11/01/2026
ট্যাগিং ট্রাবল
লেখক: অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম
ব্যক্তিগতভাবে, পারিবারিকভাবে, জাতিগতভাবে, সামাজিকভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন সমস্যা, বিড়ম্বনা, জটিলতা এবং ট্যাগিং নামক ট্রাবল দ্বারা মানব সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উন্নয়ন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকার কর্তৃক নিবন্ধনকৃত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের শর্ত হিসেবে শতকরা ৯৫ ভাগ সংস্থার বাধ্যতামূলক ম্যান্ডেট যথা- i) লাভের জন্য নয়: প্রফিট নট ফর পার্সন, মানে বেতন-ভাতাদি ছাড়া পকেটে পয়সা নেওয়ার আইনগত, ধর্মীয়, সামাজিকভাবে অর্থগ্রহণ করা বৈধ নয়, জায়েজ নয়, হারাম। ii) অরাজনৈতিক: অনুমোদিত গঠনতন্ত্র মোতাবেক কোনো প্রকার পার্টিজান পলিটিক্স অর্থাৎ দলভুক্ত হয়ে রাজনীতি করা যাবে না, অথচ এই জাতীয় জনকল্যাণ উন্নয়নমূলক সংস্থার এ-টু-জেড সকল কার্যক্রমই জাতীয় রাজনীতি সহায়ক। রাজনীতির উদ্দেশ্য মানব সেবা ও মানুষের কল্যাণে দেশকে সমৃদ্ধকরণ। রাজনীতির গুরুত্ব অপরিসীম, রাজনীতিবিদগণের সম্মান আকাশচুম্বি, সম্পদ তলানিতে থাকবে। রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দল যে দেশের যতো ভালো সে দেশের উন্নয়ন ও সম্মান বিশ্বের ততো উপরিস্তরে। টিএমএসএস তুল্য বেসরকারি সংস্থাগুলো সকল রাজনীতিবিদ এবং সকল রাজনৈতিক দলের সাম্যতাভিত্তিক উন্নয়ন এলিমেন্ট হিসেবে নিয়ামক। রাজনীতিবিদগণ মানব সেবা, জাতির সেবা, জাতির সমৃদ্ধি না করে ব্যক্তিসম্মান টেকসহিতা বিবেচনায় না নিয়ে ব্যক্তিসমৃদ্ধ, ব্যক্তিসম্পদ অর্জন করলে তখনই বিপর্যয় ঘটে। অরাজনৈতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা প্রলুব্ধ হয়, রাজনীতি করতে চায়, পাওয়ার-এ যেতে চায়। নিজ সংগঠনের গঠনতন্ত্রকে গৌণ করে রাজনীতিবিদদের আতিশয্যে প্রলুব্ধ হয়ে যারাই পার্টিজান পলিটিক্স করেছে, করবে তাদের সংস্থা ক্ষয়িষ্ণু হতে বাধ্য। যথা- সপ্তগ্রাম নারী স্বনির্ভর পরিষদ, গণ সাহায্য সংস্থা, প্রশিকা ইত্যাদি। তাদের এ কাণ্ড করার ফলে এবং এনজিও অঙ্গনের মানুষ হয়ে দেশের শাসক হতে গিয়ে এদেশের সকল এনজিও’র প্রতি সচেতন, আদর্শিক জনগণের বাঁকা নজর, বিদ্রুপ বাণী এবং সন্দেহের সমাহার ঘটেছে, ঘটে থাকে। iii) ধর্মনিরপেক্ষতা: সংস্থা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা থাক আর না থাক বিগত সরকারগুলো গঠনতন্ত্র অনুমোদন, নবায়ন পেতে হলে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি লেখার বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশে প্রায় ৯০ ভাগ মুসলিম। মুসলমানদের জীবনযাত্রার সংবিধান আল-কোরআন। যা একটি সার্বজনীন, সর্বধর্মের মৌলিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কোড অব লাইফ, যাতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরও স্বাধীনতা, নিরাপত্তার গ্যারান্টি আছে। রাজনীতি তথা রাষ্ট্রের মাধ্যমেও সকল ধর্মের সকল মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য পালনীয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণিত আছে, নির্দেশনা আছে। ইসলাম ধর্ম মোতাবেক রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার কোনো সুযোগ, পথ-পন্থা নাই। তেমনি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানেরও একই দশা। তাই ইসলাম ধর্ম মতে সেক্যুলারিজম এবং ধার্মিকতাকে এক করে দেখার সুযোগ নাই। কিন্তু আয়রনি হচ্ছে গঠনতন্ত্রে সেক্যুলারিজম লিখতেই হবে। টিএমএসএস কর্তৃপক্ষ সেক্যুলারিজম বিষয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সে স্থলে সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, স্ব-স্ব ধর্মের প্রতি পূর্ণ আস্থা এ কথা প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে বারংবার বিধির বাম হয়। মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন এবং আর্টিকেলস অফ অ্যাসোসিয়েশন অনুমোদন না দিয়ে ফেরৎ দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, বিএনপি, জামায়াত, শিবির ইত্যাদি ট্যাগিং-এর ট্রাবল দিয়ে কত যে বিড়ম্বনা করা হয়! তার শেষ নাই। এছাড়াএ টিএমএসএস-এর ক্ষেত্রে iv) অন্তর্ভুক্তিমূলক: নিম্ন থেকে ঊর্ধ্বগামী সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতামূলক অনুশাসন। এই চার নম্বর মৌলিক ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না এ নিয়ে কারোরই আগ্রহ নাই। জবাবদিহিতার দ্বারা সুশাসন, শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা হলে ট্যাগিং অস্ত্রধারীগণের সামান্য হলেও ট্রাবল হয়। তাই সংস্থার সুশাসন, শুদ্ধাচার নিয়ে আমার ৪৫ বছর সংস্থার জীবনে কোনো সুশীল, সাংবাদিক কারো নিকট মুখোমুখী হতে হয় নাই, জবাব দিতে হয় নাই। চার নম্বর মুখ্য মূলনীতি ব্যত্যয় হলে দাবিকারী চাঁদাবাজ ট্যাগিং দাতাদের ক্ষেত্র উর্বর হয়।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পার্টিজান-ভুক্ত হলে স্বীয় পার্টি যদি দেশ শাসনের ক্ষমতায় থাকে স্বীয় ব্যক্তি, স্বীয় সংস্থা/প্রতিষ্ঠান নানাভাবে সুবিধা পায়। যথা: i) সরকারি অনুদান। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের রেজিম পূর্বকালে টিএমএসএস যা সরকারি অনুদান পেয়েছে, প্রকল্প পেয়েছে, দেশের জাতীয় বাজেট অভাবনীয়ভাবে বাড়লেও টিএমএসএস-এর অনুদান অভাবনীয়ভাবে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে, প্রকল্প পাওয়া যায় নাই। ii) ব্যাংক। সিডিউল ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে জনগণের টাকা মুছে নিয়ে ব্যক্তি-গোষ্ঠী বৈভবে সুযোগ ভোগ করা। iii) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। নীতিগতভাবে লাভের জন্য না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় দ্বারা ট্রাস্টি নামে ব্যক্তি-পরিবার-গোষ্ঠী ভোগ বিলাস করে, বিদেশ ভ্রমণ করে, সেই ভাউচার অডিটেও গ্রহণ হয়। iv) বীমা। ব্যাংকতুল্য বীমার দ্বারা ক্লায়েন্টগণের প্রিমিয়াম আত্মসাৎ করলেও বীমা দাবি (ক্লেম পেমেন্ট) যুগের পর যুগ অধরাই থেকে যায়। v) টিভি চ্যানেল। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া যায়, ট্যাগিং অস্ত্র ব্যবহার করার অবারিত সুযোগ পাওয়া যায়। সৎ, সচ্ছল সম্পদধারীদেরকেও তটস্থ রাখা যায়। vi) এফএম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও, প্রিন্ট মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, vii) জাতীয় পুরস্কার, ইত্যাদি অস্ত্র পেতে গেলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনুকম্পা লাগে। টিএমএসএস এই অনুকম্পাগুলোর কি একটিও পেয়েছে? কিছুই পায় নাই। কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলভুক্ত হতে গেলে i) পার্টির সাধারণ সদস্যপদ, ii) পার্টির রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, iii) পার্টির অনুকূলে অর্থায়ন, iv) পার্টি অফিসে পদার্পণ, v) নির্বাচনকালে পার্টিভুক্ত হয়ে প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ, ইত্যাদি কোনো কাজে কখনোই টিএমএসএস অংশগ্রহণ না করে সংস্থার সাংবিধানিক মুখ্য মূলনীতি প্রতিপালন করে আসছে।
টিএমএসএস এবং এ জাতীয় অরাজনৈতিক সংস্থা কর্তৃক সরকারকে শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ছাড়া সংগ্রাম ও সহিংস কিছু করার ম্যান্ডেট নাই, বৈধ নয়। ইহা সংস্থাগুলোর চেতনা, পলিসি প্রতিবন্ধিতা বলা যেতে পারে। সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের দুর্গম জনপদের উন্নয়ন কাজে জনসম্পৃক্ততা করে সরকারের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে নিরীহ শক্তি হিসেবে ভুমিকা রাখা ছাড়া রাজনৈতিক অভিলাসের পথ-পন্থা নাই। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজনীতিকে যারা রোজগারের অবলম্বন মনে করে, তারা টিএমএসএস জাতীয় সংস্থাগুলোকে প্রতিপক্ষ গণ্য করে মূলত উন্নয়নই ব্যাহত করেন।
দুঃখের বিষয়, যে পার্টি যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে সেই পার্টি টিএমএসএস-কে ভালো বলে, ট্যাগ দেয় না। আবার ঐ পার্টিই যখন ক্ষমতায় যায় তখন ট্যাগ দেওয়ার শেষ নাই। জনস্বার্থে ঐ ক্ষমতাসীন পার্টির নিকট কোনো কিছু চাইতে গেলে ট্যাগ দিয়ে, তহমত দিয়ে ফেরত দেয়। বগুড়ার কৃতি সন্তান সাবেক সচিব, জাতীয় যাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও টিএমএসএস আর্ট অ্যান্ড কালচারাল একাডেমীর স্বপ্নদ্রষ্টা মরহুম ড. এনামুল হক বলতেন, “ধান্দাবাজ ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদগণের এই ট্যাগিং কৌশলকে রিফিউজাল কৌশল বলা হয়, এটা তারা করবেই। পার্সেন্টেজ, কমিশন না দিলে কিছুই দিবে না, পাবা না"।
দেশের রাজনীতিবিদদের মানবিক গুণাবলি এবং সততা বৃদ্ধি না হলে ধরেই নিতে হবে, যখন যে দল ক্ষমতায় আসবে তারা ট্যাগ দিবে। ট্যাগিং ট্রাবল ফেস করেই চলতে হবে। যারা ট্যাগ দেয়, যুক্তি, দালিলিক প্রমাণ তাদের নিকট মুখ্য নয়। তাদের নিকট মুখ্য ক্ষমতায় আসতে ব্যয় বিধান হয়েছে, তাই ব্যয়-বিধানের অংশ তারা চাইবে। এজন্য রাজনীতিতে ব্যয়-বিধান কমাতে পারলে টিএমএসএস তুল্য উন্নয়ন সংগঠনগুলোর উপর থেকে চাপ কমবে।
