30/04/2026
দোকান মার্কেট বন্ধ নয়, প্রয়োজন 'স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট: জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান।
অর্থনীতিকে সচল রেখে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে ঢালাওভাবে দোকান বন্ধ না করে 'স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট' বা সুশৃঙ্খল বিদ্যুৎ ব্যবহারের করে ৭ টায় দোকানপাট বন্ধের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। মনে রাখা দরকার খুচরা বিক্রয় কমে গেলে পাইকারি এবং উৎপাদন ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। একটা শ্রেণীর মানুষের আয় কমলে তার প্রভাব কিন্তু অন্য শ্রেণীর মানুষের মধ্যে পড়ে। এক সময় কারখানাগুলো তাদের শ্রমিক ছাটাই করবে দোকানি এবং বিপোণি বিতানগুলোও তাদের কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনবে। এর ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে অর্থনীতির চাকা হবে মন্থর।বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এটা আমাদের মানতেই হবে। দেশজ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার রাত ৮টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বিকল্প হিসেবে 'আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণ' ও 'চাহিদা ব্যবস্থাপনা' হতে পারে এক বৈপ্লবিক সমাধান।বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ অপচয় হয় কেবল অসচেতনতা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোর ব্যবহারের কারণে। বিশেষ করে বিপণি বিতান গুলোতে পণ্যকে আকর্ষণীয় করতে যে পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতার এলইডি বা স্পটলাইট ব্যবহার করা হয়, তার অর্ধেকই অপ্রয়োজনীয়। যদি সরকারিভাবে 'স্কয়ার ফিট প্রতি ওয়াট' নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এবং কঠোর মনিটরিং করা হয়, তবে দোকান খোলা রেখেই বড় অংকের বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। এতে ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎ বিল কমবে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ প্রশমিত হবে। ২০২৪-২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি সাধারণ চিত্র হলো:মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,০০০+ মেগাওয়াট, সর্বোচ্চ চাহিদা (গরমকালে)১৬,০০০ - ১৭,৫০০ মেগাওয়াট, গড় উৎপাদন খরচ (প্রতি ইউনিট)১১ - ১৫ টাকা (জ্বালানি ভেদে),গড় বিক্রয় মূল্য (প্রতি ইউনিট) ৮ - ৯ টাকা ,ভর্তুকি ও ঘাটতি প্রতি ইউনিটে প্রায় ৩-৬ টাকা লোকসান ।সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ করছে, তার চেয়ে অনেক কম দামে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করছে। এই বিশাল ঘাটতি বা ভর্তুকির বোঝা কমাতে হলে ঢালাওভাবে বিদ্যুৎ এর ব্যবহার বন্ধের চেয়ে 'পরিমিত ব্যবহার' বেশি কার্যকর। কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতেও বিদ্যুতের ব্যাপক অপচয় ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কক্ষ খালি থাকলেও এসি বা লাইট সচল থাকে। বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের 'এনার্জি অডিট' করা এখন সময়ের দাবি।এসি নিয়ন্ত্রণ: এসির তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াসের নিচে না নামানোর বাধ্যবাধকতা কার্যকর করলে প্রায় ১৫-২০% বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার: দিনের বেলা জানালার পর্দা সরিয়ে প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। দোকান খোলা রেখে সাশ্রয়ের ফর্মুলা হিসাবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে বিদ্যুৎ বাঁচাতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
• লুমেন স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ: বিপণিবিতানের আয়তন অনুযায়ী কত লুমেন (আলোর তীব্রতা) ব্যবহার করা যাবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া।
• স্মার্ট মিটারিং: বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে স্মার্ট মিটার স্থাপন করে রিয়েল-টাইম বিদ্যুৎ ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা।
• অপ্রয়োজনীয় সাইনবোর্ড বন্ধ: সন্ধ্যার পর শুধুমাত্র দোকানের ভেতর প্রয়োজনীয় আলো রেখে বাইরে অতিরিক্ত ঝিকিমিকি বা বিজ্ঞাপনী আলোকসজ্জা রাত ৮টার পর নিষিদ্ধ করা।
দোকানপাট খোলা থাকলে অর্থনৈতিক হাতবদল (Money Circulation) সচল থাকে। খুচরা বিক্রয় সচল থাকলে ভ্যাট আদায় বাড়ে, যা সরকারের রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সহায়ক। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।জ্বালানি সাশ্রয়ের অর্থ এই নয় যে অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে হবে। বরং বিজ্ঞানের ভাষায় 'এনার্জি এফিসিয়েন্সি' বা দক্ষতার সাথে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হলো আধুনিক সমাধান। বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে চাহিদার সঠিক ম্যাপিং এবং আলোকসজ্জায় শৃঙ্খলা আনতে পারলে সন্ধ্যা ৭টায় শাটডাউন না করেও দেশকে অন্ধকার থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আমাদের এখন 'সাশ্রয়ী সংস্কৃতি'র দিকে এগোতে হবে।
মোঃ মিজানুর রহমান, চেয়ারম্যান,সেভ দি ন্যাচার এন্ড লাইফ