26/04/2026
তরজুমানে আকাবির, আরেফবিল্লাহ, শায়খুল হাদীস, শায়খুল উলামা, মুসলীহে উম্মাহ, মুহীউস সুন্নাহ, লীসানে আখতার, আখতারে সানী, যুগের হাকীমুল উম্মত,
আল্লামা শাহ আবদুল মতীন বিন হুসাইন [দামাত বারাকাতুহুম] পীর সাহেব ঢালকানগর-এর বয়ান
১৭-০৪-২০২৬ শুক্রবার। (জুমার পূর্বের বয়ান)
বায়তুল হক জামে মসজিদ, ঢালকানগর, ঢাকা।
কোরআনের মানদণ্ডে
যারা বলে
কোরআন মানি, হাদীস মানি না
الحمد لله،
الحمد لله وكفى
وسلام على عباده الذين اصطفى
أما بعد
فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم
بسم الله الرحمن الرحيم
أَطِیعُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ
صدق الله مولانا العظيم
وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم لايؤمنُ أحدُكم حتى أكونَ أحبَّ إليه من والدِه ولدِه والناسِ أجمعِينَ
اوكما قال رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم.
বয়ানের শুরুতেই সবাইকে নিয়ে মাওলায়ে করীমের দরবারে
আল্লাহপাক জাল্লা জালালুহু ওয়া আম্মা নাওয়ালুহু
আমাদের সকলকে মাফ করেন।
সমস্ত মুসলমানকে মাফ করেন।
গুনাহ থেকে, গাইরুল্লাহ থেকে আমাদেরকে হেফাযত করেন।
আল্লাহর মহব্বত-মারেফত দান করেন।
আল্লাহপাকের ইবাদত-বন্দেগির তাওফীক দান করেন।
সুন্নত মোতাবেক, শরিয়ত মোতাবেক জিন্দেগি দান করেন।
জান্নাতুল ফেরদাউস আমাদের জন্য মঞ্জুর করেন।
আউলিয়ায়ে সিদ্দীকীনে কামেলীনের মধ্যে আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে,
আমাদের পরিবার-পরিজন, খানদান, সন্তানাদি
সকলকে আল্লাহ তা'আলা কবূল করেন।
কোরআনের নসিহত মোতাবেক জিন্দেগি গড়লে বান্দা জান্নাতওয়ালা হয়ে যায়
কোরআনে কারীমে মহান রব্বুল আলামীন যে কথা বলেন একেক কথা এরকম যে,
ঐ নির্দেশ,
ঐ নির্দেশনা,
ঐ আদেশ-নিষেধ,
ঐ হুকুম,
ঐ নসিহত মোতাবেক বান্দা যদি নিজেকে গড়ে তোলে তো দেখা যায় যে, তার পুরা জিন্দেগি
ঈমানওয়ালা
নূরওয়ালা এবং
জান্নাতওয়ালা হয়ে যায়।
একদম কামিয়াব হয়ে যায়।
কোরআনের মূল কথা হল—তোমরা আল্লাহকে মান এবং রসূলকে মান
পুরা কোরআনে কারীমে রব্বুল আলামীন যে সকল বিষয়াদি মৌলিকভাবে বলেন, তার মধ্যে একটা বিষয় হচ্ছে যে,
তোমরা আল্লাহর কথা মান,
রাসূলের কথা মান।
তোমরা দেখ যে—
তোমরা আল্লাহর আনুগত্যশীল কি না,
আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যশীল কি না।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথার ওপরে তোমাদের জিন্দেগি চলছে কি না।
তোমাদের দিনরাত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মোতাবেক কি না।
তোমাদের কর্মকাণ্ড আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হেদায়েত মোতাবেক কি না এবং
নির্দেশনা মোতাবেক কি না।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপরে তোমাদের নজর রাখতে হবে।
যারা বলে—কোরআন মানি, হাদীস মানিনা—এরা কী গোমরাহ, নাকি কোন ষড়যন্ত্রকারী মুসলমান?
কিছু লোক আছে যারা বলে যে,
আমরা কোরআন মানি। কিন্তু হাদীস শরীফ মানি না।
এরা কি ধরনের মানুষ!
কি ধরনের মুসলমান!
এরা কি বিভ্রান্তির শিকার মুসলমান?
গোমরাহীর শিকার মুসলমান? নাকি
এরা কোন ষড়যন্ত্রকারী মুসলমান?
এটা স্পষ্টভাবে আমরা বুঝতে পারি না। আল্লাহ এদের অবস্থা ভালো জানেন।
রাসূলের কোনো কথাই নিজস্ব না, সবই ওহীর আলোকে এবং কোরআনেরই ব্যাখ্যা
যেখানে কোরআন শরীফে রব্বুল আলামীন বারবার বলতেছেন যে, আমার রসূলকে তোমাদেরকে মানতে হবে, আমার রাসূলের কথা তোমাদেরকে শুনতে হবে।
وَمَا یَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰۤ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡیࣱ یُوحَىٰ
আমার রাসূল নিজের থেকে বলেন না। যেটা বলেন সেটা ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে তিনি বলেন।
گفتۂ او گفتۂ اللہ بود گر چہ از حلقوم عبداللہ بود
তার সব কথাই মহান আল্লাহর কথা। যদিও তার জবান থেকে সেটা বের হয়।
কোরআন যেরকম লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং মুখ্য অনুরূপভাবে কোরআনের ব্যাখ্যাটাও লক্ষ্য এবং মুখ্য
যাঁরা সাহাবায়ে কেরাম রা. ছিলেন
তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ছিলেন।
তাঁরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের কথাগুলোকে সংরক্ষণ করতেন, হেফাজত করতেন। কারণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের কথাগুলো কোরআনের ব্যাখ্যা। কোরআন যেরকম লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং মুখ্য অনুরূপভাবে কোরআনের ব্যাখ্যাটাও লক্ষ্য এবং মুখ্য।
কোরআনের ব্যাখ্যা না জানলে কোরআনের উপরে আমল করা সম্ভবই হবে না
কারণ কোরআনের ব্যাখ্যা যদি আমরা না জানি তাহলে
কোরআনের নির্দেশের উপরে,
কোরআনের হেদায়েতের উপরে,
দিক নির্দেশনার উপরে
আমল করা সম্ভবই হবে না। যেমন—কোরআনে রাব্বুল আলামীন বলেছেন— أَقِیمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ
‘তোমরা নামায কায়েম কর।’
কিন্তু—
১. কোরআন শরীফের কোথাও নামাযের বিস্তারিত নিয়ম বলা নেই।
২. সেজদা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেজদার ধরণটা কি? আকৃতিটা কি? কোরআনে এর বিবরণ নেই।
৩. নামাযের মধ্যে রুকু করতে বলা হয়েছে। রুকুর কোন বিবরণ, কিভাবে করলে, কতটুকু করলে, রুকু আদায় হবে, নির্দেশটা পালন হবে এর হুবহু বিবরণ, এর পূর্ণ বয়ান কোরআনে নেই।
৪. নামায পড়তে বলা হয়েছে। কিন্তু নামায শুরু করা হবে কিভাবে, কোন পদ্ধতি উল্লেখ নেই, কোরআনপাকে সেটা বলা নেই।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম বাস্তবে নিজের নামায শিখেছেন জিবরীলে আমীন থেকে
নামায—নামায জিনিসটা কি? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম বাস্তবে সেটা আমল করে দেখিয়ে দিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামকে দেখিয়েছেন হযরতে জিবরীলে আমীন। কা’বা শরীফের সামনে জিবরীলে আমীন ইমাম হয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাঁর মুক্তাদী হয়েছেন।
কোরআনে নামাযের সময়ের সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি উল্লেখ নেই
কোরআন শরীফে রাব্বুল আলামীন বলেছেন যে,
তোমরা সময় মতো নামায আদায় কর।
إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ كَانَتۡ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِینَ كِتَـٰبࣰا مَّوۡقُوتࣰا
ঈমানওয়ালারা নামায পড়বে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময় মোতাবিক। এখন সেই সময়টা কোথায়? কী? এগুলোর একদম সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে চৌহদ্দি সহকারে কোরআনে কারীমে বিস্তারিত বয়ান নেই। কিছুটা আছে। কিন্তু সময়গুলোর পূর্ণ বিবরণ কোরআনেপাকে উল্লেখ নেই।
কোথা থেকে শুরু হবে,
কতদূর পর্যন্ত যেতে হবে,
এতে কোন মাকরূহ ওয়াক্ত আছে কি না,
এসবের বিস্তারিত বিবরণ কোরআনে কারীমে নেই।
কোরআনের যেসব বিধানের বিস্তারিত বিবরণ নেই তার ব্যাখ্যা করবেন তিনি যার উপরে কোরআন নাযিল হয়েছে
এভাবে শরীয়তের অনেক বিধানাবলী আছে যে—আল্লাহপাক জাল্লা জালালুহু ওয়া আম্মা নাওয়ালুহু আমাদেরকে হুকুম করেছেন। কিন্তু তার বিস্তারিত বিবরণটা সেখানে অনুপস্থিত।
তো সেখানে আমরা জানব কোত্থেকে?
যার উপরে কোরআন নাযিল হয়েছে তিনি
দেখাবেন,
বোঝাবেন,
বয়ান করবেন,
ব্যাখ্যা করবেন।
সেখান থেকে উম্মত জানবে।
রাসূলের কথা, কর্ম, আদর্শ সবই কোরআনের ব্যাখ্যা এবং তা মেনে চলাও কোরআনেরই আদেশ
এ বিষয়টাও আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে এমনভাবে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের
কথা,
তাঁর বিবরণ-বিবৃতি-ভাষণ এবং
তাঁর হাঁ বলা,
তাঁর না বলা,
তাঁর কর্ম,
তাঁর আদর্শ
সবগুলোই যে কোরআনেপাকের ব্যাখ্যা সেটা একদম পরিষ্কার।
যেমন এক আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন যে,
لَا تُحَرِّكۡ بِهِۦ لِسَانَكَ لِتَعۡجَلَ بِهِۦۤ
আমি যখন কোরআন নাযিল করি তো দেখা যায় যে—আপনি কোরআন মুখস্ত করার জন্য, যাতে আপনি ভুলে না যান—এটা বারবার মুখে পড়তে থাকেন, ঘন ঘন করতে থাকেন। তো আপনি এটা করবেন না।
إِنَّ عَلَیۡنَا جَمۡعَهُۥ وَقُرۡءَانَهُۥ
এই কোরআনকে—
১. আপনার সিনাতে একদম স্থিত করে দেওয়া, আপনার সিনার ভিতরে মুখস্ত করে দেওয়া এবং সংরক্ষিত করে দেওয়া—এটা আমার দায়িত্বে।
২. এরপরে অন্যদেরকে শোনানোর জন্য, শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোরআনেপাক পড়তে পারা—এটারও আমি দায়িত্ব নিলাম। কথা তো এখন পরিষ্কার হয়ে গেল।
৩. এই কোরআনে জিবরীলের মাধ্যমে যা নাযিল করা হচ্ছে আপনার হৃদয়ে এটাকে স্থিত করে দেওয়া, সংরক্ষিত করে দেওয়া—এটা আমার দায়িত্বে।
৪. এরপরে কোরআনে পাক সেই মোতাবেক ঠিক ঠিকমত পড়া এবং অন্যদেরকে শোনানো সেটাও আমার দায়িত্বে।
ثُمَّ إِنَّ عَلَیۡنَا بَیَانَهُۥ
৫. অতঃপর এই কোরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করায়ে দেওয়া আপনার মাধ্যমে সেটাও আমার দায়িত্বে।
এই যে আল্লাহপাক বললেন—
১. কোরআনেপাক আপনার সিনাতে দিয়ে দেওয়া, মজবুত করে দেওয়া সেটা আমার দায়িত্বে।
২. আবার আপনার জবান থেকে কোরআনের তেলাওয়াত হওয়া, পড়ায়ে দেওয়া সেটাও আমার দায়িত্বে।
৩. অতঃপর এই কোরআনে পাকের বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এটাও আমার দায়িত্বে।
৪. আপনার মাধ্যমে এটার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমি করিয়ে দেব।
কোরআন মানতে চাইলে হাদীস মানা জরুরি
কোরআন যদি তোমরা মান তাহলে কোরআনে তো আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে স্পষ্ট ভাবে বলেছেন যে, আমার রাসূলের মাধ্যমে কোরআনের বয়ান-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমি করে দেব। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম ব্যাখ্যা করবেন কিভাবে? ব্যাখ্যা করলে কথার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করবেন। মানুষ একটা কথা বললে বুঝিয়ে বলে
কথার মাধ্যমে,
কাজের মাধ্যমে,
আমলের মাধ্যমে।
শেখানোর পদ্ধতি ২টি—থিউরিটিক্যাল এবং প্র্যাকটিক্যাল
একজন রিক্সা চালাতে বা ড্রাইভিং শিখতে গিয়েছে তো তাকে বলল যে, আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। তো সে কিছু বোঝায় মুখের কথার মাধ্যমে। আর কিছু বোঝায় তার কর্মের মাধ্যমে। যে—
এভাবে দেখ,
এভাবে স্টিয়ারিং ধর,
এদিকে ঘোরাও,
ডানে ঘোরাও,
বামে ঘোরাও,
পা এখানে রাখ।
এসব বিস্তারিত দেখিয়ে দেয়।
যে কাজই মানুষ করে সেটা কাউকে শিক্ষা দিতে হলে সেটা দেখাতে হয়। নইলে দেখানো যায় না।
একটা সেলাই মেশিন দ্বারা কাপড় সেলাই করে। এটা তো বিশাল বড় কাজ না। এটা কোন বিশাল বড় ফ্যাক্টরি বা কলকারখানা না। কিন্তু এইটুকু কাজ যদি না দেখানো হয়, না শেখানো হয়।…..
একটা হল—থিউরিটিক্যাল—মৌখিকভাবে। বলে দেওয়া বা লিখে দেওয়া যে, বিষয়টা এরকম।
আরেকটা হল—বাস্তবে তা করে দেখিয়ে দেওয়া বা প্র্যাকটিক্যাল। দুইটার দরকার হয়। নইলে মানুষ এ কাজগুলো করতে পারে না।
তাহলে মহান রাব্বুল আলামীন যে বললেন—আমি এ কোরআনের ব্যাখ্যা আপনার মাধ্যমে করে দেব—
তো আপনার জবান থেকে ব্যাখ্যা হবে,
আপনার কথা থেকে ব্যাখ্যা হবে,
আপনার আমলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা হবে,
আপনার আচার-আচরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা হবে।
আল্লাহর রাসূলের
বিবরণ,
তাঁর কর্মকাণ্ড,
তাঁর কর্মযজ্ঞ,
তাঁর আখলাক-চরিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা হবে।
নবীজির প্র্যাকটিক্যাল শেখানোর এক নমুনা—চাচাতো ভাই হযরত ফযল ইবনে আব্বাস রা.
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর চাচাতো ভাই ফযল ইবনে আব্বাস রা.। একবার হজের মৌসুমে মেয়ে লোকেরা যাচ্ছিল তাদের ওপর তাঁর নজর পড়েছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তার গর্দান ধরে ঘুরিয়ে দিয়েছেন যে, না। সেদিক দেখা যাবে না। তো দেখুন। কোরআনেপাকে আল্লাহর রাব্বুল আলামীন বলেছেন যে, তোমরা দৃষ্টি সংযত কর। চোখের হেফাজত কর। সেটা কিভাবে করা? সেটা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম প্র্যাকটিক্যাল দেখিয়ে দিয়েছেন, বাস্তবে সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন।
সার্জন হওয়ার জন্য মেডিকেল সাইন্স পড়াই যথেষ্ট নয়, ইন্টার্নিও বাধ্যতামূলক করতে হয়
ছাত্ররা যখন মেডিকেল সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করে, ডাক্তারি পড়ে
তখন ক্লাসে তাদের প্রফেসর এর বক্তব্য শোনে,
লেকচার শোনে।
এভাবে তারা শিখতে থাকে।
এরপর আবার তারা প্রাকটিক্যাল শেখে।
ইন্টার্নি করে।
ঐ ডাক্তারদের সঙ্গে থাকে।
প্রফেসরদের সঙ্গে থাকে।
কিভাবে তারা বাস্তবে রোগীর চিকিৎসা করেন,
বাস্তবে রোগীকে দেখেন,
সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন, যথাযথভাবে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করেন।
এরপরে—
এই রোগটা কী,
রোগের অবস্থাটা কী,
মাত্রাটা কী,
এর জন্য ঔষধ কী
এগুলো তাঁরা প্রাকটিক্যাল দেখান।
কিডনি রোগের চিকিৎসা ডাক্তার দেখান।
চক্ষু রোগের নানান চিকিৎসা ডাক্তার বাস্তবে দেখান।
চোখের মত নাজুক জিনিসকে কিভাবে অপারেশন করতে হবে সেটা ডাক্তাররা অপারেশন করে দেখান। অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তার যখন ঢোকেন সেখানে কিভাবে হার্টের রোগীর চিকিৎসা করা হয় এটা তারা আগে থিউরিটিক্যাল পড়ে এসেছিল। এখন প্রাকটিক্যাল দেখে। তো বইপুস্তকে তো লেখা আছে তারপরেও মেডিকেল সাইন্স এর প্রফেসরের বিস্তারিত বুঝিয়ে একটা লেকচার দিতে হয়। আবার সেটা বাস্তবে দেখায়ে শেখাতে হয়।
তো কোরআনে কারীমে রাব্বুল আলামীন যে বললেন, আমি এই কোরআন নাযিল করলাম এবং এর ব্যাখ্যাও আমার দায়িত্বে। তো—
সে ব্যাখ্যাটা কোথায়?