প্রিয় পাঠক, শুধু দেশীয় রাজনীতিবিদগণ যে ট্যাগ দেয় তা নয়। বৈদেশিক অনুদানহীন জনিত কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ লাইসেন্স টিএমএসএস-এর নিষ্প্রয়োজন ঘোষণা হওয়ার উপক্রম হলে অনেক চেষ্টা করে অতি স্বল্পমাত্রায় টুকি-টাকি অনুদান নিয়ে লাইসেন্স টিকিয়ে রাখা আছে। পতিত সরকারের রেজিম শেষের দিকে ২০২৪ সালে কোরিয়ান ডোনার অভাবনীয় পরিমাণ ডোনেশন দেওয়ার কমিটমেন্ট লেটার দিলে যথাযথ পদ্ধতিগতভাবে সরকারি ছাড়পত্র পেতে পেতে সরকারের রেজিম শেষ, সরকারের পলায়ন, ডোনার নিষ্ক্রিয়। জানা গেছে, তারাও ট্যাগিং দিচ্ছে টিএমএসএস-এর সহযোগিতায় খাদ্যি-খানা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পুস্তকসহ লেখা-লেখুনীতে তারা শুধু অসন্তুষ্টই নয় সংক্ষুব্ধ, ফান্ড ছাড় করছে না। প্রকৃত কথা এই যে, টিএমএসএস সংস্থা হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে নাই। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও স্বার্থে ভাবাবেগে টিএমএসএস-এর অগণিত কর্মকর্তা-কর্মচারী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সর্বপ্রকার সহযোগিতা এবং অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। টিএমএসএস সংস্থাগতভাবে সরকার পরিবর্তনের কখনোই কোনো চেষ্টা করে না, বরং সরকারের স্থায়িত্বকাল প্রলম্বিত, গণতন্ত্র সমুন্নত ইত্যাদি কাজ দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হিসেবে টিএমএসএস-এর কাঙ্খিত। দারিদ্র্য দুর্দশা আনয়ন করে। দুর্দশার বেশির ভাগই নারী এবং শিশুদের দিকে গড়ে। তাই নারী সংস্থা হিসেবে টিএমএসএস নারী ক্ষমতায়নের জন্য একাট্টা। যে জাতির নারী যতো ক্ষমতায়িত সে জাতির মানব গোষ্ঠী ততো সমৃদ্ধ, জ্ঞানী, গুণী। তাই নারীর প্রতি সহানুভূতি, নারী পক্ষ হওয়া মানে সমগ্র জাতির পক্ষ হওয়া।
দেশের এমপি-মন্ত্রী হতে গেলে অর্থ অপেক্ষা ন্যায়পরায়ণতাকে বড় ও উপাদেয় সম্পদ ভাবতে বাধ্য হতে হবে। পূর্ব বন্দোবস্ত থেকে পরিবর্তিত বন্দোবস্ততে মানুষ মানবিক হতে বাধ্য হবে। নচেৎ সমাজ অমানবিক মানুষকে প্রত্যাখ্যান করবে। ৩৬শে জুলাই-এর মুখ্য অর্জন বাস্তবায়ন হলে দায় ও দরদের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে ব্লেমিং বঞ্চনা, ট্যাগিং ট্রাবল থাকবে না।
প্রিয় পাঠক, প্রবন্ধের শিরোনামভুক্ত সমস্যায় টিএমএসএস সবসময়, বারংবার আক্রান্ত হলেও সকল শাসক, সুশীল, সচেতন মানুষের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে আহ্বান করি আমাদেরকে অনুসন্ধান করুন, বাস্তবতা অনুধাবন করুন, ট্যাগিং ট্রাবল দিয়ে ক্ষতি ছাড়া লাভ নাই। আর এই ক্ষতির কবলে যারা পড়বে তারা নেহায়েত সকলের কাছে থেকে পাওনাদার, হকদার, দাবিদার। ফরজে আইনের হক্কুল ইবাদ কাযা না করে সাদা সরল মনে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে টিএমএসএস অনুকূলে সাহায্য, সহযোগিতা করুন।
লেখক: অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।
#টিএমএসএস