07/19/2026
গত সাত দিনে আপনার ফোন আপনার কাছ থেকে কত ঘণ্টা নিয়েছে? আর কুরআন পেয়েছে কত মিনিট?
উত্তরটা হয়তো একটু অস্বস্তিকর। কিন্তু এই হিসাবটাই বলে দেয়, আমাদের ভেতরে এখন কোন দিকটা বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোন হাতে নিই। একটু notification দেখব, তারপর কাজে ফিরব। কিন্তু একটি video থেকে আরেকটি video, একটি post থেকে আরেকটি post দেখতে দেখতে কখন যে আধা ঘণ্টা চলে যায়, বুঝতেই পারি না। অথচ কুরআন নিয়ে দশ মিনিট বসতে গেলে মন অস্থির হয়ে ওঠে। দুই রাকাত নফল নামাজ দীর্ঘ মনে হয়। কোনো দ্বীনি বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার জন্যও সময় পাওয়া যায় না।
সমস্যা শুধু ফোনে নয়। ফোন একটি মাধ্যম। আসল সমস্যা হলো, আমরা প্রতিদিন নিজের মন ও হৃদয়কে কী দিয়ে খাওয়াচ্ছি।
একটি গাছকে নিয়মিত পানি ও যত্ন দিলে সেটি বেড়ে ওঠে। অন্য গাছটিকে অবহেলা করলে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। আমাদের ভেতরের অবস্থাও এমন। ঈমানকে যত্ন দিলে ঈমান শক্তিশালী হয়। আর নফসের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করতে থাকলে একসময় নফসই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।”
সূরা আশ শামস, আয়াত ৯ ও ১০
ইসলাম নফসকে ধ্বংস করতে শেখায় না। নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধ করতে শেখায়। বৈধ আনন্দ থাকবে, বিশ্রাম থাকবে, প্রয়োজনীয় বিনোদনও থাকবে। কিন্তু মন যা চাইবে, যখন চাইবে, সবকিছুই পূরণ করতে হবে, এটা মুমিনের জীবন নয়।
আযান হয়ে গেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে videoটা শেষ করে নামাজ পড়ব। আমরা মনের কথা শুনলাম।
কারও বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। আমরা গীবত শুরু করলাম।
এমন কিছু সামনে এলো, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না। চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা দেখতেই থাকলাম।
প্রতিবার এমন করার মাধ্যমে আমরা নিজের নফসকে শেখাই, “তুমি যা চাইবে, আমি সেটাই করব।”
আবার প্রতিবার আযান শুনে ফোন রেখে দিলে, হারাম কিছু সামনে এলে চোখ ফিরিয়ে নিলে, ক্লান্তির মধ্যেও কুরআনের একটি পৃষ্ঠা পড়লে, রাগের সময় নিজেকে থামালে কিংবা গুনাহের সুযোগ পেয়েও আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দিলে আমরা নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করি।
বড় পরিবর্তন সবসময় বড় কোনো সিদ্ধান্ত থেকে আসে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তই একসময় আমাদের অভ্যাস, চরিত্র ও জীবন তৈরি করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম
তাই একদিনে নিজেকে পুরো বদলে ফেলার চাপ নেওয়ার দরকার নেই। আজ শুধু একটি ছোট পরিবর্তন করুন। প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা কুরআন পড়ুন। সকাল বা সন্ধ্যায় পাঁচ মিনিট যিকির করুন। একটি অনর্থক page unfollow করুন। ঘুমানোর আগে কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকুন। এমন একটি অভ্যাস বেছে নিন, যা প্রতিদিন আপনার ঈমানকে সামান্য হলেও পুষ্ট করবে।
কারণ আমরা যা বারবার দেখি, শুনি ও গ্রহণ করি, ধীরে ধীরে সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করি।
শুরুতে হারাম কিছু দেখলে অন্তরে অস্বস্তি হয়। বারবার দেখলে একসময় সেটিই সাধারণ মনে হয়। প্রথম দিকে নামাজ ছুটে গেলে কষ্ট লাগে। নিয়মিত অবহেলা করতে থাকলে একসময় আর তেমন কিছুই অনুভূত হয় না।
আবার শুরুতে কুরআন পড়তে মন না বসলেও নিয়মিত পড়তে থাকলে একসময় কুরআন ছাড়া দিনটাকে অসম্পূর্ণ মনে হবে। প্রথমে তাহাজ্জুদের জন্য ওঠা কঠিন লাগলেও ধীরে ধীরে রাতের সেই নীরব সময়টাই হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় সময় হয়ে উঠতে পারে।
আপনি যাকে খোরাক দেবেন, সেটাই আপনার ভেতরে বাড়বে।
তাই দিনের শেষে শুধু এই প্রশ্ন করবেন না, “আজ আমি কী কী করলাম?”
নিজেকে প্রশ্ন করুন, “আজ আমি আমার ভেতরে কাকে বেশি শক্তিশালী করলাম? ঈমানকে, নাকি নফসের তাৎক্ষণিক চাহিদাকে?”
আজ যদি মনে হয় নফসই বেশি শক্তিশালী হয়ে গেছে, তাহলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যতদিন জীবন আছে, ফিরে আসার সুযোগও আছে। পরিবর্তন শুরু হতে পারে আজকের একটি ছোট সিদ্ধান্ত থেকেই।
ফোনে সময় একটু কমান। কুরআনের সঙ্গে সময় একটু বাড়ান। অনর্থক content কমান। উপকারী ইলম গ্রহণ করুন। মানুষের approval কম খুঁজুন। আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিন।
একদিনেই সব বদলে যাবে না। কিন্তু নিয়মিত থাকলে ধীরে ধীরে আপনার মন বদলাবে, পছন্দ বদলাবে, অভ্যাস বদলাবে, তারপর জীবনও বদলে যাবে ইন শা আল্লাহ।
আপনার ফোনের battery প্রতিদিন চার্জ হয়। কিন্তু আপনার হৃদয় শেষ কবে কুরআন, সালাত ও যিকিরের মাধ্যমে চার্জ হয়েছিল?
আল্লাহ আমাদের অন্তরকে কুরআন, সালাত, যিকির ও উপকারী ইলমের মাধ্যমে জীবিত রাখুন। আমাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করুন এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একমাত্র তাঁর অনুগত বান্দা হওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━
পোস্ট-টি সদকায়ে জারিয়া এবং ইসলাম প্রচারের স্বার্থে শেয়ার করে অশেষ সওয়াবের ভাগিদার হোন। এই পোস্ট আপনার আখেরাতের কঠিন মুসিবাতের সময় নাজাতের ওসিলা হয়ে যাক, আমীন।
Courtesy : Ad-Deen