05/03/2026
প্রতিদিন একটি আয়াত ও হাদিস - ৩
সূরা আল-বাকারাহ (আয়াত ১)
الٓمٓ (আলিফ-লাম-মীম)
১. পরিভাষা: হরুফে মুকাত্তাআত
আরবি ভাষায় এই অক্ষরগুলোকে বলা হয় 'হরুফে মুকাত্তাআত' বা 'বিচ্ছিন্ন অক্ষর'। পবিত্র কুরআনের ২৯টি সূরা এই ধরনের অক্ষর দিয়ে শুরু হয়েছে। এগুলো তিলাওয়াতের নিয়ম হলো প্রতিটি বর্ণকে আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করা (যেমন: আলিফ-লাম-মীম), মিলিয়ে পড়া নয়।
২. প্রধান প্রধান তাফসির ও ব্যাখ্যা
তফসিরবিদগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মত প্রদান করেছেন:
ক. আল্লাহর গোপন রহস্য (বিখ্যাত মত):
হযরত আবুবকর (রা.), ওমর (রা.), ওসমান (রা.), আলী (রা.) এবং ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতো মহান সাহাবীদের মতে, এই অক্ষরগুলো আল্লাহর কিতাবের গোপন রহস্য।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তাআলা প্রতিটি আসমানী কিতাবেই কিছু রহস্য রেখেছেন। 'আলিফ-লাম-মীম'-এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। মুমিনদের কাজ হলো এর অর্থ না বুঝলেও এটি যে আল্লাহর কালাম, তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।
খ. অলৌকিকত্বের চ্যালেঞ্জ (ইজায):
ইমাম ইবনে কাসীর এবং জামাখশারীর মতে, এটি মক্কার কাফেরদের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ।
ব্যাখ্যা: কুরআন যে ভাষা ও বর্ণমালা (আলিফ, বা, তা...) দিয়ে গঠিত, আরবরাও সেই একই ভাষা ব্যবহার করত। আল্লাহ এই অক্ষরগুলো দিয়ে শুরু করে বুঝিয়ে দিয়েছেন—"এই কিতাব তোমাদের পরিচিত বর্ণমালা দিয়েই তৈরি; যদি তোমরা মনে করো এটি মানুষের রচনা, তবে এই বর্ণগুলো ব্যবহার করে এর মতো একটি সূরা বানিয়ে দেখাও।" তারা তা করতে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণিত হয়েছে।
গ. মনোযোগ আকর্ষণ (ইস্তিবাহ):
কিছু মুফাসসিরের মতে, এগুলো শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্যাখ্যা: যখন রাসুল (সা.) কুরআন পাঠ করতেন, কাফেররা হট্টগোল করত। তখন এই অপরিচিত ও রহস্যময় ধ্বনিগুলো শুনে তারা কৌতূহলী হয়ে চুপ হয়ে যেত, আর তখনই পরবর্তী আয়াতগুলো তাদের হৃদয়ে গেঁথে যেত।
ঘ. সংকেত বা প্রতীকী অর্থ:
কোনো কোনো মুফাসসির মনে করেন এগুলো আল্লাহর নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন:
আলিফ (أ): আল্লাহ।
লাম (ل): জিবরাঈল (আ.) [যিনি ওহী নিয়ে আসতেন]।
মীম (م): মুহাম্মদ (সা.) [যাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো]।
(তবে এই ব্যাখ্যাটি অধিকাংশ আলেমদের কাছে সুনিশ্চিত নয়)।
৩. আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও তাৎপর্য
অহংকার চূর্ণ করা: মানুষ যতই জ্ঞানী হোক, আল্লাহর কিতাবের একটি বর্ণের অর্থও সে আল্লাহর জানানো ছাড়া বুঝতে পারে না। এটি মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।
অদৃশ্য বিষয়ের ওপর ঈমান: অর্থ না জেনেও এটি পাঠ করা এবং সত্য বলে বিশ্বাস করা 'গায়েব' বা অদৃশ্যের ওপর ঈমানের একটি অংশ।
অফুরন্ত সওয়াব: যদিও আমরা এর অর্থ জানি না, তবুও রাসূল (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী প্রতিটি অক্ষর (আলিফ, লাম, মীম) পাঠের জন্য পৃথকভাবে ১০টি করে নেকি পাওয়া যায়।
সারকথা
'আলিফ-লাম-মীম' এমন এক অলৌকিক বাণী যা একদিকে যেমন মানুষের বুদ্ধিকে হার মানায়, অন্যদিকে মুমিনের অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্ব বাড়িয়ে দেয়। এটি পবিত্র কুরআনের সেই মহাসমুদ্রের প্রবেশদ্বার, যার গভীরতা পরিমাপ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে।