10/11/2025
এক সাংবাদিক আমাদের জেটি-সরকারদের পক্ষে কিছু লিখেছেন ভাল লাগলো। ❤️
সাংবাদিক: এম,শফিউল আজম চৌধুরী।
সাংবাদিক ও লেখক,
চট্টগ্রাম বন্দর: রোদ-বৃষ্টিতে পণ্য খালাস যারা করে, রাষ্ট্র কি তাঁদের দিকে তাকাবে না?
# # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # # #
এম,সফিউল আজম চৌধুরী : বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ধমনী চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের প্রতিটি স্পন্দন দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমদানিকৃত কাঁচামাল থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক—সবকিছুর গতি নির্ভর করে এই বন্দরের কর্মতৎপরতার ওপর। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেন চট্টগ্রাম কাষ্টম ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এর কাষ্টম সরকার এবং জেটি সরকার। চট্টগ্রাম ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস্ কর্মচারী ইউনিয়ন ( সি, বি, এ) সুত্রে জানা যায়,এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৯৯৯৮ জন,এরা দিনের আলো থেকে গভীর রাত, শীত-গ্রীষ্মের বিভেদ ভুলে নিরলস পরিশ্রম করে তারা নিশ্চিত করেন পণ্য খালাস ও শুল্কায়নের দ্রুততা। কিন্তু, জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁদের অপরিহার্য ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের জীবন চরম অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও বঞ্চনার ক্যানভাসে আঁকা এক দুর্লভ চিত্র।আজকের এই কলামে সেই নীরব নায়কদের জীবনের কঠিন বাস্তবতা, তাঁদের ন্যায্য দাবি এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আশু হস্তক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরব। তাঁদের অধিকারের প্রশ্নটি কেবল মানবিক নয়, বরং দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
(১): কর্মক্ষেত্র ও জীবনের ঝুঁকি:চট্টগ্রাম কাস্টমসে সিএন্ডএফ কর্মচারীদের কাষ্টম সরকার আর জেটি সরকার এই দুইটি পদবি কর্মপরিধি অনুসারে ভিন্ন। এই ভিন্নতা তাদের ঝুঁকির মাত্রাকেও নির্ধারণ করে দেয়।
(ক). কাষ্টম সরকার: দাপ্তরিক জটিলতার নীরব শিকার।কাষ্টম সরকারগণ কাজ করেন কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরে। তাঁদের মূল দায়িত্ব হলো আমদানি-রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, বিল অফ এন্ট্রি তৈরি, দাপ্তরিক নথিপত্র পরীক্ষা ও কাস্টমসের বিভিন্ন দপ্তরে সেগুলো উপস্থাপন করা। যদিও এদের কাজ শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে বেশি মানসিক শ্রমনির্ভর, তবে এর ঝুঁকিও কম নয়।সময়মতো পণ্য খালাসের জন্য আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টের পক্ষ থেকে মানসিক চাপ ও হয়রানি থাকে। অন্যদিকে, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্তুষ্টি বজায় রেখে কাজ করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। কোনো নথিতে সামান্য ত্রুটি থাকলে বা প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে এদেরকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং অনেক সময় অসৎ চক্রের দ্বারা মানসিক ও ক্ষেত্রবিশেষে শারীরিক হয়রানির শিকার হতে হয়।শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা মিথ্যা ঘোষণার দায়ে অনেক সময় কাস্টম সরকারের পারমিট বাতিল বা আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়, যার দায়ভার বহুলাংশে তাদের ওপর বর্তায়, অথচ আসল অপরাধী থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
(খ). জেটি সরকার: রোদ-বৃষ্টিতে জীবন হাতে নিয়ে পন্য খালাসকারী জেটি সরকারগণের জীবন যেন এক নিরন্তর সংগ্রাম। তাঁরা কাজ করেন বন্দর অভ্যন্তরে—জেটি, ইয়ার্ড এবং বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলিতে। এদের কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টসাধ্য। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় জেটি সরকারগণকে ঝড়, বৃষ্টি, প্রখর রোদ বা কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে পন্য খালাসের কাজ তদারকি করতে হয়। কনটেইনার ইয়ার্ডে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে পণ্য পরীক্ষা করা বা ডিপোগুলিতে প্রচণ্ড গরমে নথিপত্র নিয়ে ছোটাছুটি করা তাঁদের দৈনন্দিন জীবন।বন্দর অভ্যন্তরে সারাক্ষণ ক্রেন, ফর্কলিফট, ট্রেইলার ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের চলাচল লেগেই থাকে। এই পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রায়শই জেটি সরকারগণ ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হন। কনটেইনারের নিচে চাপা পড়া বা গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার মতো ঘটনা প্রায় নিয়মিত।এছাড়া বন্দরে খালাস হওয়া নানা ধরনের পণ্যের (যেমন – রাসায়নিক, বিষাক্ত পদার্থ বা ধুলো-বালি) সংস্পর্শে এসে এরা ফুসফুসের রোগ, চর্মরোগ এবং অন্যান্য মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। অথচ, এর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা স্বাস্থ্য সুবিধা তাঁদের নেই।রাত-দিনের ক্লান্তিহীনতা: বন্দর যেহেতু ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে, তাই জেটি সরকারগণকে রাতের বেলাও ডিউটি করতে হয়। গভীর রাতে পণ্য খালাসের সময়ে জীবনের নিরাপত্তা ও শীত-বৃষ্টির মোকাবিলা করতে হয় একাগ্রচিত্তে।(২): অধিকারের দাবি: সরকারি সুযোগ সুবিধার প্রয়োজনীয়তা:::জেটি সরকার ও কাষ্টম সরকারগণ সিএন্ডএফ এজেন্টের কর্মচারী হলেও, তাঁদের কর্মপরিধি ও কাজের স্থান সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠান (কাস্টমস ও বন্দর) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে, তাদের কাজের ধরণ ও গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।
ক. চাকরির নিশ্চয়তা ও স্থায়ীকরণ:এই কর্মীদের প্রধান এবং মৌলিক দাবি হলো, চাকরির নিশ্চয়তা। বেসরকারি চাকরির মতো তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা নেই। এর ফলে তারা যেকোনো সময় চাকরি হারানোর ভয়ে থাকেন।সুপারিশ: সিএন্ডএফ লাইসেন্স নবায়নের মতো, কাস্টম সরকার ও জেটি সরকারদের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পর তাঁদের কাজের পারমিট নবায়ন এবং চাকরির স্থায়ীকরণের জন্য একটি সরকারি নীতিমালা তৈরি করা জরুরি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে এই কাঠামো তৈরি হতে পারে।
খ. সরকারি কর্মচারীদের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা প্রদান:তাঁদের কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকারি কর্মচারীদের মতো নিম্নলিখিত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত।সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল: প্রতিটি কর্মীর জন্য একটি বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল (যেমন – প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি) গঠন করা, যেখানে এজেন্ট এবং সরকার উভয়ের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিত জমা হবে।
বার্ধক্য ভাতা/পেনশন স্কিম: কর্মজীবনের শেষে যাতে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা না থাকে, সেজন্য সরকারি স্কিমের আদলে একটি পেনশন বা বার্ধক্য ভাতার ব্যবস্থা করা।ছুটি ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা এবং সবেতন ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি ও অসুস্থতাজনিত ছুটির ব্যবস্থা রাখা।
গ. সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা সুবিধা:জেটি সরকারদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাঁদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।স্বাস্থ্য বীমা: সকল সিএন্ডএফ কর্মীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য বীমা (Health Insurance) চালু করা, যাতে তারা নিজেরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা বিনা খরচে চিকিৎসা পেতে পারে।ঝুঁকি ভাতা (Risk Allowance): জেটি সরকারদের তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য একটি অতিরিক্ত 'ঝুঁকি ভাতা' প্রদান করা উচিত, যা তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার হবে।বন্দর অভ্যন্তরে চিকিৎসা কেন্দ্র: বন্দর ও ডিপোগুলির আশেপাশে কর্মরত সিএন্ডএফ কর্মীদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে একটি আধুনিক প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা।
