হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে তা আমি বুঝেছি এই পথশিশুদের ভালবাসতে গিয়ে। তাদের ভালোবাসা, নির্ভরতা, তাদের বড়ো হওয়ার সীমাহীন আকুলতা আর বিশ্বাস আমাকে সাহস জুগিয়েছে অচেনা অজানা কঠিন এ পথে পা রাখতে, তাদের সাথে পথ হাটতে।

যে অনুভূতিকে হৃদয় ধারণ করে এই শিশুদের নিয়ে আমি কাজ শুরু করি তার কারণ আমার কর্তব্য বা দায়িত্ব পালন নয় বরং আমার হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা। আমার এ সিদ্ধান্ত সোৎসাহে উঠে এসেছিলো আমার হৃদয়ের গভীর থেকে। আমি বিশ্বাস করি ভালবাসাই শুধু বড়ো কিছু গড়তে পারে এ পৃথিবীতে, কর্তব্য বা দায়িত্ব পালন নয়। তাই কর্তব্যের খাতিরে অথবা কোনকিছু পাওয়ার আশায় বা নেশায় এ কাজে আমি হাত দেই নি বরং আমার হৃদয়ের গভীরতম ভালোবাসার বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার এক অতৃপ্ত বাসনা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেছে, ঘরের খেয়ে পরের মহিষ চরিয়ে লাভ কি? আমি খুব বিনয়ের সাথে বলেছি, লাভের জন্যে নয়, এ আমার ভালোবাসা, এ আমার আরাধ্য।

আমার বিশ্বাস পৃথিবীর সব সচ্ছল ব্যক্তিরা একেএকজন অসচ্ছল ব্যক্তির দায়িত্ব নিলে পৃথিবীতে আর দারিদ্র্যতা থাকবে না। ঠিক একিভাবে এ দেশের সচ্ছল পরিবারগুলো একেএকজন অসচ্ছল সজনহারা নিঃস্ব পথশিশুর দায়িত্ব নিলে, তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিলে আমার দেশে পথশিশু বলে আর কিছু থাকবে না। মূলতঃ এই কাজটিই করতে চায় 'উপলব্ধি'। সমাজের হৃদয়বান সচ্ছল ব্যক্তিদের এ কাজে আমরা সম্পৃক্ত করতে চাই। অসুস্থ হয়ে হসপিটালে গিয়ে আমরা যে অক্সিজেন নিয়ে থাকি তার সর্বনিম্ন দাম ঘন্টায় চল্লিশ টাকা। জন্ম থেকে আজ অব্দি আমরা কতো কোটি টাকার অক্সিজেন নিয়েছি তা একটু ভাবে দেখা উচিৎ! বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী একবার ঢাকায় এসেছিলেন, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র। পরিদর্শক বইয়ে তিনি লিখেছিলেন ''To rander support to others is the rent we should pay for our accommodation on earth.' অর্থাৎ এই-যে পৃথিবীর আমরা থাকছি, তার আলো-বাতাস, অক্সিজেন গ্রহন করছি এর একটু ভাড়া দেওয়া উচিৎ। আর এ-ভাড়া হচ্ছে মানুষের জন্যে মমতার হাত একটু বাড়িয়ে দেওয়া।

ছোট্ট একটা জীবন আমাদের, অল্প কিছু সময়। সময় শেষ জীবন শেষ। পড়ে থাকবে সব কষ্টার্জিত সম্পদ। সবকিছু ফেলে যেতে হবে চলে, থাকেনা কোনকিছু আমার বলে, হারাতে হবে সেদিন সবকিছুর অধিকার। আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছা সেদিন মূল্যহীন হবে, কষ্টার্জিত সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় হবে অন্যের ইচ্ছায়। আসুন, এ জীবনে আমরা নিজ সন্তানের পাশাপাশি স্বজনহারা একজন পথশিশুকে নিজ অর্থে বড় করে যাই, কষ্টার্জিত সম্পদ কাজে লাগাই, নিঃস্ব অসহায় মানুষের দিকে মমতার হাত বাড়ায়ে দিই। 'উপলব্ধি' এ-কাজে আপনাকে সহযোগিতা করতে চায়, আপনার পাশে দাঁড়াতে চায়। আপনি যদি এ সুযোগ করে দেন, আমার বিশ্বাস এটিই হবে আপনার জীবনের শ্রেষ্টতম সিদ্ধান্ত ।

Address

Upalabdhi Foundation , West Khulshi Residential Area , Road No: 1, Holding No : 659, P. S./Upazila: Pahartali , P. O. : Pahartali 4202
Chittagong
4000

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Upalabdhi Foundation posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Upalabdhi Foundation:

Share