12/07/2026
নিজের জীবনটা দেখুন।
একসময় আমাদের চাওয়া ছিল—হালালভাবে চলব, পরিবারকে ভালো রাখব, নামাজ ঠিক করব, আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে বাঁচব। কিন্তু কখন যেন লক্ষ্যটা বদলে গেল। এখন অন্যের গাড়ি দেখলে নিজের গাড়ি ছোট লাগে, অন্যের বাড়ি দেখলে নিজের ঘর অসম্পূর্ণ মনে হয়, অন্যের ব্যবসা বাড়লে নিজের আয়কে ব্যর্থতা মনে হয়, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও সফলতা দেখলেই ভেতরে অস্থিরতা শুরু হয়—“আমাকেও আরও করতে হবে। আরও পেতে হবে। আরও এগোতে হবে।”
প্রশ্ন হলো—এগিয়ে যাচ্ছি কোথায়?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌঁছেছ।”
—সূরা আত-তাকাসুর: ১–২
আয়াতটি খুব ছোট। কিন্তু নিজের জীবনের সামনে রেখে পড়লে ভয় লাগে।
আল্লাহ বলেননি—অর্থ উপার্জন করো না। ভালো বাড়ি রেখো না। ব্যবসা বড় করো না। বরং সমস্যা হচ্ছে “তাকাসুর”—কে বেশি পেল, কে বেশি জমাল, কে বেশি দেখাতে পারল, কে কার চেয়ে এগিয়ে গেল—এই ক্রমাগত বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা যখন মানুষকে আসল লক্ষ্য থেকে গাফেল করে দেয়।
অর্থাৎ, সম্পদ হাতে থাকা এক বিষয়; আর সম্পদের প্রতিযোগিতা অন্তর দখল করে নেওয়া আরেক বিষয়।
আপনি ব্যবসা করছেন—ভালো কথা। কিন্তু ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে ফজর চলে যাচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হবে। আপনি সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চান—এটা দায়িত্ব। কিন্তু তার স্কুল, ক্যারিয়ার, ভাষা, স্কিল—সব নিয়ে চিন্তা করছেন; অথচ সে আল্লাহকে চিনছে কি না, নামাজ শিখছে কি না—এটা কি তালিকার শেষে পড়ে আছে?
আপনি আয় বাড়াচ্ছেন। কিন্তু সাথে সদাকাহ বাড়ছে? শুকর বাড়ছে? হারাম থেকে ভয় বাড়ছে? নাকি আয় যত বাড়ছে, চাহিদার তালিকাও তত বড় হচ্ছে?
এটাই তাকাসুরের ভয়ংকর দিক। মানুষ মনে করে সে সামনে যাচ্ছে, অথচ কখনো কখনো সে শুধু একটা ঝুলন্ত লক্ষ্যকে ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে। প্রতিবার মনে হয়—“আর এটুকু পেলেই শান্ত হব।” তারপর সেটা পাওয়া হয়। কিছুদিন পর আবার নতুন কিছু সামনে ঝুলে যায়।
আর আমরা আবার দৌড়াই।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আদম সন্তানের যদি দুটি উপত্যকা ভর্তি সম্পদ থাকে, তবে সে তৃতীয়টি চাইবে…”
—সহিহ বুখারি: ৬৪৩৬; সহিহ মুসলিম: ১০৪৮
মানুষের সমস্যা শুধু “কম থাকা” নয়। কখনো সমস্যা হলো—কোথায় থামতে হবে, সেটা না জানা।
তাই ইসলাম আমাদের দরিদ্র হতে শেখায় না; ইসলাম আমাদের দুনিয়ার গোলাম না হতে শেখায়।
আপনার কাছে অর্থ থাকবে, কিন্তু অর্থ আপনার অন্তরের মালিক হবে না। আপনি উন্নতি করবেন, কিন্তু অন্যকে হারানোর জন্য নয়। আপনি সুন্দর জীবন গড়বেন, কিন্তু আখিরাত ধ্বংস করে নয়।
আল্লাহ তাআলা কারূনের কাহিনির প্রসঙ্গে যে নসিহত উল্লেখ করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে—
“আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর; আর দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না।”
—সূরা আল-কাসাস: ৭৭
খেয়াল করুন, কী অসাধারণ ভারসাম্য।
আখিরাতকে লক্ষ্য করো। দুনিয়ার বৈধ অংশও ভুলে যেয়ো না।
আমাদের সমস্যা হয় যখন উল্টোটা করি—দুনিয়াকে লক্ষ্য বানাই, আর আখিরাতকে অবসর সময়ের কাজ বানিয়ে ফেলি।
