30/09/2023
১. এক বাসায় পড়াতাম। বিশাল যৌথ পরিবার। সন্তানসন্ততি আর নাতি-নাতনিতে ভরপুর। চারতলা বাড়িতে সবাই মিলে থাকতেন।
পরিবারের কর্তা মানে 'বাবা' রিটায়ারের পর বাড়িটি অনেক কষ্টে করেছিলেন। তবে পরে ছেলেরা ব্যবসা বাণিজ্যে মোটামুটি ভালো করায় এটা ভাড়া দিতে হয়নি। তিনি আপনজনদের নিঃশ্বাসের মাঝেই পরম আনন্দে দিন পার করেছেন। যখনই পড়াতে যেতাম, দেখতাম তিনি বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত। কখনো পানির মোটর ঠিক করার কাজ তদারক করছেন, কখনো রেলিংয়ে লেগে থাকা ময়লা ত্যানা দিয়ে পরিস্কার করছেন, সামনে ছোট্ট বাগানে গাছের যত্ন নিচ্ছেন। সবসময় হাসি হাসি মুখ। আমাকে দেখলেই বলতেন, বুঝলা বাবা, বাচ্চাকাচ্চা নিয়া নিজের বাড়িতে থাকা বড়োই আনন্দের। চিৎ হইলেও আমার বাড়ি, কাৎ হইলেও আমার বাড়ি। কি বলো,ঠিক না?
আমিও হেসে মাথা নাড়াতাম।
তিনি আবার বলতেন, এতো বড়ো সংসার, সব পোলাপাইন একসাথে থাকে, এক চুলায় খায়, এইটা ভাবলে চোক্ষে পানি চইলা আসে বাবা। আমার মরণেও সুখ।চোখ বুজলেও চিন্তা নাই, সবার ছাদের ব্যবস্থা তো হইছে।
প্রায় ত্রিশ বছর পর এখন প্রায় সে বাড়ির সামনে দিয়ে যাই। কিন্তু বাড়িটি নেই। ভেঙে ফেলা হয়েছে। ডেভেলপার হাইরাইজ অর্ধেক তুলে কাজ বন্ধ রেখেছে। একদিন কী মনে করে গাড়ি থেকে নেমে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, এ বাড়িতে যারা থাকতেন, তাঁরা কোথায়।?
উত্তর এলো, " আল্লায় জানে।"
আবার জিজ্ঞেস করি, বাড়িটা অনেকদিন অর্ধেক হয়ে পড়ে আছে, কাজ শেষ হয় না কেন?
"ভাইয়ে ভাইয়ে কাইজা, দা-কুড়ালের কাইজা। তাই মামলা হইছে। কাজ ধরন যায় না।"
চট করে আমার ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি বলেছিলেন, 'আমার মরণেও সুখ---"
কালের নিয়মে বাড়িটি না হয় বহুতল হতেই পারে। কিন্তু যে বাড়ি আমি করিনি, সেটার ভাগ নিয়ে দা-কুড়ালের ঝগড়া!
নিজের হিম্মত নেই গড়ার, হিম্মত আছে যা বাবা করে দিয়েছেন তা ধ্বংস করার!
কোমরে জোর নেই, কিন্তু যে নিঃশ্বাসময় ভালোবাসার বন্ধন বাবা রচনা করেছিলেন তা খুন করার ক্ষমতা ভালোই আছে!
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ত্রিশ বছর আগে ফিরে গেছি আর ভাবছি, আহা! কী নির্মমভাবেই না বৃদ্ধ বাবার সুখকে হত্যা করা হয়েছে লোভের আগুনে পুড়িয়ে।
সংগৃহীত : Badal sayed স্যরের পোষ্ট কপিড।
(লেখাটি শেয়ার করা যাবে)