(৩): বিপদে রাষ্ট্রের সার্বিক সহায়তা: একটি মানবিক আবেদন::কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনা, শারীরিক অক্ষমতা বা মৃত্যু—এই কঠিন পরিস্থিতিগুলোতে জেটি সরকার ও কাষ্টম সরকারদের পরিবার চরম অসহায়ত্বের শিকার হয়। এই মানবিক দিকটিতে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
(ক). দুর্ঘটনা ও সার্বিক চিকিৎসা:বন্দর অভ্যন্তরে দায়িত্বরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হলে, আক্রান্ত কর্মীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বিনামূল্যে চিকিৎসা: দুর্ঘটনার শিকার সিএন্ডএফ কর্মীর সম্পূর্ণ চিকিৎসার ভার সরকার বা কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে, যা সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়।
ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: গুরুতর আহত বা শারীরিক অক্ষমতার শিকার কর্মীদের জন্য তাৎক্ষণিক ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তাদের দক্ষতা অনুযায়ী বিকল্প কর্মসংস্থানের (Rehabilitation) ব্যবস্থা করা।
(খ). বেকারত্ব, রোগ ও মৃত্যুতে আর্থিক সাহায্য:
সদস্যদের বেকারত্ব, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, শারীরিক অক্ষমতা, বার্ধক্য এবং মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মৃত্যুজনিত আর্থিক অনুদান: কর্মকালীন বা কর্মের কারণে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে এককালীন মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেওয়া, যাতে পরিবারটি প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠতে পারে।
নিয়োগে অগ্রাধিকার: মৃত কর্মীর পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে সিএন্ডএফ লাইসেন্সিং বিধিমালার আওতায় বা সরকারি অন্য কোনো দপ্তরে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বেকারত্ব ভাতা: সিএন্ডএফ এজেন্টদের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদের জন্য কর্মহীন অবস্থায় (যেমন – লাইসেন্স বাতিল বা এজেন্টের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে) একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জীবনধারণের উপযোগী বেকারত্ব ভাতা নিশ্চিত করা।চট্টগ্রামের জেটি সরকার ও কাষ্টম সরকারগণ কেবল কর্মচারী নন, তাঁরা এই রাষ্ট্রের অর্থনীতির চালকশক্তির অন্যতম অংশ। তাঁরা তাঁদের জীবনের মূল্যবান সময় এবং কঠিন শ্রম বিনিয়োগ করছেন দেশের আমদানির চাকা সচল রাখতে। তাঁদের বঞ্চনা ও অনিশ্চিত জীবনযাত্রা আজ কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি দুর্বলতা।
যদি এই কর্মীদের জীবন ও জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, যদি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁদের পাশে সরকার না দাঁড়ায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের কর্মস্পৃহা কমবে। এর ফলস্বরূপ পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেবে, যা আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে মন্থর করে দেবে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হবে। অতীতে বিভিন্ন সময় সিএন্ডএফ কর্মচারীদের কর্মবিরতি বা আন্দোলন বন্দরকে অচল করে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে তাঁদের সন্তুষ্টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই, এই নীরব নায়কদের প্রতি সুবিচার করা, তাঁদেরকে সরকারি কর্মচারীদের মতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া এবং জীবনের সকল প্রতিকূলতায় পাশে থাকার ব্যবস্থা করা — এটি মানবিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার পরিচায়ক।
সরকারের কাছে আজ জেটি সরকার ও কাষ্টম সরকারদের পক্ষ থেকে উদাত্ত আহ্বান: তাঁদের দাবিগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হোক। একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল এবং মানবিক অর্থনীতির জন্য, বন্দর-বার্তার এই নীরব নায়কদের জীবনকে সুরক্ষা দিন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই বাংলাদেশ বাণিজ্যের পথে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে পারবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে তাঁদের প্রতি আশু হস্তক্ষেপ আজ সময়ের দাবি। #লেখক:- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।