08/06/2026
১৯৭১ সালের দিকে আমেরিকায় একজন কারখানার কর্মী একটি বাড়ি কিনতে পারতেন। এর সাথে তিনি তিনটি সন্তান লালন-পালন করতে পারতেন, তাদের কলেজে পাঠাতে পারতেন এবং পেনশন নিয়ে অবসরে যেতে পারতেন। আর এই সবকিছুই সম্ভব হতো পরিবারের মাত্র একজনের উপার্জনে।
আজ উচ্চশিক্ষিত স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ফুল-টাইম কাজ করেও কোনোমতে শুধু বাসার ভাড়াটুকু জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর মাঝে যা কিছু ঘটেছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। ধীরগতির, সুনির্দিষ্ট এবং বেশিরভাগ মানুষই এটা টের পাননি।
আমেরিকান মধ্যবিত্ত শ্রেণী একসময় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল। এটি ছিল সেই ইঞ্জিন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তুলেছিল। এটি তৈরি করেছিল উপশহর (suburbs), শপিং মল, অটোমোবাইল সংস্কৃতি এবং এমন এক ভোক্তা-ভিত্তিক অর্থনীতি যা দেখে পুরো পৃথিবী তাদের অনুকরণ করেছিল।
আর বর্তমানে?
সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ফাঁপা করে দেওয়া হচ্ছে। এটি ঘটছে অত্যন্ত নীরবে, ধীরে ধীরে ও এমনভাবে যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। আর যখন বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারেন আসলে কী ঘটছে, ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা বিজয়ী বেশে ঘরে ফেরে। যে কারখানাগুলোতে এতকাল বোমা আর ট্যাঙ্ক তৈরি হতো, সেগুলো রূপান্তর করা হলো রেফ্রিজারেটর, গাড়ি আর ওয়াশিং মেশিন তৈরির কারখানায়। যুদ্ধফেরত সৈন্যরা পেলেন 'জিআই বিল (GI Bill)', যা তাদের শিক্ষা, কম সুদে গৃহঋণ এবং চাকরির প্রশিক্ষণে ভর্তুকি দিয়েছিল।
ফেডারেল সরকার অত্যন্ত সচেতনভাবে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তুলেছিল এবং তা দারুণ ভাবে কাজ করেছিল। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে, আমেরিকায় প্রকৃত মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। বাড়ি কেনার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একটি ইউনিয়নভুক্ত চাকরি পাওয়ার জন্য কেবল হাই স্কুল শিক্ষাই যথেষ্ট ছিল, যা দিয়ে জীবনযাত্রার মানসম্মত ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং পেনশনের নিশ্চয়তা পাওয়া যেত।
এই সময়ে সবচেয়ে ধনী আমেরিকান এবং বাকি সাধারণ মানুষের মধ্যকার ব্যবধান আসলে কমে এসেছিল। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন "দ্য গ্রেট কম্প্রেশন (The Great Compression)"। এটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সমতার কাছাকাছি একটি রূপ।
পুঁজিবাদ তার আপন গতিতে চলছিল বলেই এমনটা হয়েছিল, তা নয়। এটি ছিল কিছু অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নীতি, নির্দিষ্ট ক্ষমতার কাঠামো এবং একটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফল যা চিরকাল স্থায়ী হওয়ার মতো ছিল না। যারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন, যারা দেখতে পেয়েছিলেন সামনে কী আসছে। তারা ইতিমধ্যেই এর পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন।
১৯৭১ সালে হোয়াইট হাউসে আছেন রিচার্ড নিক্সন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিকে চুষে খাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং আমেরিকা এক বড় সমস্যায় পড়েছে। ব্রেটন উডস (Bretton Woods) ব্যবস্থার অধীনে যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল আমেরিকান ডলারের মূল্য সোনার সাথে যুক্ত ছিল।
বাজারে প্রচলিত প্রতিটি ডলারের পেছনে ফোর্ট নক্সে (Fort Knox) সমপরিমাণ ভৌত সোনা সংরক্ষিত ছিল। অন্য যেকোনো দেশ যেকোনো সময় আমেরিকার কাছে তাদের ডলার জমা দিয়ে তার বদলে সোনা দাবি করতে পারত। ১৯৭১ সালে, দেশগুলো ঠিক সেটাই করতে শুরু করল। প্রথমে ফ্রান্স, তারপর ব্রিটেন এবং একে একে অন্যরা। আমেরিকার সোনার রিজার্ভ দ্রুত খালি হতে লাগল।