সে ব্যাখ্যাটা কি কোরআন শরীফে আছে?
সেটা কোথায় গেল?
কোরআনে যাকাত আদায়ের আদেশ দিয়েছে, কিন্তু সোনা-রূপা, ব্যবসায়িক পশু এবং ফল-ফসলের যাকাতের কোনো নেসাব উল্লেখ করেনি
আল্লাহপাক কোরআনে বলেছেন তোমরা যাকাত আদায় কর।
وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ
বারবার বলেছেন তোমরা যাকাত আদায় করবে। যাকাতের নেসাব তথা
কি পরিমাণ মাল হলে যাকাত মানুষের উপর আসবে?
যাকাত জিনিসটা কি?
এমনিতে এর আভিধানিক অর্থ হলো
পবিত্র করা,
পরিচ্ছন্ন করা,
পরিমার্জিত করা।
এখন সেই পবিত্র করা কিভাবে?
সেটা তো বুঝেই আসে না। আভিধানিক এই অর্থটা শুনলে কি বুঝে আসে যে, যাকাত দেওয়াটা কিভাবে?
টাকার যাকাত,
সোনা-রুপার যাকাত,
ব্যবসায়িক উট-ভেড়া এবং
গরু-ছাগলের উপর যাকাত,
উৎপন্ন ফসলের উপর যাকাত।
এর বিস্তারিত বর্ণনা তো কোরআন শরীফের কোথাও উল্লেখ নেই যে, গরু-ছাগল এই পরিমাণ হলে যাকাত দিবে এবং উট-ভেড়ার যাকাত এই পরিমাণ। এ বর্ণনা তো কোরআনে বিস্তারিত নেই। এক একটা হুকুম আছে, কিন্তু এর সঙ্গে যে অনেক বিধানাবলী রয়েছে—যেগুলো এর সমষ্টি—যা ঐ হুকুমটা পালনের পদ্ধতি। এটা তো কোরআনে বিস্তারিত নেই।
যারা বলে—কোরআন মানি, কিন্তু হাদীস মানি না—তারা নিঃসন্দেহে একশতভাগ ভয়ংকর গোমরাহীর মধ্যে আছে
যেই মানুষগুলো বলেন যে—কোরআন মানি, কিন্তু হাদীস মানি না—
এ মানুষগুলো শিক্ষিত এবং জ্ঞানী?
নাকি অজ্ঞ এবং মূর্খ?
কিছুই স্পষ্ট না।
এরা কি সত্যিই কোন একটা ফ্যাসাদে পড়ে গেছে?
বিভ্রান্তির শিকার হয়ে গেছে?
অন্ধকারের মধ্যে পড়ে গেছে?
অথবা তারা কোন ষড়যন্ত্রকারীদের এজেন্ট?
সত্য সত্য এটা আমরা বুঝতে পারিনা। কারণ তাদের সাথে আমাদের ওঠাবসা নেই। কিন্তু এরা যে ইসলামের অপব্যাখ্যাকারী এটা একশতভাগ সঠিক। এরা নিঃসন্দেহে একশতভাগ ভয়ংকর গোমরাহীর মধ্যে আছে, অন্ধকারে ডুবে আছে।
কোন মুসলমানের সাথে এরা কথা বলতে চাইলে ওখানেই তার জবান বন্ধ করে দেওয়া চাই
কোন মুসলমানের সাথে এরা কথা বলতে চাইলে ওখানেই তার জবান বন্ধ করে দেওয়া চাই। যে—
এক শব্দও তোমরা উচ্চারণ করবে না এখানে।
আমরা মুসলমান।
আল্লাহর কথা মানি।
আল্লাহর রাসূলের কথা মানি।
কোরআন মানি।
কোরআনের ব্যাখ্যা—রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর হাদীস—সেটাও মানি।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর সমগ্র জীবন,
জীবনের কর্মকাণ্ড কোরআনে পাকের ব্যাখ্যা।
আমরা সেটাও মানি।
দুইটাই মানি।
এ আয়াতেপাকে তো আল্লাহ তা'আলা এভাবে বললেন।
আল্লাহপাকেরই নির্দেশ হল—আপনি কোরআনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন
আরেক আয়াতে আল্লাহপাক আরো স্পষ্ট ভাবে বললেন যে,
وَأَنزَلۡنَاۤ إِلَیۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَیِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَیۡهِمۡ
আমি এই কোরআনে পাক নাযিল করলাম, আমি চাই যে—মানুষের কল্যাণে যা কিছু নাযিল করা হল, অবতীর্ণ হল— এটা আপনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলে দেবেন। আল্লাহর রাসূলকে আল্লাহপাক নির্দেশই দিয়েছেন এইভাবে।
কোরআনেরই আদেশ—আল্লাহকে ভালোবাসলে রাসূলের পূর্ণ অনুসরণ করবে
আরেক আয়াতে আল্লাহপাক বলেন যে,
قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِی یُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ
‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে আমাকে অনুসরণ করবে।’
কোরআন শরীফ পড়বো আমি, তোমরা শুনবে। সেই কথা আল্লাহপাক এখানে বলেননি। এখানে তিনি বলেছেন, فَٱتَّبِعُونِی তোমরা আমাকে অনুসরণ করবে। এটাতো কোরআনেরই কথা।
কিভাবে কোরআনকে মানতে হবে সেটা রাসূলের অনুসরণের মাধ্যমেই অর্জন হবে
ওদের ভিত্তিহীন এবং ভুল কথাগুলোর খণ্ডন আমরা কোরআন থেকেই পেশ করছি। এখানে তো আল্লাহপাক বলে দিতেছেন যে, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তাহলে তার একমাত্র চূড়ান্ত পদ্ধতি হল, فَٱتَّبِعُونِی জীবনভর সকল দ্বীনি কর্মকাণ্ডে তোমরা আমাকে অনুসরণ করবে। বোঝা গেল যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম নিজেই কুরআনের একদম অনুসরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। কিভাবে কোরআনকে ফলো করতে হবে, মানতে হবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামের মাধ্যমেই সেটা অর্জন হবে।
কোরআনের হেদায়েত জীবনে বাস্তবায়নের জন্য রাসূলের পূর্ণ জীবনটাই নমুনা এবং মডেল—এটাও কোরআনের বর্ণনা
আরেক আয়াতেপাক শোনেন সেখানে আল্লাহপাক কি বলেন!
لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِی رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةࣱ
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম এর জীবন জুড়ে أُسۡوَةٌ নমুনা এবং মডেল মজুদ। এখানে তো আল্লাহর রাসূলের কর্ম, তাঁর কথা, তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা এবং কর্মকাণ্ড সবকিছুকে অনুসরণ করার জন্য পরিষ্কার বলে দিলেন। এই কোরআনকে জীবনে প্রতিফলিত এবং বাস্তবায়িত করার জন্য, কোরআনের হেদায়েত এবং নির্দেশনা জীবনে বাস্তবায়নের জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তোমাদের জন্য মডেল এবং নমুনা। এখানে তো আল্লাহপাক কোরআনের মধ্যেই বললেন যে, তিনি মডেল। তো তিনি কি করেন সেটা আমি না দেখলে তাঁর মডেল হবে কি করে।
মডেল হল— একটা নির্দিষ্ট মাপ যেটাকে ফলো করতে হয়, আর রাসূলই হলেন আল্লাহর একমাত্র মডেল
একজন দর্জির কাছে গেল। একটা কোর্তা দিল যে, এটা মডেল। এই মোতাবিক বানায়ে দেন। তো সে যখন কোর্তাটা বানিয়েছে, বানানোর পরে সে যে দিয়ে গিয়েছিল সেটার সাথে মিলে না।
কিরে!
এরকম ছোট কেন?
হাতা হাতে ঢোকে না?
গলায় পড়তে পারি না,
খুলতে পারি না।
বিষয়টা কি?
তার মানে সে ঐ মডেল মোতাবিক বানায়নি।
ছোট হয়ে গেছে।
সংকীর্ণ হয়ে গেছে।
পড়া যায় না।
আরেক দর্জি—
সে এমনভাবে বানিয়েছে যে,
যে হাতা এক বিঘত,
সোয়া বিগত বের হয়ে থাকে।
এটা কি পড়া যাবে?
আবার কোর্তার নিচের দিকে,
পায়ের দিকে দেড় বিঘত,
দুই বিঘত বেশি থাকে।
এটা কি মডেল মোতাবিক হল?
তো মডেল কোন জিনিসকে বলে?
একটা নির্দিষ্ট মাপ সেটাকে ফলো করতে হবে।
আল্লাহর পছন্দনীয় নামাযের একমাত্র মডেল হলেন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম
তো কোরআন যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামকে মডেল বলছে, নমুনা বলছে তার মানে তোমার নামাযটা খালি পড়লে হবে না। আমি যে বললাম, আমার রাসূল মডেল। সেই মোতাবেক তোমার নামায হতে হবে।
তিনি শুরু করলেন কিভাবে,
শুরুর পরপরই কি কাজগুলো করলেন,
তারপর কি করলেন,
তারপর কি করলেন।
আগে কুল হুআল্লাহ-র সূরা পড়লেন,
নাকি আলহামদু-র সূরা পড়লেন?
