01/10/2026
প্রতিবছর ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালিত হয়। সরকারি উদ্যোগে আজ বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপিত হয়েছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো প্রবীণ জনগোষ্ঠী। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলস্বরূপ সাধারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে— ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী যা ছিল ৭০ লক্ষ ৭৩ হাজার, ২০২২ সালের জনশুমারিতে তা ১ কোটি ৫৩ লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ যা ২ কোটিতে গিয়ে পৌঁছাবে।
আমাদের দেশে প্রবীণদের প্রধানতম সমস্যাগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যগত নাজুকতা এবং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা অন্যতম। অতীতে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত সেবা-শুশ্রূষা ও সহায়তা এই সমস্যা উত্তোরণে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমান সময়ে যেমন যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে, তেমনি আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ফলে প্রবীণরা ক্রমশ সহানুভূতি হারাচ্ছেন এবং অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এর ফলে একটি বড় ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখা দিতে পারে।
এই সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য। সরকারি পর্যায়ে বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার প্রচলন আগে থেকেই ছিল; সাম্প্রতিক সময়ে এর সাথে যুক্ত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। তবে প্রতি বছর যে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রবীণ জনগোষ্ঠীতে যুক্ত হচ্ছেন, সেই মোট প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাতে সামাজিক সুরক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটে যথাযথ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ১৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ লক্ষ বৃদ্ধি করে ৬২ লক্ষে এবং ভাতার হার ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছেন। সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যসেবার দিকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। 'জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩' অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে একটি করে বিশেষায়িত 'জেরিয়াট্রিক বিভাগ' (Geriatric Department) থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বান্দরবান সদর হাসপাতালসহ দেশের অধিকাংশ জেলা হাসপাতালেই আজও কোনো জেরিয়াট্রিক বিভাগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
তদুপরি, প্রবীণদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। যারা শারীরিকভাবে সক্ষম এবং আগ্রহী, তাদের জন্য নমনীয় কর্মসংস্থান ও খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের আহ্বান:
বান্দরবান মেডিকেল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়, বরং মানবজীবনের একটি অত্যন্ত সম্মানিত ও অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ অধ্যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী হিসেবে আমাদের জোর দাবি— অনতিবিলম্বে বান্দরবান সদর হাসপাতালসহ দেশের সকল স্তরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কার্যকর প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যকাঠামো বা 'জেরিয়াট্রিক বিভাগ' গড়ে তোলা হোক।
আসুন, আমরা আমাদের প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি আরও যত্নশীল, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল হই। তাঁদের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠন করা সম্ভব। আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন— আজকের তারুণ্যই আগামী দিনের বার্ধক্য।