08/09/2025
ভোর এখনও ঠিক পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। কুয়াশা বা বৃষ্টি ভেজা বান্দরবানের পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে আসে নানান এলাকার নারী ও পুরুষ, নারী সংখ্যাই বেশি। কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি, কারও মাথায় বোঝা, কারও কাঁধে পাহাড়ি শাক-সবজির বোঝাই। অন্ধকার কাটতেই তাদের পথ চলা শুরু হয় বাজারের দিকে। এটাই তাদের প্রতিদিনের গল্প। জীবনের গল্প। সংগ্রামের গল্প।
বান্দরবানের বাজারে ভোরবেলা দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। পাহাড়ের নানান প্রান্ত থেকে আসা নারীরা সারি সারি বসে পড়েন মাটিতে। তাদের ঝুড়িতে থাকে পাহাড়ি লাউ, কচু, কলমি, বুনো শাক, মরিচ কিংবা বিভিন্ন সবজি। তাদের হাতে নেই ব্যবসায়ীর মতো পুঁজির শক্তি, নেই বড় দোকান কিংবা ছাউনি। মাটির ওপর বিছানো একটা বস্তা বা ছালা পাটের ছেঁড়া টুকরোই তাদের দোকান। সেখানেই সাজিয়ে রাখেন জীবিকার আশায় তোলা এই ফসলগুলো।
কেউ আসে ভোরে, আবার কেউ বাজারে জায়গা পেতে রাত ফুরাবার আগেই চলে আসে। ভোরের ঠান্ডা বাতাস, দুপুরের রোদ, কিংবা হঠাৎ নামা পাহাড়ি বৃষ্টি— কিছুই তাদের থামিয়ে রাখতে পারে না। কারণ তাদের পেছনে আছে পরিবারের দায়িত্ব। সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার দায়। বৃদ্ধ বাবা-মাকে ওষুধ কেনার দায়। সংসার টিকিয়ে রাখার দায়।
তবুও বাজারে বসে যে কষ্ট করে আনা শাক-সবজি বিক্রি করেন, তার ন্যায্য দাম মেলে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ নেয়, ক্রেতারা দরদাম করে অর্ধেক দামে কিনতে চায়। অথচ এই নারীদের হাতে বিকল্প কিছু নেই। দুপুরে ঘরে ফিরতে হবে, রান্না করতে হবে, আবার হয়তো খেতের কাজে যেতে হবে। তাই তাড়াহুড়া করে তারা কম দামে সব বিক্রি করে দেন। অনেক সময় পুরো দিনের আয় দিয়ে গাড়ি ভাড়াও ওঠে না।
ভাবা যায়? ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত পাহাড় বেয়ে নেমে আসা, বাজারে বসে থাকা, গরমে ঘাম ঝরানো— সব কিছুর পরেও হাতে যা থাকে, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোই দায় হয়ে পড়ে।
এই নারীরা শুধু বাজারের বিক্রেতা নন। তারা পরিবার চালান, সন্তানদের স্কুলে পাঠান, ঘরে রান্না করেন, আবার জমিতেও কাজ করেন। একদিকে সংসার, অন্যদিকে বাজার— দুই দিকেই তারা সমান পরিশ্রম করেন। অথচ তাদের এই শ্রমের সঠিক স্বীকৃতি কোথায়? তাদের জন্য নেই আলাদা টয়লেট, নেই বসার ব্যবস্থা, নেই বিশ্রামের জায়গা। অনেক সময় বাজারে বসা অবস্থায় তাদের বিব্রত হতে হয় প্রাকৃতিক প্রয়োজনের কারণে। তবুও তারা থেমে থাকেন না। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
কখনও দুপুরের তাড়া, কখনও পরিবারের ডাক— সবকিছু মিলিয়েই তারা হুড়মুড় করে কম দামে সব বিক্রি করে দেন। যেন সময়ের সঙ্গে এক প্রতিযোগিতা। কারণ যদি বাড়ি ফেরা দেরি হয়, তবে সংসারের চুলা জ্বলে না। সন্তানদের দুপুরের খাবার জোটে না। তাদের এই লড়াই তাই শুধু অর্থের জন্য নয়, বরং প্রতিটি পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য।
এই পাহাড়ি নারীদের গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয়— সংগ্রাম মানে কী, বেঁচে থাকা মানে কী। সমাজ হয়তো তাদের দিকে তেমন নজর দেয় না, কেউ হয়তো ভাবে এ শুধু সবজি বিক্রেতার গল্প। কিন্তু সত্যি বলতে, তাদের প্রতিটি শাকপাতা, প্রতিটি সবজির ঝুড়ির ভেতর লুকিয়ে আছে অগণিত ঘামের ফোঁটা, অগণিত অশ্রু, আর অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস।
তাদের চোখে হয়তো বড় স্বপ্ন নেই, বিলাসিতা নেই। কিন্তু আছে অদম্য সাহস। আছে প্রতিদিনের শ্রম দিয়ে সংসারের হাসি ফোটানোর দৃঢ়তা। এরা হলো পাহাড়ি জীবনের প্রকৃত নায়ক। যাদের ত্যাগের কথা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, অবহেলা করি, কিন্তু যাদের ছাড়া পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি— কিছুই সম্পূর্ণ নয়।
তাদের সংগ্রামী জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রতিটি ভাতের দানার পেছনে লুকিয়ে আছে একজন নারীর অদম্য শ্রম, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার গল্প। আর সেই গল্পই আমাদের শেখায়, সত্যিকারের শক্তি আসলে পাহাড়ি এই নারীদের হাতেই নিহিত।"
, .