28/09/2024
#বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাতা: বিশ্বনেতা মুহাম্মাদ (সা.)
_________
---ডক্টর শাহ মুহাম্মাদ আবদুর রাহীম
১.
ষষ্ঠ শতাব্দির বিশ্বব্যবস্থা ছিলো চরম বৈষম্য পূর্ণ। ঐ সময়ের সমকালীন বিশ্ব মানবতার নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে দুটো পরাশক্তি ছিলো রোমান ও পারসিক্। কর্তৃত্ববাদী রাজশক্তির অধিকারী ছিলো তারা। ধর্ম তান্ত্রিক সভ্যতায় যারা ছিলো দৃশ্যমান, তারা হলো ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান। পৌত্তলিক অগ্নিপূজক নক্ষত্র পূজক শিরক বাদী কিছু মানুষও পৃথিবীর নানা অন্চলে বিদ্যমান ছিলো। আরব্য অঞ্চলে কা'বা কেন্দ্রিক পৌত্তলিকদের ছিলো স্বর্গরাজ্য। একত্ববাদী কা'বায় বহুত্ববাদী শিরকতন্ত্রের অভয় ভূমিতে রূপান্তর ঘটিয়েছিলো। দূর প্রাচ্যের দেশ হিন্দ ছিলো বহুমাত্রিক পৌত্তলিকতা চারণভূমি। চিনেও ছিলো গৌতম বুদ্ধের নিরীশ্বরবাদী অদ্ভুত ধর্ম তান্ত্রিক পৌত্তলিকতা এবং কনফুসিয়াসের মানবিক ধর্মতন্ত্র। তৎকালীন পৃথিবীতে কিছু প্রকৃতিবাদী ও প্রকৃতিপূজকও ছিলো।
মানবেতিহাসের এই অধ্যায়ে নিরেট একত্ববাদীদের সংখ্যা ছিলো হাতেগোণা। যারাঁ আব্রাহামের দীনের হানীফের অনুসারী। এঁরা ছিলো মক্কা কেন্দ্রিক। ইহুদী খ্রিস্টানদের মধ্যে মূল ইলাহী গ্ৰন্থের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলো নিদেনপক্ষে খুবই কম।
প্রতিটি ধর্ম ও সভ্যতা বিকৃত হয়ে ভীষণরকমের অবক্ষয়ের অতলে নিমজ্জিত। সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে মারাত্মক পচন ধরেছিলো। মানবতার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা সর্বত্র বিরাজ করছিলো। মানব সমাজ সভ্যতায় অধিকারে ছিলো চরম বৈষম্য।
বৈষম্যের ক্ষেত্রগুলো সকল সেক্টরে বিরাজমান। তা সামাজিক অধিকার, পারিবারাক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে সর্বত্র চরম বৈষম্য ও বন্চনার করুণ ইতিহাস।
২.
মানব মানবী সমন্বয়েই মানবতার অভিযাত্রা। মানব মৌলিক সৃষ্টি ও সত্তাগতভাবেই দুই শ্রেণির। নর ও নারী। উভয় মিলেই মানব জীবন পূর্ণত্ব পায়। একের অবর্তমানে, একের অভাবে আরেকজন অপূর্ণ ও অচল। এই নর্ ও নারীর বায়োলজিক্যাল সৃষ্টি ভিন্নধর্মী। দৈহিক গঠন কোমল কাঠিণ্যে ভিন্নতর। পজেটিভ নেগেটিভ আকর্ষণ বিকর্ষণে পরস্পরে গহীনতর সম্পর্কযুক্ত। এ জন্যই একে অপরের প্রতি আকর্ষিত ও বিকর্ষিত্। পরস্পর একেঅপরের সম্পূরক। দৈহিক শক্তিমান নর, কখনো কোমলমতি নারীর ন্যায্য অধিকার স্বীকার করেনি। অবহেলা, হীন, নীচ মনে করা এবং অধিকার বঞ্চনার করুণ কাহিনীতে মানবেতিহাসের পাতা ভরপু্র। সকল