তুমি কুল হুআল্লাহ দিয়ে আরম্ভ করলে। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম শুরু করলেন আলহামদুলিল্লাহ দিয়ে।
তো—
এটা হবে না।
এটা মডেল মোতাবেক হয়নি।
তিনি যেটা করেছেন সেটা তোমাকে করতে হবে।
কিন্তু—
কোরআনে কারীমের কোথাও একবারের জন্য একথা বলা নাই যে, আলহামদু-র সূরা প্রথম পড়তে হবে এরপরে অন্য সূরা পড়তে হবে।
কোন মডেল বা নমুনা ছাড়া কোরআনকে অনুসরণ করলে সে মানুষ গোমরাহির শিকার হবে
কোন মডেল বা নমুনা ছাড়া কোরআনকে অনুসরণ করতে যায় সবগুলো মানুষ গোমরাহির শিকার হবে। সবাই পথ হারাবে।
ঢালকানগর বাইতুল উলূম মাদ্রাসার সেই ঘটনার মত হবে। ওখানে এক লোক ছিলেন। উনি মাদ্রাসার বোর্ডিং এর বাজার করতেন। মাদ্রাসার অন্যান্য কাজকর্ম করতেন। এ লোকের পুরা নাম বলবো না। একটুখানি বলি। এ লোকের নাম ছিল ভূঁইয়া সাহেব। মাদ্রাসার বাবুর্চি আর কয়েকজন কর্মচারী মিলে মাদ্রাসার মধ্যে মাগরিবের নামাযে দাঁড়িয়েছে। কাজে কামে ছিল। পরে নিজেরা একটা জামাত করছে। যে লোক নামায পড়াবে সে হলো বাবুর্চি। তার নাম হলো ইব্রাহীম। সবাই মিলে তাকে ইমাম বানিয়েছে। বাবুর্চি নামায শুরু করে সুরা ফাতেহার পর প্রথম রাকাতেই সূরা নাস পড়েছে। প্রথম রাকাত শেষ করে দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহা পড়েছে। শেষ সূরা তো সে পড়েছে। এখন কি করবে? সে তো আর মাসলা-মাসায়েল জানে না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে । দিক দিশা সে কিছুই পাচ্ছে না। সে তো আলেম না। পরে পিছনে যে ভুঁইয়া সাহেব ছিলেন উনি বয়স্ক মানুষ, উনি বলেন যে, ইব্রাহীম! কুলহু আল্লাহ পড়। (এ সময় উপস্থিত সবাই একসাথে হেসে ওঠে।) যদি মানুষ না জানে সেটার মোতাবেক আমল করবে কিভাবে! তো যারা কোরআন মানে, কিন্তু হাদীস মানে না। এরা সব ঐ অশিক্ষিত ভূঁইয়া, আর ঐ অশিক্ষিত ইব্রাহীমের পার্টির লোক। সবগুলো এরকম উল্টাপাল্টা করতে থাকবে সারা জীবন আর ছেচা খাবে গিয়ে হাশরের মাঠে। আচ্ছা মত ধোলাইটা এদের ভাগ্যে জুটবে হাশরের ময়দানে।
কোরআন মানলে গোমরাহীর মধ্যে পড়ে না থেকে কারো থেকে কোরআন শিখতে হবে, বুঝতে হবে
এরকম ভুলের মধ্যে, গোমরাহীর মধ্যে, বিভ্রান্তির মধ্যে কেন আপনারা থাকবেন। যখন কোরআন মানেন, তো কোরআন বোঝেন কারো থেকে। কারো থেকে কোরআন শিখতে হবে, বুঝতে হবে। আল্লাহপাক বুঝ দান করেন।
কতগুলো কথা বললাম! সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি! অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো বিষয় বলা হলো। তো এটা আপনাদের জন্য যথেষ্ট মনে হয় কিনা। (সবাই সমস্বরে জী, জী এবং মাশাআল্লাহ বলতে থাকে।)
তোমরা নামায পড়বে সেই পদ্ধতিতে, যেভাবে আমাকে পড়তে তোমরা দেখেছ
এবারে হাদীস শরীফ থেকে বলি একটু— রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম বলেছেন এ কথা যে, নামায যে তোমরা পড়বে, পড়বে কিভাবে? কোরআনে নামাযের কথা আছে।
صَلُّوا كما رَأيتُموني أُصَلِّي
তোমরা নামায পড়বে যেই পদ্ধতিতে, যেইভাবে, যেই বিবরণে, যে আকৃতিতে সমগ্র নামায আমাকে পড়তে তোমরা দেখেছ।
صَلُّوا كما رَأيتُموني أُصَلِّي
নামায পড় সেভাবে যেভাবে তোমরা আমাকে নামায পড়তে দেখেছ। এই কথা বলেছেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম নামাযের সাথে সাথে উজূও শেখাতেন
উজু কিভাবে করা সেটা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম দেখিয়ে দিয়েছেন। তো রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর জীবদ্দশাতেও এবং বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পরে একেক সাহাবী জায়গায় জায়গায় গিয়ে মানুষদেরকে নামায পড়ে দেখাতেন। যে এভাবে নামায শুরু করতে হয়, এভাবে নামায শেষ করতে হয়। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিআল্লাহু আনহু একবার নফল নামাযে দাঁড়ালেন। আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করলেন। অন্যান্যরা দলে দলে উনার নামায পড়া দেখতে থাকছেন। নামায শেষ হলে তিনি বললেন যে, আজকে আমার এই যে নামায
أنا أشبَهُكم صلاةً برسولِ اللهِ ﷺ
তোমাদের সকলের মধ্যে আমার নামায রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর সঙ্গে একদম বেশি মিলওয়ালা, বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, বেশি সামঞ্জস্যশীল।। তার নামাযের একদম নিকটবর্তী। হুবহু হওয়ার দাবিটুকু তিনি করলেন না।
সাহাবায়ে কেরাম ওযু করার পর বলতেন,
هَكَذا وُضوءُ رَسولِ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّم
হযরত ওসমান, রা., হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পুরা উযূ করে বলতেন যে, এই ভাবেই ছিল, এই রকমই ছিল রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম এর উযূ।
আকাবিরে-দ্বীনের বাইরে চললে মুসলমানদের যে কোন তবকা গোমরাহীর শিকার হতে বাধ্য
এসব লোকেরা কোত্থেকে সব কথাবার্তা বলে? এজন্য হক্কানী ওলামায়ে কেরাম এবং এই উম্মতের যারা বড় মানুষ—কোরআন-সুন্নাহর এলেমের ক্ষেত্রে এদেরকে সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং তাঁদের সমগ্র এলেম এবং আমলের যাঁরা সাচ্চা অনুসারী ওয়ারিসিন, তাঁদেরকে আকাবিরে দ্বীন বলে, হাদীসের ভাষায়— তাঁদের অনুসরণে যদি আমরা সেই ওলামায়ে দ্বীন থেকে কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা না শুনি তাহলে মুসলমানদের যে কোন তবকা গোমরাহীর শিকার হতে বাধ্য। গোমরাহীর ভিতর হারিয়ে যাবে।
আকাবিরে-দ্বীনের বাইরে যারা চলবে তারা উম্মতের সার্জন হবে না, এই উম্মতকে ধ্বংস করার কসাই হবে
যারা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছে। পরে ইন্টার্নি না করে যদি নিজেরাই অপারেশন শুরু করে দেয় তাহলে শেষে সার্জন হবে, না কসাই? কসাই হবে। যারা ওলামায়ে দ্বীন থেকে কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা শিখবে না তারা ঠিক সার্জন হবে না। তারা এই উম্মতকে ধ্বংস করার কসাই হবে। সব কসাইয়ের দল হবে।
যে ব্যাখ্যা হক্কানী ওলামায়ে-দ্বীনের মতের সাংঘর্ষিক সেটা যত বড় নেতার হোক না কেন এক মুহূর্তের জন্য কিঞ্চিৎ পরিমাণও কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না
এজন্য হক্কানী ওলামায়ে-দ্বীন যে কথা বলেন, দ্বীনের যে ব্যাখ্যা দেন, এটার সাথে যেটা সাংঘর্ষিক
এই উম্মতের কোন নেতা,
কোন বুদ্ধিজীবী,
কোন জ্ঞানী,
কোন রাজনীতিবিদ,
কারো কথা
এক মুহূর্তের জন্য
কিঞ্চিৎ পরিমাণও
কোনভাবেই
কখনো গ্রহণযোগ্য না।
হাঁ তাদের কথা যদি কোরআন সুন্নাহ মোতাবেক হয় তখন ঠিক আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, মুসলমানদের মধ্যে কিছু লোক
যারা সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,
বড় বক্তা,
বড় ভাষণ দাতা,
বড় চিন্তাবিদ,
বড় ইসলামী চিন্তাবিদ,
বড় রাজনীতিবিদ,
ইসলামের পক্ষে কথা বলার বড় ইসলামী রাজনীতিবিদ।
তারা এমনভাবে ওলামায়ে দ্বীনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং তারা দেখায় যে,
যত আলেম আছে,
চাই সে নবীন হোক বা প্রবীণ,
তাদের কথা মোতাবেক না হলে কেউই ঠিক না।
সব ভুল।
সবাই ভুলের মধ্যে আছে।
কেবল তারাই ঠিক।
আল্লাহপাক বলেছেন যে, আমার রাসূলকে মান, আবার বলেছেন, দ্বীন সম্পর্কে যারা জানে সে ওলামায়ে-দ্বীনকে মান
উম্মতের মধ্যে এই যে একটা তবকা,
দুনিয়াতে ঝগড়াঝাঁটি করে,
গায়ের জোরে,
দলের জোরে,
শক্তির জোরে,
পার্টির জোরে এবং
পয়সার জোরে,
এভাবে তারা দুনিয়াতে পার পেয়ে গেলেও কাল কেয়ামতে উপায় কি হবে?! কাল কেয়ামতে কি আল্লাহপাকের কাছে ধরা পড়বে না?! কারণ আল্লাহপাক তো পবিত্র কোরআনে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, আমার রাসূলকে মান। আবার আল্লাহপাক এ কথাও বলেছেন যে, দ্বীন সম্পর্কে যারা জানে সে ওলামায়ে দ্বীনকে মান।
فَسۡـَٔلُوۤا۟ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ (اى العلم) إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ
তোমরা যারা দ্বীন সম্পর্কে জান না, তো দ্বীনের আলেম যারা সে আলেমে-দ্বীন থেকে তোমাদেরকে জানতে হবে।
নবী-রাসূলগণ শুধু ওলামায়ে কেরামকে আসমানী এলমের ওয়ারিশ বানান
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম নিজেই বলে দিয়েছেন যে, নবী-রাসূলগণ কাউকে টাকা-পয়সা, দেরহাম-দিনারের ওয়ারিশ বানান না। নবী-রাসূলগণ আসমানী এলেম যেটা দ্বীন এবং হেদায়েত সেটার ওয়ারিশ বানান এবং তা শুধু ওলামায়ে কেরামকে।
العُلَماءُ وَرَثةُ الأنبياءِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলেম-ওলামাদের শান-মান বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়েছেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলেম-ওলামাদের গুরুত্ব ও তাঁদের মর্যাদা, তাঁদের শান বুঝানোর জন্য কত ভাবে বুঝিয়ে গিয়েছেন।
وإنَّ العالِمَ ليستغفرُ لَه مَن في السَّماواتِ ومن في الأرضِ والحيتانُ في جوفِ الماءِ و حتى النملةَ في جُحْرِها
আলেমদের জন্য দোআ করতে থাকে আল্লাহপাকের নিকট সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত মাখলুক। সমগ্র সৃষ্টি কুল, সৃষ্টি জগত দোআ করতে থাকে। এমনকি পানির মধ্যে মাছেরা পর্যন্ত আলেম-ওলামাদের জন্য দোআয়ে মশগুল আছে। দোআ করতে থাকে। এমনকি গর্তের পিঁপড়ারা পর্যন্ত আলেমদের জন্য দোআ করতে থাকে। এ কথাগুলো বলেছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম। এগুলো কি হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলেছেন, নাকি আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের নিকট থেকে দ্বীন নেওয়ার জন্য বলেছেন!