নিক্সনের সামনে তখন একটি পথই খোলা ছিল এবং ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সেই সিদ্ধান্তটি নিলেন। রবিবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ঘোষণা করলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ডলারের বিপরীতে সোনা দেবে না। এভাবেই, ডলার সোনার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে গেল। এটি রূপান্তরিত হলো একটি সম্পূর্ণ 'ফিয়াট কারেন্সি' (fiat currency) বা কাগজি মুদ্রায়।
যার মূল্য মার্কিন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কৃতিত্ব ছাড়া আর কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়। সে সময় বেশিরভাগ মানুষই বুঝতে পারেননি এর অর্থ কী। এমনকি আজকের দিনেও অনেকে তা বোঝেন না। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর।
যখন অর্থ কোনো ভৌত সম্পদের (যেমন সোনা) সাথে যুক্ত থাকে, তখন সরকারের হাত বাঁধা থাকে। তারা কেবল ততটুকুই খরচ করতে পারে যতটুকু সম্পদ তাদের রিজার্ভের ব্যাকআপে আছে। কিন্তু যখন কেউ সেই বাধ্যবাধকতা সরিয়ে দেন, যখন অর্থ কেবল কাগজ আর কিছু সংখ্যায় পরিণত হয়। তখন আর্থিক খেলার নিয়ম পুরোপুরি বদলে যায়।
হঠাৎ করেই ফেডারেল রিজার্ভ ইচ্ছামতো টাকা ছাপানোর ক্ষমতা পেয়ে গেল। সরকারগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বাজেট ঘাটতি চালাতে শুরু করল। আর আর্থিক খাত সোনার কাঁটাতার থেকে মুক্ত হয়ে, এমন এক গতিতে বড় হতে লাগল যা আগে কখনো সম্ভব ছিল না।
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল আমেরিকান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পতনের শুরুর অন্যতম মুহূর্ত। নিক্সনের এই ঘোষণার ঠিক দুই মাস পর আরেকটি ঘটনা ঘটে। সে সময় এটি জনসাধারণের দৃষ্টিতে প্রায় আসেনি। কিন্তু আজ পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, এটি আমেরিকার অর্থনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী দলিলগুলোর একটি ছিল।
লুইস পাওয়েল নামের একজন কর্পোরেট আইনজীবী একটি মেমো বা স্মারকপত্র তৈরি করেন। পাওয়েল ছিলেন একজন সম্মানিত আইনজীবী, যাকে পরবর্তীতে নিক্সন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগস্টে, তিনি ইউএস চেম্বার অফ কমার্সের জন্য একটি গোপনীয় মেমো লিখছিলেন। মেমোটির একটি সহজ কিন্তু কঠোর শিরোনাম ছিল: অ্যাটাক অন দ্য আমেরিকান ফ্রি এন্টারপ্রাইজ সিস্টেম (আমেরিকান মুক্ত ব্যবসায়িক ব্যবস্থার ওপর আঘাত)।
সেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, আমেরিকার বড় বড় কর্পোরেশন, ব্যবসায়ী, ধনী ব্যক্তি এবং আর্থিক অভিজাত শ্রেণী একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছিল। ভোক্তা অধিকার কর্মীরা জয়ী হচ্ছিলেন। পরিবেশগত নিয়মকানুন কঠোর হচ্ছিল। সরকারের পরিধি বাড়ছিল এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে চলে যাচ্ছিল শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকদের দিকে।
পাওয়েলের মেমোটি ছিল আসলে একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা। থিংক ট্যাংক বা গবেষণা সংস্থায় অর্থায়ন করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করা কংগ্রেসে (সংসদে) ব্যবসায়িক স্বার্থে জোরালো লবিং করা মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা করাকে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা ব্যবসায়ী বান্ধব বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে, বিচার ব্যবস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তার করা এবং এই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হয়েছিল।
মাত্র এক দশকের মধ্যে, সেই মেমোর ধারণাগুলোকে বাস্তবায়ন করার জন্য কিছু শক্তিশালী এবং বিপুল অর্থায়নে পুষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল। যেমন দ্য হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, ক্যাটো ইনস্টিটিউট, আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট এবং আরো অনেক প্রতিষ্ঠান।
এই সংস্থাগুলো গবেষণা চালাতে শুরু করে এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ও রাজনীতিবিদদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে কর্পোরেশনের জন্য যা ভালো, তা আমেরিকার জন্যেও ভালো। তারা প্রচার করতে থাকে যে, নিয়মকানুন হলো সমৃদ্ধির শত্রু, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো অদক্ষ এবং মুক্ত বাজারকে যদি তার নিজের গতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা সবার ভাগ্য পরিবর্তন করবে।
