04/04/2026
📌সংক্ষিপ্ত জীবনী
অত্র সংগঠনের সম্মানিত উপদেষ্টা
💐আল্লাামা মুফতি একরাম হোসাইন ওয়াদুদী হাফিজাহুল্লাহ💝
আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া—এটি কেবল একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি এক দীপ্তিমান জ্যোতিষ্ক, এক সোনালি ঐতিহ্যের নাম, এক আধ্যাত্মিক বাতিঘর—যা যুগে যুগে দীনি ইলম, রূহানিয়াত এবং আমল-আখলাকের উজ্জ্বল প্রদীপ অসংখ্য হৃদয়ে প্রজ্বলিত করে আসছে।
এটি এক জীবন্ত কিংবদন্তি—যেখানে ইলম ও তাযকিয়ার সুশৃঙ্খল সাধনা, তাকওয়া ও ইখলাসের পবিত্র দীক্ষা, এবং ইসলামের আসমানী সৌন্দর্যের অফুরন্ত বিকাশ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সযত্নে লালিত ও সংরক্ষিত হয়ে আসছে। কালের পরিক্রমায় এই মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বভার যাঁরা বহন করেছেন, তাঁরা শুধু ব্যক্তি ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন দীপ্ত দীপশিখা, আসমানী আহ্বানের নিরবিচল বাহক। কেউ ছিলেন কুতুবুল যামান, কেউ শায়খুল আরব ওয়াল আ‘জম, কেউ মুফাক্কিরে ইসলাম, কেউ বা হাদিয়ে যামান—কিন্তু সকলের অন্তরে ছিল একই আলো: আল্লাহর ভালোবাসা, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্য এবং উম্মতের কল্যাণে আত্মনিবেদনের অদম্য স্পৃহা।
আল্লামা শাহ মুফতি আজিজুল হক (রহ.), আল্লামা হাজী ইউনুছ (রহ.), আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী (রহ.), আল্লামা নূরুল ইসলাম কাদিম (রহ.), আল্লামা মুফতি আব্দুল হালিম বোখারী (রহ.), আল্লামা শাহ আবু তাহের নদভী কাসেমী (রহ.)—তাঁরা ছিলেন সেইসব রূহানী মহীরুহ, যাঁদের শেকড় প্রোথিত ছিল কুরআন-সুন্নাহর গভীরতম মাটিতে। তাঁদের জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে উম্মতের ক্লান্ত হৃদয়ে ছায়া দিত, দীনদারদের আত্মাকে শীতল করত, আর যুগে যুগে আলো ছড়িয়ে দিত প্রজন্মান্তরে।
তাঁদের তাকওয়া ছিল সুবাসিত চন্দনের মতো, পরহেজগারি ছিল নির্মল ঝর্ণাধারার ন্যায়। আমানতের ভার তাঁদের কাঁধে নত করত, আর ইখলাস তাঁদের অন্তরে জ্বালিয়ে রাখত দীপ্ত অগ্নিশিখা। তাঁরা ছিলেন আলোকবর্তিকা—অন্ধকার সময়ে দিকনির্দেশনা দানকারী, নির্জন দ্বীনের বাগিচায় সূর্যের আলো। তাঁদের মুজাহাদা উৎসারিত হতো অন্তরের গভীর থেকে, আর তাঁদের কোরবানি ছিল রাতের আঁধারে কান্নাভেজা সিজদার নিভৃত আর্তনাদ। এই ত্যাগ ও সাধনারই সুফল—আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া। আজও এটি দীপ্ত, জ্যোতির্ময়; বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
এই দীপ্তি কখনো নিভে যাবে না, এই শিখা কখনো ম্লান হবে না। যুগের পর যুগ, মনোনীত মুখলেস রাহবারদের হাতে এ প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবে অনন্ত অভিযাত্রায়—যার গন্তব্য আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর সঙ্গী হবে সচ্চরিত্রের অবিনাশী ধারা।
পরিচালনার ধারাবাহিকতায় এবার এই দীপ্ত মিনারের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে অত্র জামিয়ার শায়খে সালেস, আল্লামা মুফতি একরাম হোসাইন ওয়াদূদী হাফিজাহুল্লাহ-এর হাতে।
❖ জন্ম ও বংশপরিচয়
তিনি ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার অন্তর্গত তুলাতলী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা মুহাম্মদ হোসাইন (রহ.) ছিলেন বিনয়, তাকওয়া ও খোদাভীতির অনন্য প্রতিচ্ছবি। ১৩৯৮ হিজরিতে জুমাবারে তিনি ৪৬ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।