যারা মনে করে যে, আলেমদের আমাদের দরকার নেই তারা ধীরে ধীরে দ্বীন থেকে সরে যেতে থাকে
কিন্তু বিরাট সংখ্যক মুসলমান এরকম হয়ে গেছে যে, যারাই কোনভাবে একটু দ্বীন বুঝল, দ্বীন নিয়ে একটু চলতে পারল তখন তারা মনে করে যে,
আলেমদের আমার আর দরকার নেই।
ইমাম-খতিবদের আমার দরকার নেই।
কোন আলেমের কোরআনের তাফসীরে বসারও দরকার নেই।
কোন আলেমের হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শোনারও আমার কোন দরকার নেই।
আমার ওস্তাদ ভিন্ন।
আমার সেন্টার ভিন্ন।
আমার কেন্দ্র ভিন্ন।
—এই যে এক চিন্তা এবং মানসিকতা—এইগুলো মানুষদেরকে ধীরে ধীরে দ্বীন থেকে সরিয়ে দিতে থাকে। কারণ যে সকল মানুষ বিভিন্ন জায়গায় আলেমদের সাথে বসে—ছোট-মাঝারি-বড় আলেম, সবচেয়ে বড় আলেম—তখন মানুষ দেখে যে, না এই কথাটা ওখানে যা শুনেছি আজকেরটা তো ভিন্ন রকম মনে হলো। আগের কথার চেয়ে এটা বেশি ঠিক মনে হয়।
যাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের মহান খাদেম বানাবেন তাঁরা বাল্যকাল থেকেই আদর্শবান হন
আমরা ছোটবেলা থেকে, পিচ্চি থাকতেই আলেম-ওলামাদেরকে দেখতে থেকেছি এবং তাঁদের থেকে শিখতে থেকেছি। আমার বয়স যখন ১১/১২ বছর হবে ঐ সময় আলহামদুলিল্লাহ পড়াশুনার প্রতি আমার খুব মনোযোগ ছিল। লেখাপড়া নিয়ে আমি ভীষণ ব্যস্ত থাকতাম। মাদ্রাসার পাশেই বিশাল একটা পুকুর ছিল যেখানে ছাত্ররা গোসল করত। ঐ পুকুরের পাশেই এক বাড়িতে হুজুররা আমাকে জায়গির দিয়েছিলেন। যাতে আমার
বাড়িতে যেতে না হয় এবং এখানে থেকেই আমি আরো পড়াশোনা করি। আমার তো সঙ্গী সাথীদের সাথে মেশামেশির বা অন্য মানুষদের সাথে ওঠাবসার অভ্যাস ছিল না।
পড়াশোনা করলাম,
মাদ্রাসায় গেলাম,
মাদ্রাসা থেকে জায়গিরে ফিরে আসলাম,
এখানে খাওয়া-দাওয়া করলাম,
তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।
নির্মল মনের টানে ঘটে যাওয়া বাল্যকালের এক মজার ঘটনা
মাদ্রাসায় বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল। বড় বড় ওলামায়ে কেরাম তাশরীফ এনেছেন। তাঁরা ওয়ায করছেন। এশার নামাযের সময় হয়েছে। দেখতে শুনতে বিশাল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, লম্বা, কালো, খুব হেলথি, খুব স্বাস্থ্যবান এক হুজুর, কোর্তার সাইজও অনেক বড়। এই হুজুর নামায পড়ালেন। আমরা তো প্রতিদিনই আমাদের ওস্তাদদের সাথে মাদ্রাসায় নামায পড়ি মাদ্রাসার মসজিদে। আমাদের হুজুররা ডান-বাম সালাম ফেরানোর পরে নামায শেষ করতেন। কয়েক বছরে এর ব্যতিক্রম কখনো দেখিনি।
মাদ্রাসার পাশে স্কুল ছিল। আমরা স্কুলে পড়েছি। এরপরে মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম। এত বছর এখানে পড়ি। সেই অ, আ, ক, খ থেকে পড়ি। ১, ২, ৩ এগুলো এখান থেকে শুরু হল। যাদেরকে পেয়েছি তাদেরকে কোন ব্যতিক্রম করতে দেখিনি। এইবারে মাহফিলের হুজুর যে এশার নামায পড়ালেন—উনি ডান দিকে সালাম ফিরেই আল্লাহু আকবার বলে সেজদায় চলে গেলেন। আবার উঠলেন, আবার সেজদায় গেলেন। আবার বসে কিছুক্ষণ পর ডানদিকে আসসালামু আলাইকুম, বাম দিকে আসসালামু আলাইকুম বলে নামায শেষ করলেন। ঘটনা কি আপনারা বোঝেননি। কিন্তু আমি তো বাবু মানুষ, পিচ্চি মানুষ। আমি তো জীবনের প্রথম দেখলাম। আমি ভাবলাম যে, ওহ হো! আল্লাহু আকবার! এই বড় মানুষ যারা, তাদের তো নামাযের তরিকা এই। আমি মনে মনে ভাবলাম যে, এই তরিকা আমাকে ধরতে করতে হবে। মাদ্রাসার পাশেই তো আমার জায়গির। ঐ বাড়িতে আমার ছাত্র ছিল দুইজন। যার বাড়িতে থাকি তার ছিল দুইটা ছেলে। দুই জনই জমকালো। ওরা