23/11/2025
মামা সুপার আইসক্রিম :স্বপ্ন থেকে সফলতা।।।।
ভোলা জেলার লালমোহন ধলীগোর নগর গ্রামের ধূলিমাখা পথ। সেখানে, ১৯৮৫ সালের এক সোনালী ভোরে, জন্ম নিয়েছিলেন মো: সুমন মিয়া। আটত্রিশ বসন্তের এই মানুষটির শৈশব কেটেছে লাবণ্যময় মেঘনা নদীর তীরে। জীবনযুদ্ধের প্রথম পাঠ নেন ধলীগোর নগর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে, এসএসসি পাশ করেন ২০০৩ সালে। তারপরই নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যায় ইট-পাথরের মহানগর ঢাকাতে।
২০০৯ সাল পর্যন্ত ‘জাস্ট স্টিল বিল্ডিং কন্সট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড’-এ ওয়েল্ডিং-এর কাজ করেছেন সুমন। তার হাতে ছিল লোহা গলানোর মন্ত্র, চোখে ছিল স্বপ্ন গড়ার ঝলক।
২০০৯ থেকে ২০১৪—পাঁচটি বছর কাটালেন সুদূর সিঙ্গাপুরের আকাশছোঁয়া দালানকোঠায়, নির্মাণশ্রমিক হিসেবে। তারপর গন্তব্য হলো মালয়েশিয়া, যেখানে ২০২০ সাল পর্যন্ত ওয়েল্ডিং ডিপার্টমেন্টে তার নিপুণ হাতের স্পর্শ লেগেছে। বিদেশে এই কঠোর জীবন তাকে শিখিয়েছিল ধৈর্য, পরিশ্রম আর মূলধন সঞ্চয়ের শিল্প।
কিন্তু মাটির ডাক তো আর উপেক্ষা করা যায় না! ২০২০ সালে, সুদূর প্রবাসের জীবন ছেড়ে সুমন মিয়া ফিরলেন তার প্রিয় জন্মভূমিতে। এবার আর অন্যের স্বপ্ন গড়ার কারিগর নন, নিজের স্বপ্ন বুনতে শুরু করলেন। হাতে নিলেন বরফের শীতলতা আর দুগ্ধের শুভ্রতা মাখা ব্যবসা—আইসক্রিম ও দুগ্ধজাত পণ্য।
এই নতুন পথের দিশারী হলেন তার আপন মামা, মো: আবদুর রাজ্জাক। মামা-ভাগ্নের এই বন্ধন, যা শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, এক নতুন ভরসার প্রতীক। তাদের ব্যবসার নাম হলো—মামা সুপার আইসক্রিম। এই নাম শুধু একটি বাণিজ্যিক পরিচিতি নয়, এটি যেন মাতৃস্নেহ ও পারিবারিক বন্ধনের একটি শীতল আহ্বান।
বরহানউদ্দিন, ভোলাতে শুরু হয় তাদের স্বপ্নের কারখানা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাথে ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটালেন তারা। চিলার মেশিন, পাস্তুরাইজেশন মেশিন, বয়লার এবং অটোমেটেড প্যাকেজিং মেশিনের নিপুণতা দিয়ে তৈরি হতে লাগল সেই আইসক্রিম—যা কেবল মিষ্টি নয়, ছিল নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর দুগ্ধপণ্য উৎপাদনের প্রতিশ্রুতির প্রতীক।
কাপ আইসক্রিম, কোণ আইসক্রিম, মালাই আইসক্রিম, চকবার, লোকাল আইসক্রিম—প্রতিটি পণ্যই যেন গ্রীষ্মের এক-একটি প্রশান্তি। আর তাদের দধি! তাদের দধির রয়েছে গর্বের বিএসটিআই সনদ, যা গুণগত মানের এক অলিখিত মানদণ্ড।
আজ তাদের সাফল্য এক শীতল স্রোতের মতো বহমান:
• প্রতি মাসে ২ লাখ পিসের বেশি আইসক্রিম বিক্রি হয়।
• ৫ হাজার কাপ দধি খুঁজে নেয় ভোজনরসিকের মন।
• ভোলা জুড়ে রয়েছে ৩০টি বিক্রয়কেন্দ্র (আউটলেট) এবং নোয়াখালীতেও তাদের পণ্যের কদর বাড়িয়ে তুলেছে আরও তিনটি আউটলেট।
এই যাত্রাপথে, ভোলার গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার আরএমটিপি প্রকল্প থেকে থেকে তারা পেয়েছেন কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা। এই সমর্থন তাদের শুধু পুঁজি জোগায়নি, জুগিয়েছে আত্মবিশ্বাস।
সফলতার এই পর্যায়েও তারা থেমে নেই। তাদের দৃষ্টি এখন আরও বড় দিগন্তে—এগ্রো ফার্মিং-এর দিকে। কারণ তারা জানেন, পণ্যের মূল উৎস যদি বিশুদ্ধ হয়, তবে তার স্বাদ ও গুণগত মান অটুট থাকবে।
মো: সুমন মিয়া এবং মো: আবদুর রাজ্জাকের এই গল্প—কেবল ব্যবসার উত্থান নয়; এটি হলো প্রবাসের কাঠিন্য থেকে জন্মভূমিতে ফিরে আসার গল্প, মামা-ভাগ্নের সম্পর্কের দৃঢ়তার গল্প এবং কঠোর পরিশ্রম আর সততার মধ্য দিয়ে বরফের মতো শীতল স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার এক উজ্জ্বল উপাখ্যান। তাদের 'মামা সুপার আইসক্রিম' আজ ভোলার এক অনুপ্রেরণা।
মোঃ রুহুল আমিন রুয়েল
ভিসিএফ(ডেইরি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট) আরএমটিপি প্রকল্প
গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)
ভোলা।
২৩/১১/২৫ ইং