তাঁর পিতামহ শায়খ মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ তুলাতলী (রহ.) ছিলেন দেশের অন্যতম প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। তাঁর ইলমের বরকতেই বাংলার ঘরে ঘরে হাদিসের আলো পৌঁছে যায়। তাঁর কাছেই শিক্ষা গ্রহণ করেন কুতুবুল আলম শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুফতি আজিজুল হক (রহ.)। এমনই ইলমী ও তাকওয়াময় পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা।
❖ শিক্ষাজীবন
প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন মাদরাসায়ে মুখলেছিয়া (পুকুরিয়া) ও মাদরাসায়ে রশিদিয়া (বশরত নগর)-এ।
১৯৮০ সালে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি হন এবং ১৯৮৬ সালে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। মেধা, স্মৃতিশক্তি ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাদদের মধ্যে রয়েছেন—আল্লামা আনযার শাহ কাশ্মীরী (রহ.), আল্লামা আব্দুস সামাদ আমিরাবাদী (রহ.), আল্লামা ইসহাক রাঙ্গুনবী (রহ.), আল্লামা শাহ আইয়ুব (রহ.), আল্লামা মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.), আল্লামা মুফতি আব্দুল হালিম বোখারী (রহ.), এবং শাইখুল মাকুলাত আল্লামা ক্বারী ইলিয়াস (দা.বা.) প্রমুখ।
❖ উস্তাদদের মূল্যায়ন
তাঁর উস্তাদগণ তাঁকে অত্যন্ত মেধাবী ও যোগ্য ছাত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.) বলেন: “তিনি ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।”
ক্বারী ইলিয়াস (হাফি.) বলেন: “পটিয়া মাদরাসায় আমার একটি বিশেষ ছাত্র আছে—মাওলানা একরাম হোসাইন ওয়াদূদী।”
আল্লামা শাহ আইয়ুব (রহ.) বলেন: “জটিল কিতাবসমূহ তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে পাঠদান করতে সক্ষম।”
❖ কর্মজীবন
তিনি মাদরাসায়ে হেমায়েতুল ইসলাম কৈয়গ্রামে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর বগুড়া জামিল মাদরাসায় পাঁচ বছর হাদিস ও আকায়েদ পড়ান। পরে দারুল মারিফে মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৪১৩ হিজরিতে তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
২০২৬ সালের ৩০ মার্চ, জামিয়ার সাবেক মুহতামিম আল্লামা শাহ আবু তাহের নদভী কাসেমী (রহ.)-এর ইন্তিকালের পর শুরা সদস্যগণ তাঁকে জামিয়ার মহাপরিচালক হিসেবে মনোনীত করেন।
বর্তমানে তিনি দরসে নিজামীর জটিল কিতাবসমূহ অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে পাঠদান করছেন। বিশেষত সিহাহ সিত্তার গ্রন্থসমূহ, যেমন মুসলিম শরীফ, শরহে আকায়েদ প্রভৃতি তাঁর পাঠদানের অন্তর্ভুক্ত। ইনশাআল্লাহ, নতুন শিক্ষা বর্ষে বুখারী শরীফের কিছু অংশও তাঁর দায়িত্বে অর্পিত হবে।
❖ আধ্যাত্মিক জীবন
তিনি হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর খলিফা হযরত শাহ আবরারুল হক (রহ.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং তাসাউফের পথে আত্মশুদ্ধির সাধনায় নিয়োজিত রয়েছেন।
দাওরায়ে হাদিসের বছরে খতমে বুখারীর এক অনুষ্ঠানে, সকলের নীরবতার মাঝে তিনি সাহসিকতার সাথে তিলাওয়াত করে উস্তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করেন—যা তাঁর আধ্যাত্মিক সাহস ও আন্তরিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
❖ রচনাবলী
পাঠদানের পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ লেখকও। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:
১. তুহফাতুল ফাওয়ায়েদ ফি হল্লি শরহিল আকায়েদ
২. আল-বয়ান ফি তাফসীরে উম্মুল কুরআন
৩. আন-নূরুন্নামী ফি হল্লি শরহিল জামী
৪. আল-ইরফান
৫. তুহফাতুত তালিব
৬. নিমাতুল ওয়াদূদ ফি হল্লি সুনানে আবি দাউদ
তথ্য সংযোজন ও সংকলন - আমরা জামিয়ার গর্বিত সন্তান