পরবর্তীতে এই অর্থনৈতিক মতাদর্শ একটি নাম পায়: 'রেগানমিক্স' (Reaganomics) বা ট্রিকল-ডাউন থিওরি (trickle-down theory)। আর ১৯৮০ সালে, এই মতাদর্শই হোয়াইট হাউসের ক্ষমতা পুরোপুরিভাবে দখল করে নেয়।
এসব নীতির আমূল পরিবর্তন রোনাল্ড রেগান একটি সহজ বার্তা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন: "সরকার আমাদের সমস্যার সমাধান নয়; সরকার নিজেই একটি সমস্যা।" কেউ রেগানকে পছন্দ করুন বা নাই করুন, এরপরে যা ঘটেছিল তা ছিল আমেরিকান শ্রমিক, কর্পোরেশন এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের এক আমূল পরিবর্তন।
কর ছাড় এবং নিয়ম শিথিল করণ সর্বোচ্চ করের হার, যা কয়েক দশক ধরে ৭০%-এর ওপরে ছিল, তা কমিয়ে মাত্র ২৮% করা হয়। কর্পোরেট খাতের ওপর থেকে নানা ধরণের নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মকানুন তুলে নেওয়া হয়। শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। এরপরেই সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ওপর।
১৯৮১ সালে পেশাদার বিমান ট্রাফিক নিয়ন্ত্রকরা ধর্মঘটে যায়। এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ তারা ছিলেন সরকারি কর্মচারী, যারা উন্নত বেতন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জানাচ্ছিলেন। রেগান তাদের সবাইকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন প্রায় ১১ হাজার কর্মীকে, এক রাতেই তারা বেকার হয়ে যায়।
কর্পোরেট আমেরিকার কাছে বার্তাটি ছিল একদম পরিষ্কার। সরকার আর কর্পোরেট ক্ষমতার বিপরীতে সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়াবে না। সরকার এখন থেকে একপাশে সরে থাকবে। এর পর বেসরকারি খাতে ইউনিয়ন সদস্যপদে নামে এক বিশাল ধস। কিন্তু পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে মোড় নেয়, যখন শ্রমিকের ক্ষমতা কমে যাওয়ার সাথে সাথে আর্থিক খাতের ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
এক অদৃশ্য শক্তি অর্থনীতিবিদরা একটি শব্দ ব্যবহার করেন যা সাধারণ মানুষ খুব একটা শোনেননি। কিন্তু এই একটি শব্দই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ধ্বংসের পেছনের আসল রহস্য উন্মোচন করে। শব্দটি হলো 'ফিনান্সিয়ালাইজেশন' (Financialization) বা অর্থনীতির আর্থিকীকরণ। আমেরিকার ইতিহাসের সিংহভাগ সময় জুড়ে অর্থনীতি ছিল মূলত কোনো কিছু উৎপাদন করার বিষয়।
কারখানা পণ্য তৈরি করত, শ্রমিকরা মূল্য যোগ করত এবং কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের গুণগত মান ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতা করত। মুনাফা আসত উৎপাদন থেকে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে এর গতি তীব্র রূপ নেয়।
অর্থনীতির মূল ভিত্তি বদলে যেতে শুরু করে। আর্থিক খাত, যেমন ব্যাংক, হেজ ফান্ড, প্রাইভেট ইকুইটি, ওয়াল স্ট্রিট এমন এক গতিতে বাড়তে থাকে যা অর্থনীতির বাকি সব খাতকে ছাড়িয়ে যায়। অর্থায়ন বা ফিন্যান্স আর কেবল বাস্তব অর্থনীতির মূলধন জোগানোর হাতিয়ার রইল না; ফিন্যান্স নিজেই অর্থনীতিতে পরিণত হলো।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর এর প্রভাব ছিল সুনির্দিষ্ট ও মারাত্মক। যখন একটি কোম্পানির প্রাথমিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় কেবল তার শেয়ার হোল্ডারদের খুশি রাখা। তার শ্রমিক, তার সমাজ ও তার কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের কথা চিন্তা না করে তখন পুরো হিসাবটাই বদলে যায়।
মুনাফার টাকা শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি, ভালো যন্ত্রপাতি বা নতুন গবেষণায় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে, কর্পোরেশনগুলো সেই অর্থ শেয়ার বাইব্যাক এবং ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে পাঠাতে শুরু করে। কর্মচারীদের কোম্পানির সম্পদ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, তাদের এমন এক 'খরচ' হিসেবে দেখা শুরু হলো যা যতখানি সম্ভব কমিয়ে আনা দরকার।
দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পরিবর্তে, তারা কেবল পরবর্তী তিন মাসের আয়ের রিপোর্টের দিকে নজর দিতে লাগল। 'প্রাইভেট ইকুইটি' ফার্মগুলো এর এক নিষ্ঠুর রূপ প্রদর্শন করে। তারা একটি চলমান এবং ভালো কোম্পানি কিনে নিতো। সেটিকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে দিত, সেখান থেকে নিজেদের ফি ও ডিভিডেন্ড তুলে নিত, এবং কর্মী ছাঁটাই করে খরচ কমাত।
অবশেষে কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা শত কোটি টাকা নিয়ে বিদায় নিত, আর শ্রমিকরা হারাত তাদের চাকরি। এই একই ঘটনা ঘটেছে আমেরিকার বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, সংবাদপত্র, হাসপাতাল, নার্সিং হোম, খেলনা কোম্পানি, মুদি দোকান এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মাঝেও আর্থিক খাত কিন্তু বড় হতেই থাকে। শেয়ার বাজারের সূচক রেকর্ড ভাঙতে থাকে। জিডিপি (GDP) সংখ্যার দিক থেকে ঠিকঠাক দেখায়। কিন্তু এই সমস্ত মুনাফা কেবল তাদের কাছেই পৌঁছায় যাদের আগে থেকেই সম্পদ বা 'অ্যাসেট' ছিল।
অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডার এবং শীর্ষ ১০% ধনী ব্যক্তি, যাদের হাতে আমেরিকার সিংহভাগ স্টক এবং বিনিয়োগের পোর্টফোলিও রয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যাদের সম্পদের উৎস কোনো ইনভেস্টমেন্ট বা অ্যাসেট নয় বরং তাদের দৈনন্দিন মজুরি, তারা চারদিক থেকে পিষ্ট হতে শুরু করে।
বর্তমান পরিস্থিতি হল আমেরিকার শীর্ষ ১% ধনীর হাতে এখন দেশের নিচের স্তরের ৫০% মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি সম্পদ রয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ফেডারেল রিজার্ভের দেওয়া তথ্য। ১৯৮০ সালের পর থেকে আমেরিকায় একজন শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ৬০%-এরও বেশি বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় সাধারণ শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি প্রায় একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে।
বিপরীতে মধ্যবিত্ত জীবনের স্থায়িত্বের মূল তিনটি উপাদান - আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খরচ, এই একই সময়ে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি বেড়েছে। আমেরিকার এক পুরো প্রজন্ম সেটাই করেছে, যা তাদের করতে বলা হয়েছিল। তারা কঠোর পড়াশোনা করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে, ডিগ্রি নিয়েছে এই আশায় যে এটি তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে।
কিন্তু আজ তারা এমন এক পৃথিবীতে পা রেখেছে, যেখানে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে ঋণের বিশাল বোঝা এবং এমন সব চাকরি, যা দিয়ে তাদের বাবা-মায়েরা যে ধরণের জীবনযাপন করতেন তার অর্ধেকও অর্জন করা সম্ভব নয় বেঁচে থাকার জন্য। এটি কোনো একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। এটি একটি ব্যবস্থার সমস্যা ও ব্যর্থতা। অথবা আরও নির্ভুলভাবে বললে, এটি একটি সিস্টেমের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত পুনর্নির্মাণ।
আমেরিকানরা কঠোর পরিশ্রম করা বন্ধ করে দিয়েছে বলে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধ্বংস হচ্ছে না। এটি ধ্বংস হচ্ছে কারণ গত ৫০ বছর ধরে, অর্থনীতির নিয়মগুলো অত্যন্ত নীরবে এবং পদ্ধতিগতভাবে এমন কিছু মানুষের দ্বারা পুনর্লিখিত হয়েছে যারা জানতেন, তারা কী কী পরিবর্তন করছেন।
**তথ্যসূত্রঃ
(০১) The Death of Money: The Coming Collapse of the International Monetary System; by James Rickards.
(০২) The Power of Money: How Governments and Banks Create Money and Help Us All Prosper; by Paul Sheard.
(০৩) Crashed: How a Decade of Financial Crises Changed the World; by Adam Tooze.
(০৪) Manias, Panics, and Crashes: A History of Financial Crises; by Charles Kindleberger.
(০৫) This Time Is Different; by Carmen Reinhart & Kenneth Rogoff.
(০৬) Lords of Finance: The Bankers Who Broke the World; by Liaquat Ahamed.
(০৭) When Genius Failed: The Rise and Fall of Long-Term Capital Management; by Roger Lowenstein.
(০৮) House of Cards: A Tale of Hubris and Wretched Excess on Wall Street; by William D. Cohan.