সমাজে কখোনো ধর্মের নামে, কখোনো কর্তৃত্বের বশে নারীর ললাটে জুটতো্ বন্চিতি আর বন্চিতি। প্রায় সকল ধর্ম ও সভ্যতায় নারীকে মানুষ হিসেবেও স্বীকার করতো না। অধিকার দেওয়াতো দূরের কথা। স্ত্রী হিসেবে ব্যবহার করতো। ভোগ্য পণ্য হিসেবে গণ্য করতো। কিন্তু অধিকার দিতো না। ধর্ম পালনে নারী অধিকার পেতো না। বরং মনে করা হতো নারীই সকল অঘটন ঘটন পটিয়সী। নারীকে অপয়া মনে করা হতো। নরকের দ্বার মনে করতো। নারীকে মানুষের স্বর্গচ্যুতির হেতু মনে করা হতো। নারীর ছিলোনা আর্থসামাজিক কোনো অধিকার। উত্তরাধিকার দেওয়া হতো না। কন্যা সন্তানকে অভিশাপ মনে করা হতো। অসম্মানের মনে করা হতো। তাই তাদেরকে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে জীবন্ত সমাধিস্থ করাকে গৌরব মনে করতো। সমভাবে খেতে শুতে পরতে দেওয়া হতো না। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হতো। কাজে কর্মে লাগাতো্ না। এহেন করুণ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব মানবতার দরদী নেতা নারীকে প্রথমতো মানুষ বলা হলো। সকল ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন। ভোগ্য পণ্যের স্থলে সম্মান ও গৌরবের আসীনে সমাসীন করলেন।
৩.
নর ও নারীকে একই বৃন্তের দুটো পুষ্প মঞ্জুরি বলা হলো। মানুষ হিসেবে কোনো পার্থক্য নাই বলে ঘোষনা করা হলো। নারী সন্তানকে সৌভাগ্যের প্রসুন বলা হলো। মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত ঘোষণা করা হলো।
৪.
পবিত্র দাম্পত্য জীবনে একে অন্যের অপহার্য অংশ বলা হলো। পারিবারিক পরিমণ্ডলে পুরুষকে রাজা আর স্ত্রীকে রাণীর মর্যাদা দেওয়া হলো। উভয়ের সম্মিলিত প্রয়াস ও দায়িত্ব কর্তব্যের পথরেখা এঁকে দেওয়া হলো। এই আঙিনায় কেউ ছোট নয়, কেউ বড়ো নয় ঘোষনা করা হলো। স্বামীকে কর্তা আর স্ত্রীকে সংসারের কর্তী মর্যাদা দেওয়া হলো। ন্যায্য উত্তরাধিকারের পাওনা দেওয়া হলো। মোহরানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রের আর্থিক অধিকার ভোগ ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীকার দেওয়া হলো।
৫.
বাসস্থান খাদ্য বস্ত্র শিক্ষা চিকিৎসায় স্বামীর সমপর্যায় ও সমঅধিকার দেওয়া হলো। সাংস্কৃতিক ও তামাদ্দুনিক অধিকার নিশ্চিত করা হলো। মা, বোন, খালা, ফুফু, কন্যা, চাচী, দাদী, নানী হিসেবে উচ্চাসন দেওয়া হলো। কোনো ক্ষেত্রেই কোনো রকম হেয় বা বৈষম্য করা হলো না। নারীর এই উচ্চ মর্যাদা ও অধিকার সর্বপ্রথম যিনি্ দিলেন, ঘোষণা করলেন এবং নিশ্চিত করলেন, তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হিতৈষী বন্ধু প্রিয়জন বিশ্বনেতা হযরত মুহাম্মাদ সা:।
৬.
তাঁর বৈষম্যহীন প্রথম ঘোষনা ছিলো- হে বিশ্বমানবতা, তোমরা এক পিতা আদম আ. ও মা হাওয়া আ. এর সন্তান। তোমরা সকলে মাটির তৈরি। তোমরা কেউ কারো উপর শ্রেষ্ঠ নও। শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হলো আল্লাহ প্রাণতা, খোদাভীরুতা। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যিনি নীতিনৈতিকতা ঈমান ও তাকওয়ায় ছিলেন অগ্ৰসরমান। আভিজাত্যের বেরোমিটার হলো তাকওয়া।
পাওয়ারের অধিকারী মানুষেরা অপরাপর মানুষের উপর দাপট দেখাতো। নীচু ও হীন মনে করে গণমানুষের অধিকার বঞ্চিত করে রাখতো। মানুষকে পশুর মতো কেনাবেচা করতো। দাসত্বের করাল নিগঢ়ে বেঁধে ফেলতো। লুট ডাকাতি রাহাজানি করে মানুষকে ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিতো। ক্রীতদাসের কোনো আর্থসামাজিক কিংবা মানবিক কোনো অধিকার দিতো না। সীমাহীন নির্যাতন নিগ্ৰহ নিপীড়ন চলতো অবলীলাক্রমে। দাসদাসীদের জীবন ছিলো দুর্বিসহ। খাওয়া পরায় ছিলো চরম বৈষম্য। পঁচা বাসী খাবার খেতে দিতো। নিম্ন মানের বাসগৃহে থাকতে দিতো। মানুষের এই হীনতম অবস্থা থেকে মানবতাকে উদ্ধার করলেন। সকল মানুষকে সমমর্যাদার ঘোষনা করলেন। দাসদাসীকে স্বাধীন মানূষের সমান মর্যাদা বান করলেন। তিনি হলেন মানবতার দরদী নেতা মুহাম্মাদ সা:। তিনি বিদায় হজ্বের মানবাধিকার ঘোষণায় দাসদাসীরা সমানাধিকারের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিলেন।
৭.
বংশ গোত্রীয় আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে সৃষ্টি করা হতো কৃত্রিম বৈষম্য। কালো ধলো, বর্ণ শ্রেণি বৈষম্যের কৃত্রিম ব্যবধান সৃষ্টি করে শোষণ নির্যাতন করতো। সমাজে মালিক শ্রমিকের মধ্যে ব্যবধান ছিলো বিস্তর। শ্রমিকের উপযুক্ত মজু্রী দেওয়া হতো না। শ্রমিকের আর্থ-সামাজিক ও মানবিক অধিকার দেওয়া হতো না। আজও শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার আদায়ে ১মে দিবস পালন করা হয়। অথচ মানবতার মহান নেতা মুহাম্মাদ (সা) ই মালিক-শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার সমুন্নত করেন দেড় হাজার বছর আগেই। মানুষের কাজ ও পেশার নিরিখে মর্যাদা নির্ণয় করা হতো। অথচ কোনো কাজ বা পেশাই খাটো বড়ো নেই।
৮.
মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো বৈষম্য। বাস্তবে মানবতার নবী তা দেখিয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অনুভবে। ধর্মের কারণে মানুষকে বৈষম্যের শিকার হতে হতো না। আইনের দৃষ্টিতে আপন পর, ছোট বড়ো, অভিজাত নীচু জাত বলে কোনো পার্থক্য করতে নিষেধ করেছিলেন মহানবী সা.। ইনসাফ ও ন্যায়ের পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছিলো সমাজ ও রাষ্ট্রে। আইন করে বৈষম্য সৃষ্টির সকল ছিদ্র পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো।
শাসক শাসিত, রাজা প্রজা, ধনী নির্ধন, প্রভু ভৃত্য, শক্তিমান নিরীহ, সেনানায়ক সাধারণ সেনা, কেউ কারো প্রতি যাতে বিন্দু মাত্র বৈষম্য সৃষ্টি না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে চির শ্বাশত সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাম্যের মহানেতা নবী মোস্তফা সা.। নির্বিশেষে সকলে সমান এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
সমাজে চলমান হিংসা বিদ্বেষ, ত্রাস সন্ত্রাস, অসাম্য তুলে দিয়ে এক কল্যাণময় প্রশান্তির সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ করেছিলেন মুহাম্মাদু্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বর্তমান উত্তরাধুনিক বিশ্বমানবতার কাছে উদাত্ত আহ্বান, আসুন নবী মোস্তফার (সা) আদর্শে সাম্য ও মানবতার নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলি।
২৮:০৯:২০২৪
#রাহীমস্আইডিয়া