01/16/2026
জালিমকে বদদোয়া দেওয়া যাবে যে আপনার ক্ষতি করতেছে?
উত্তর :
কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু হওয়া স্বত্ত্বেও তাঁর কিছু কিছু বান্দাদের প্রতি অভিশাপ এবং শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ وَ اَعَدَّ لَہُمۡ عَذَابًا مُّہِیۡنًا
"নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লানত করেন এবং তিনি তাদের জন্য প্ৰস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।"(সূরা আহযাব:৫৭)।
فَہَلۡ عَسَیۡتُمۡ اِنۡ تَوَلَّیۡتُمۡ اَنۡ تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ تُقَطِّعُوۡۤا اَرۡحَامَکُم. اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ لَعَنَہُمُ اللّٰہُ فَاَصَمَّہُمۡ وَ اَعۡمٰۤی اَبۡصَارَہُمۡ.
"অবাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লানত করেছেন, ফলে তিনি তাদের বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন।"(সূরা মুহাম্মদ:২২-২৩)।
এছাড়া, কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক অপরাধীদের লানতের ব্যাপারটি প্রমাণিত। শুধু তাই নয়, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক তাঁর কওমের কাফিরদের প্রতি বদদোয়ার বিষয়টিও কুরআনে এসেছে। তিনি বদদোয়া করেছিলেন,
رَّبِّ لَا تَذَرۡ عَلَی الۡاَرۡضِ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ دَیَّارًا. اِنَّکَ اِنۡ تَذَرۡہُمۡ یُضِلُّوۡا عِبَادَکَ وَ لَا یَلِدُوۡۤا اِلَّا فَاجِرًا کَفَّارًا.
"হে আমার পালনকর্তা! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কাউকেই অবশিষ্ট রেখো না। তুমি তাদেরকে অবশিষ্ট রাখলে তারা নিশ্চয়ই তোমার দাসদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং কেবল দুষ্কৃতিকারী ও কাফিরদেরকেই জন্ম দিতে থাকবে।"(সূরা নূহ:২৬-২৭)।
তিনি আরো দোয়া করেছিলেন,
وَ لَا تَزِدِ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا تَبَارًا
"আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করো।"(সূরা নূহ:২৮)।
এবার আমরা জানব, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো জন্য বদদোয়া করেছিলেন কিনা। উত্তর হলো, হ্যাঁ, করেছিলেন। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদের যুদ্ধের দিন সাহাবীদের নিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে এই বলে বদদোয়া করেছিলেন,
اللَّهُمَّ قَاتِلِ الْكَفَرَةَ الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِكَ ، وَيُكَذِّبُونَ رُسَلَكَ ، وَاجْعَلْ عَلَيْهِمْ رِجْزَكَ وَعَذَابَكَ ، اللَّهُمَّ قَاتِلِ الْكَفَرَةَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ ، إِلَهَ الْحَقِّ
"হে আল্লাহ! তুমি কাফেরদের ধ্বংস করো, যারা তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তোমার ক্রোধ ও আযাব তাদের উপর অবতীর্ণ করো। হে আল্লাহ! কিতাবপ্রাপ্ত কাফেরদের ধ্বংস করো। হে সত্য ইলাহ।"(সুনানে নাসাঈ, আদাবুল মুফরাদ:৭০৪)।
আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত বলেন,"রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাস ব্যাপী আরবের কতিপয় গোত্রের প্রতি বদদোয়া করার জন্য সালাতে রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন।"(সহিহ বুখারী:৪০৮৯)।
রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহযাবের যুদ্ধের দিন মুশরিকদের বিরুদ্ধে এই বলে দোয়া করেছিলেন,
اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الكِتَابِ، سَرِيعَ الحِسَابِ، اللَّهُمَّ اهْزِمِ الأَحْزَابَ، اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ
"হে আল্লাহ! হে কিতাব অবতীর্ণকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। হে আল্লাহ! শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করো। হে আল্লাহ! এদের তুমি পরাভূত করো। এদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দাও।"(সহিহ বুখারী:২৯৩৩)।
রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার বায়তুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করছিলেন। তখন আবু জাহেলের নির্দেশে উক্ববা বিন আবু মুআইত রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর উটের নাড়ি ভুঁড়ি চাপিয়ে দিল এবং তারা সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই অবিরাম কষ্টের কথা জানতে পেরে হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা ছুটে আসেন এবং তাঁর বাবার উপর থেকে নাড়ি ভুঁড়ি সরিয়ে দেন। রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাদের জন্য বদদোয়া করে বলেছিলেন,"হে আল্লাহ! তুমি কুরায়েশকে ধরো (তিনবার)। হে আল্লাহ! তুমি আমর ইবনে হেশাম (আবু জাহল) কে ধরো। হে আল্লাহ! তুমি উৎবা ও শায়বাহ বিন রাবীআহ, অলীদ বিন উৎবা, উমাইয়া বিন খালাফ, ওক্ববা বিন আবু মুআইত এবং উমারাহ বিন অলীদকে ধরো।" হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,"আমি তাদের (উক্ত ৭ জনের) সবাইকে বদর যুদ্ধে নিহত হয়ে কূয়ায় নিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখেছি।"(সহিহ বুখারী:৫২০, সহিহ মুসলিম:১৭৯৪)।
আরেকদিনের ঘটনা। আবু লাহাবের পুত্র উতাইবা রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললো, আমি সূরা নাজমের ১ ও ৮ নং আয়াত দুটোকেই অস্বীকার করি। এ বলেই সে হেঁচকা টান দিয়ে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জামা ছিঁড়ে ফেলল এবং তাঁর উপর থুথু নিক্ষেপ করলো। এরপর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য বদদোয়া করে বলেন, "হে আল্লাহ! তুমি এর উপরে তোমার কোনো একটি কুকুরকে বিজয়ী করে দাও।"(মুস্তাদরাকে হাকিম:৩৯৮৪)। কিছুদিন পরে উতাইবা সিরিয়ায় ব্যবসায়িক সফরে গেলে সেখানে যারক্বা নামক স্থানে রাত্রি যাপন করে। এমন সময় হঠাৎ একটা বাঘকে সে তাদের চারপাশে ঘুরতে দেখে ভয়ে বলে উঠে, "আল্লাহর কসম! এ আমাকে খেয়ে ফেলবে। এভাবেই তো মুহাম্মাদ আমার বিরুদ্ধে বদদোয়া করেছিল। সে আমাকে হত্যাকারী। অথচ সে মক্কায় আর আমি শামে। অতঃপর বাঘ এসে সবার মধ্য থেকে তাকে ধরে নিয়ে ঘাড় মটকে হত্যা করলো।" (মাজমাউয যাওয়ায়েদ:৯৮২০)।
আল্লাহ তায়ালা যেন জালিম এবং ইসলামের দুশমনদের নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেন। আমিন
(ঈষৎ পরিমার্জিত)
লিখেছেন— মুহতারাম মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান