14/05/2026
শহুরে মিশনারিজ ভিক্ষু : ভদন্ত ড. শরণপাল ভিক্ষু
===============================
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়
আমি যে ভিক্ষুটির কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই, তিনি কেউ নন, আমাদেরই আপনজন চট্টগ্রামের সন্তান, যিনি বিশ্ববৌদ্ধদের নেতৃত্বের আসনে ভদন্ত ড. শরণপাল ভিক্ষু। বর্তমানে কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সের মেসাসাগর West End Buddhist Temple এ অবস্থান করছেন। তাকে Urban Buddhist Monk বলে অভিহিত করেন। আর্বান মানে নগর সম্বন্ধী বা নগরস্থ, নাগরিক, নগর-শহরে জীবনে অবস্থান। বুদ্ধের সময় থেকে কিছু ভিক্ষু বিমুক্তি লাভে অরণ্যে বসবাস করতেন। কিছু ভিক্ষু ধর্ম প্রচারে নগরে অবস্থান করেন। ভদন্ত শরণপালও বৃহত্তর টরেন্টো সিটিতে অবস্থান করে বিশ্বব্যাপী ধর্ম প্রচার করে চলেছে।
তাঁর জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনীয়া থানার ঐতিহ্যবাহী পোমরা গ্রামে। পিতা-প্রয়াত পুলিন বড়–য়া ও মাতা প্রয়াত দিপ্তী রাণী বড়–য়া। ভাই-বোনদের মধ্যে ছয় ভাই এক বোন। শরণাপাল চতুর্থ। বোনটি সবার ছোট। শণনপাল খুব ছোট কালে বাংলাদেশে বুদ্ধ শাসনে প্রব্রজ্যা নিয়ে শ্রীলংকায় বিদ্যা শিক্ষা করতে যান। তাকে ঐ সময় সহায়তা করেন উপসংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের ও ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথের। শ্রীলংকায় গিয়ে তিনি প্রথমে শ্রীলংকার ঐতিহাসিক কেন্ডি শহরে প্রিমরোজ গার্ডেনে ‘ধর্মায়তন’ শিক্ষায়তনে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখান থেকে সে University of Peradiniya থেকে বৌদ্ধধর্ম ও প্রাচ্য ভাষার উপর ডিগ্রী নেন। পরে সিংহলী ভাষার উপর Royal Pundit Degree নেন। পালি ও সংস্কৃত ভাষার উপর Island`s hallowed Uriental Languages Institute থেকে BA ডিগ্রী নেন। তিনি ঐ সময়ে শ্রীলংকার অমরাপুর নিকায়ের মহাসংঘনায়ক Madihe Pannasiha Mahanayaka Thero এর উপাধ্যাত্বে উপসম্পদা গ্রহণ করেন। তাঁর অনুশাসন ছিলেন -Ampitiya Sri Rahula Mahathera.
পরবর্তীতে সে কানাডা গমন করেন। সে আবাসিক ভিক্ষু হিসেবে থেকে University of Toronto এ লেখাপড়া আরম্ভ করেন। সেখানে তুলনামুলক ধর্মতত্ত্ব ও প্রাচ্য দর্শনের উপর ২০০০ সালে বি,এ অর্নাস ডিগ্রী নেন। একই সাথে Buddhist Chaplain হিসেবে যোগ দেন। ২০০২ সালে Hamilton`s Mc Master University থেকে এম এ ডিগ্রী নেন। পুনরায় সে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেন্ট ডিগ্রী নেন। Center for The Study of Religion পাশাপাশি West End Buddhist Temple থেকে Sunday Dhamma School এবং Youth Fourm এর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করতে থাকেন। এভাবে অত্যন্ত মেধাবী ধীমান শরণপালের মেধা বিকশিত হতে থাকে। সে হতে শরণপাল নানা জায়গায় ধর্ম দেশনা, লেকচার দিতে থাকে। কানাডার পালামেন্ট ভবন থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিদগ্ধজনের কাছে লেকচার দিয়ে পরিচিতি লাভ করেন। বিশ্বব্যাপী তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় সার্ভিসের জন্য সম্মাননা ও পদক লাভ করেন। মানবতার সার্ভিসের জন্য অন্টারিও সরকার তাকে মানবাধিকার পদক দেন।
সে একজন নামকরা বিদর্শনাচার্য । এখন সে টরেন্টোর পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের বিদর্শন ভাবনা দিয়ে থাকেন। অনেক মানসিক ডাক্তার তাদের রোগীকে ভদন্ত ড. শরণপাল ভন্তের কাছে পাঠিয়ে দেন বিদর্শন ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি লাভে। মানুষ জীবন সংগ্রামে করতে গিয়ে অনেক সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তারী চিকিৎসাও এর সুফল মেলে না। তার জন্য বুদ্ধের বিদর্শন ভাবনা অত্যাধিক কার্যকর। সেটার কাজ ভদন্ত শরণপাল নিষ্টার সাথে করে যাচ্ছেন। এ ধ্যান শিক্ষা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে ড. শরণপাল ভান্তেদের আন্তরিক প্রচেষ্টায়। আমি যতো বারই কানাডা গিয়েছি ড.শরণপালের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছি। বেশ কয়েকবার তাঁর সাথে গিয়ে তাঁর লেকচার গুলো শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। বিশেষ করে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া ভাষণ গুলো। টরেন্টোর মেসাসাগা সিটিতে West End Buddhist Temple প্রতিষ্টিত হয়েছে। তাঁর সিংহভাগ অর্থ যোগান দাতা ভদন্ত ড. শরণপাল মহাথের। তিনি তাঁর কানাডিয়ান ভক্তকূল থেকে আর্থিক যোগান করে বিহার প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। বিহারটির ট্রাষ্টির মধ্যে সে এখন অন্যতম। যতো বিদেশী কানাডিয়ান ও অন্যাদের দেশের লোকদের সাথে সমন্বয় সাধন করেন ভদন্ত শরণপাল।
তাঁর দেশের প্রতিও অগাধ টান। আমার জানামতে সে যা দান-দক্ষিণা ও লেকচার করে সম্মানী পায় অকাতরেই ধর্ম ও মানবতার জন্য দান করেন। আশুলিয়া বোধিজ্ঞান ভাবনা কেন্দ্র, উত্তরা বাংলাদেশ মহাবিহার, বাড্ডায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, নিজগ্রামে পোমরায় সে সাধ্য মতো দান দিয়েছে। শিক্ষা বিস্তারে পিতা-মাতার নামে ট্রাষ্ট প্রতিষ্টা করে প্রতিবছর রাঙ্গুনীয়া থানার গরীব অসহায় মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন। আমাকেও উত্তরবঙ্গে শিক্ষা বৃত্তি প্রদানের জন্য বুদ্ধিস্ট এইড ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের মাধ্যমে দুইলক্ষ টাকা দান করেন। এমন মহানুভবতা সম্পন্ন কয়জন বৌদ্ধ ভিক্ষু আছে।
আমার সাথে ড. শরণপাল ভিক্ষু ও তার ভাই যীশু বড়–য়া, ঢাকায় অবস্থানরত তাঁর ছোট বোন ও বোনের জামাই মি. অনিমেষ বড়–য়ার সাথে সর্ম্পক র্দীঘ দিনের। বিগত ৪ আগস্ট ২০০০ সালে আমি বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে মহামান্য অষ্টম সংঘরাজ শীললংকার মহাথের মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ‘অগ্গমহাসদ্ধর্মজ্যোতিকাধজ’ উপাধি প্রাপ্তিতে মিয়ানমার দূর্তাবাস কর্তৃক এক হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। এতে সভাপতিত্ব করেছিল দশম সংঘরাজ জ্যোতি:পাল মহাথের, উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সংঘরাজ ধর্মসেন মহাথের, উপসংঘরাজ সত্যপ্রিয় মহাথের, শীলভদ্র মহাথের, ড. জিনবোধি মহাথের, ড. শরণপাল ভিক্ষু প্রমুখ। আমি অনুষ্ঠানটি ভদন্ত শরণপাল কে দিয়ে সেদিন উপস্থাপনার কাজটি সমাধান করেছিলাম। ড. শরণপালের নেতৃত্বে কানাডায় প্রতিষ্টিত বৌদ্ধ সংগঠন, বিহার সমূহের সমন্বয়ে প্রতিবৎসর সিলেভেশন স্কোয়ারে বুদ্ধ জয়ন্তী উৎসব করে থাকেন। সকল দেশের বৌদ্ধরা স্ব স্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে অংশ গ্রহন করেন। সেখানে কানাডার প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যোগদান করেন। আমারও এক বছর অংশ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এটি তাঁর জীবনে একটি শ্রেষ্ঠ অবদান।
কানাডাতে সকল ধর্মের লোকদের নিয়ে আন্ত:ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যান। আন্ত:ধর্মীয় সম্প্রীতির অভাবে বর্তমানে ধর্মে ধর্মে, জাতিতে জাতিতে যে সংঘাত অবিশ্বাস দূরীকরণে এর গুরুত্ব রয়েছে। সে কঠিন কাজটি করে যাচ্ছেন ভদন্ত শরণপাল মহাথের।
এ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রীলংকায় যাদের অনুপ্রেরণায় আজ এতোটুকু এগিয়েছে তারা হলেন-মাডিহে পঞ্ঞসিংহ মহানায়কা থের, আমপিটিয়ে শ্রী রাহুলা মহাথের, এম. প্রেমালংকারা মহাথের, ড. মাডাওয়ালে পূর্ণজী মহাথের, ভদন্ত বি. মুদিতা মহাথের. ভদন্ত এম. কমলাশ্রী মহাথের, মি. গোডিন সামারারতেœ। তিনি কানাডা, আমেরিকা সর্ব ইউরোপে সদ্ধর্মকে বিকশিত করার জন্য নিরনÍর ছুটে চলেছেন।
আমরা তাঁর বিশেষ কার্যক্রমের মধ্যে পাই-
(1) University guest lectures
(2) High school teacher
(3) Public speaking engagements/ pre sensations
(4) Churches and faith groups
(5) Corporate wellness programs
আমরা মনে করি ভদন্ত শরণপাল ভিক্ষুর মতো উদীয়মান বৌদ্ধ ভিক্ষু সমাজ, সদ্ধর্মকে এগিয়ে নিতে বেশী বেশী প্রয়োজন। কিন্তু সমাজ কি এ রকম বৌদ্ধ ভিক্ষু সৃষ্টিতে কোন প্রেরণাদায়ক কিংবা সহযোগিতা সমাজ থেকে আছে। অনেক তরুণ ভিক্ষ ুসমাজের কিছু কুৎসিৎ চেহারার মানুষের কারণে চীবর ত্যাগ করে সংসারী হয়েছে। অনেক তরুণ ভিক্ষু তারা সমাজের নোংরা পরিবেশ দেখে চীবর ত্যাগের পথে। ভিক্ষুদের ধরে রাখার জন্য কোন প্রনোদনা নেই। দক্ষ সংঘ সৃষ্টিতে কোন প্রচেষ্টা নেই। এ সমাজ সদ্ধর্ম কে রক্ষা করবে। কোন ভিক্ষু কাজ করতে চাইলে তিনি পদে পদে বাঁধা প্রাপÍ হচ্ছে। এর থেকে উত্তোরণ চাই। সদ্ধর্মকে এগিয়ে নিতে সমাজের দায়ক-দায়িকার পৃষ্ঠপোষতা ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। টরেন্টোর ড. শরণপাল ভিক্ষুর বিহারে একদিন দেখলাম কিছু দায়ক (মধ্য বয়ষ্ক) বিহার পরিষ্কার, ভিক্ষুদের টয়রেটও পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আমি ড. শরণপালের কাছে জিজ্ঞেস করলে সে বরলো- এরা আমাদের অভিবাবক। পিতা-মাতার মতো। আমাদের যদি কোন ভুল হয় কল্যাণমিত্রের মতো আমাদের ভুল গুলো শোধরিয়ে দেন। উৎসাহ দান করেন। আর আমাদের সমাজে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ভিক্ষুদের ত্রুটি বের করে তাদেরকে কিভাবে ধ্বংস করবে- এ নিয়ে গবেষণা করে। যেন আমরা ভিক্ষু হয়ে মহাঅপরাধী ।এর থেকে পরিত্রাণ দরকার। সচেতন দায়ক-দায়িকা তথা শাসন দরদীরাই এ কাজটি এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
তিনি একজন মানবতাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু।কোন মানুষের কষ্ট দেখলে সে আর চুপ করে থাকতে পারেন না। এ করোনাকালেও তিনি চট্রগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে কর্মহীন মানুষের পাশে সাধ্য মতো সাহায্যে প্রদান করেন। শেষবার যখন তিনি দেশে আসেন চট্রগ্রামে রেল স্টেশনের পার্শ্বে ছিন্নমূল মানুষদের নিজ হস্তে দান করেন।Founder oF Canada: A Mindful and Kind Nation আজ এ মানবতাবাদী বিদর্শনার্চায ভিক্ষুটির শুভ জন্ম দিনে আমার নিরন্তর শুভেচ্ছা। আমি ড. শরণপালের আে রা সমৃদ্ধি, উন্নতি কামনা করছি।
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়: সম্পাদক, সৌগত, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন