05/05/2020
বুদ্ধ, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও ভেসাক ডে
ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা
কলামঃ বোধিধারা ত্রৈমাসিক
স্যার এডউইন আর্নল্ড তাঁর ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থে বুদ্ধকে লাইট অব এশিয়া বা ‘এশিয়ার আলো’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। গ্রন্থটি গৌতম বুদ্ধের জীবন ও শিক্ষা নিয়ে রচিত উচ্চ মার্গের কাব্যগ্রন্থ। সেই এশিয়ার আলো-খ্যাত-মানবপুত্র মহামানব গৌতম বুদ্ধ এখন সমগ্র বিশ্বের আলো, শান্তির নন্দিত প্রতিক।
১৯৯৯ সালে বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্রের মিলনসভা জাতিসংঘ বুদ্ধের জন্মজয়ন্তীকে পবিত্র ভেসাক ডে হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তদনুসারে প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদ্যাপন ও পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বৌদ্ধপ্রধান রাষ্ট্রসমূহে বিপুলকার আয়োজনের মধ্য দিয়ে বুদ্ধের জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য তৎপূর্বে ইউনেস্কো ১৯৯৭ নেপালস্থ লুম্বিনীর বুদ্ধের মহাপবিত্র জন্মস্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। এভাবে উনিশ শতকে আর্নলেন্ডের এশিয়ার আলো খ্যাত মহামানব বুদ্ধ বিশ শতকের শেষে সমগ্র বিশ্বের আলো হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হিসেবে এটি জগতের সকল বৌদ্ধদের জন্য অত্যন্ত আনন্দময় ঘটনা। এ বছর দেশে ৬মে দিবসটি পবিত্র বুদ্ধপূর্ণিমা হিসেবে পালিত হবে। কিন্ত জাতিসংঘে ও পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপজুরে পালিত হবে ভেসাক ডে বা বৈশাখী দিবস হিসেবে। জগতে মহাপুরুষের আবির্ভাব অত্যন্ত দুর্লভ।
কিন্ত তার চেয়ে বেশি বিরলতম ঘটনা হলো একই দিনে জন্ম, বুদ্ধত্ব(মহাসত্যজ্ঞান) লাভ এবং পরিনির্বাণ তথা দেহত্যাগ। বুদ্ধের জীবনে এই বিরলতম ঘটনাত্রয় সংঘটিত হয়েছে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে। তাইতো দিবসটি বৌদ্ধদের নিকট এত গভীর তাৎপর্যবহ। কিন্ত অন্যদের কাছে কেন? কারণ বুদ্ধ ছিলেন একাধারে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক, সমাজসংস্কারক, মানবতার ধর্মশিক্ষকার সূচনাকারী, ধর্মগুরু, শিক্ষাগুরু, অহিংসা ও মৈত্রীতত্বের আবিস্কারক, নির্বাণমার্গের প্রতিষ্ঠাতা, জীব ও প্রকৃতিপ্রেমী, ধ্বজাধারী দার্শনিক, সংঘ বা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, বিহারকেন্দ্রিক কর্মবাদী, কার্যকারণ ও প্রতিত্যসমুৎপাদ নীতি এবং আসবক্ষয় জ্ঞানের মতো উচ্চতর দর্শনের দিশারী। বুদ্ধের দেশিত বোধিজ্ঞান বা চারি আর্য সত্য ও আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ একটি ক্রুটিমুক্ত সহজ সরল পূণ্যময় উত্তম জীবনবিধান যা পৃথিবীর সকল মানুষ সহজেই অনুধাবন, অনুধ্যান ও অনুশীলন করতে পারে।
তাইতো তিনি আজ বিশ্বজয়ী। স্যার এডউইন আর্নল্ড লাইট অব এশিয়া বা বুদ্ধের জীবনী লেখার আগে ইউরোপে বুদ্ধ সম্পর্কে খুব কম লোকে জানত বা কিছুই জানত না। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে মিলিয়ন লোক বুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত হয়। ঐ শতকে আর্নল্ডের দেশ যুক্তরাজ্য হয়ে ওঠে বুদ্ধের ভাষা পালি গবেষণা, অনুশীলন, প্রচার ও প্রকাশনার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।থমাস উইলিয়াম রিস ডেভিডস ও তাঁর সহধর্মিণীর উদ্যোগে লন্ডনে স্থাপিত হয় পালি টেক্সট সোসাইটি।
সে-ই সংস্থা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে বুদ্ধের নীতি শিক্ষা ও দর্শনের ওপর পালি থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুদিত গ্রন্থাবলি। এক পর্যায়ে পূর্ব এশিয়া ছাড়িয়ে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও কানাডায় পৌঁছে যায় বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন। আর একুশ শতকে এসে খোদ জাতিসংঘের মহাসচিব এস্তনিও গুতেরসকে বলতে শুনিঃ “In a time of growing intolerance and inequality, the Buddhas message of non-violence and service to others is more relevant than ever ”
আসলে বর্তমান জাতিবাদী, বর্ণবাদী, উগ্রধর্ম্বাদী, স্বার্থন্ধ বিবেকবর্জিত, মানুষের বিশ্বে বুদ্ধের শিক্ষার অনুশীলন খুবই প্রয়োজন। আসুন আমরা হিংসা বিভেদ ভুলে এই অনিত্য সংসারে বুদ্ধের শিক্ষায় জীবন গড়ি।