দিনের সবচেয়ে সতেজ সময় কাজের জন্য। সবচেয়ে বেশি চিন্তা টাকার জন্য। সবচেয়ে বেশি পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য। কিন্তু নামাজ? সময় পেলে। কুরআন? পরে। তাওবা? বয়স হলে। দ্বীনি ইলম? ফ্রি থাকলে।
এরপর হঠাৎ একদিন মানুষ বুঝতে পারে—যার জন্য এত দৌড়ালাম, তার অনেকটাই রেখে যেতে হবে। যে শরীরকে আরাম দিতে এত আয়োজন করলাম, সেই শরীরকেই একদিন মাটিতে রেখে আসা হবে।
সূরা আত-তাকাসুর আমাদের সেই শেষ দৃশ্যটাই আগে থেকে দেখিয়ে দেয়—“যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌঁছেছ।”
অর্থাৎ দৌড় কখনো নিজে থেকে থামে না। মৃত্যু এসে থামিয়ে দেয়।
তাই আজ নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—আমি কি হালাল রিজিকের জন্য চেষ্টা করছি, নাকি তুলনার নেশায় দৌড়াচ্ছি? আমি কি পরিবারের প্রয়োজন পূরণ করছি, নাকি মানুষের চোখে সফল দেখানোর জন্য জীবন পুড়িয়ে দিচ্ছি? আমার সম্পদ কি আমাকে আল্লাহর শুকরগুজার বানাচ্ছে, নাকি আরও অস্থির করছে?
আরও একটা কঠিন প্রশ্ন—
যদি আজ আমার আয়, পদ, ব্যবসা বা সম্পদ কমে যায়—আমার নিজের মূল্যও কি আমার চোখে কমে যাবে?
যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে হয়তো আমরা নিজের পরিচয়টা ভুল জায়গায় বেঁধে ফেলেছি।
আপনার রিজিক বাড়ুক—আলহামদুলিল্লাহ। ব্যবসা বড় হোক—আলহামদুলিল্লাহ। সুন্দর বাড়ি হোক—আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু প্রতিবার কিছু বাড়ার সাথে সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
আমার আখিরাতের প্রস্তুতিও কি বাড়ছে?
কারণ যে প্রাচুর্য আপনাকে আল্লাহর দিকে নেয়, সেটা নিয়ামত হতে পারে। আর যে প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা আপনাকে সালাত, শুকর, হালাল-হারামের ভয় ও মৃত্যুর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়—সেটাই আপনার জন্য পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
আজ দৌড় থামাতে হবে না।
দৌড়ের দিকটা ঠিক করতে হবে।
আল্লাহ আমাদের এমন রিজিক দিন যা হালাল, প্রশস্ত ও বরকতময়; এবং দুনিয়ার প্রাচুর্যকে যেন আমাদের আখিরাতের লক্ষ্য থেকে গাফেল না করে। আমিন। 🤲
১. ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; সম্পদের কারণে গাফেল হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে।
২. সমস্যা “আরও পাওয়া” নয়—সমস্যা হলো, “আরও চাই” কখন অন্তর দখল করে নেয়।
৩. দুনিয়ায় উন্নতি করুন, কিন্তু আখিরাতকে পিছনে ফেলে নয়।
৪. আয় বাড়ার সাথে শুকর, সদাকাহ ও আল্লাহভীতিও বাড়ছে তো?
৫. দৌড় থামাতে হবে না; দৌড়ের দিকটা ঠিক করতে হবে।
🌿 তাকাসুরের ফাঁদে পড়ছি কি না—৫টি প্রশ্ন
১. অন্যের সম্পদ দেখলে কি নিজের নিয়ামত ছোট মনে হয়?
২. আয় বাড়ানোর জন্য কি নিয়মিত সালাত বা দ্বীনি দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
৩. প্রয়োজনের চেয়ে মানুষের চোখে সফল দেখানো কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
৪. আয় বাড়লেও কি সদাকাহ ও শুকর একই জায়গায় আছে?
৫. আখিরাতের জন্য আমার যত পরিকল্পনা, দুনিয়ার জন্যও কি শুধু ততটুকুই—নাকি উল্টো?
📌 পোস্ট-টি সদকায়ে জারিয়া এবং ইসলাম প্রচারের স্বার্থে শেয়ার করে অশেষ সওয়াবের ভাগিদার হোন। এই পোস্ট আপনার আখেরাতের কঠিন মুসিবাতের সময় নাজাতের ওসিলা হয়ে যাক, আমিন🤲