10/12/2026
।।= যাঁরা রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম বিদ্বেষী বলছেন এবং ‘রঠা’ বোলে সম্বোধন করছেন =।।
টার্গেট রবীন্দ্রনাথকে টেনে নামানো। যদিও জাতীয় জীবনে জরুরী নয়, দেশ হাবুডুবু খাচ্ছে রাজনৈতিক অনাচার অনিশ্চয়তায়, তবুও একটি গোষ্ঠি বারবার অজরুরী বিষয়কে সামনে টেনে এনে যেন দেশের রাজনৈতিক সংকটের মাঝে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতে চাইছে। এরা কয়দিন আগে পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রতিষ্ঠা করতে নেমেছিল, এখনও নেমেছে রবীন্দ্রনাথকে নামাতে।
এগুলি জাতির জন্য বর্তমানে জরুরী ইসু ছিলনা তবুও কিছু উত্তর না দিয়ে পারা যায় না, কারন মনে হয় তারা যখন ঘটনা ঘটাচ্ছে, তখন উত্তর না দিলে ক্ষতিটা বেশি হবে।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরেই অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে তিনি মুসলিম বিদ্বেষী সাহিত্যের অগ্রদূত ইত্যাদি। বিভিন্ন আকর্ষনীয় নামে যথা ‘আলোর পরশ’, ‘মরুচারী মুসাফির’ ইত্যাদি। এখানে মুসলমানদেরকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি নমুনা ছোট গল্পের বর্ননা করি। পাঠক বিচার করুন এমন একটি গল্প যিনি লিখতে পারেন তাঁকে কোন বিচারে, কিভাবে, মুসলিম বিদ্বেষী বলা যায়।
গল্পটিতে রবীন্দ্রনাথ দেখাচ্ছেন একটি ব্রাহ্মন হিন্দু পরিবারে মা-বাবাহীন এক রুপসী মেয়ে কমলা, কাকা-কাকিমার কাছে বড় হযে ওঠে। কিন্তু সে রুপসী তাই তার কাকীমা সব সময় অজানা বিপদের ভয়ে শঙ্কিত থাকেন, এবং তাকে এক আপদ মনে করেন। কিন্তু কাকা তাকে অন্তর দিয়ে ভালবাসেন। তাঁরা সত্বর তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। কন্যা বিদায় দেন। কিন্তু রাতে গ্রামের যাত্রাপথে ঘটে ডাকাতের আক্রমন। যেন ঐশী আশীর্বাদ হিসেবে সেখানে আবির্ভূত হন এক শক্ত মুসলিম পিতা, নাম হবির খাঁ। তিনি মেয়েটিকে উদ্ধার করেন, এবং পরম সহানভূতির সাথে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। মেয়েটি ব্রাহ্মনকন্যা তাই হবির খাঁ তাকে আপন আটমহলা বাড়ির এক দিকে শিবের মন্দির আর হিন্দুয়ানি ব্যবস্থার মাঝে এক ব্রাহ্মনের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা কোরে দেন। তবে, এখানেই ওই মুসলমানের উদারতার শেষ নয়।
মেয়েটি তার কাকা-কাকিমার কাছে ফেরত যেতে চায়। হবির খাঁ তাকে সাহস দেন না, বরং বলেন, ‘বাছা, ভুল করছ, আজ তোমার বাড়িতে কেউ তোমাকে ফিরে নেবে না, তোমাকে পথের মধ্যে ফেলে দিয়ে যাবে। না হয় একবার পরীক্ষা করে দেখো।’ তবুও কমলা যেতে চায়। হবির খাঁ নিয়ে যান। মেয়েটিকে কাকার খিড়কির দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বলেন ‘আমি এখানেই অপেক্ষা করে রইলুম।’ মেয়েটি সত্যিই প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসে। – এখন পাঠককে অনুরোধ করছি একটু ভেবে দেখতে যে এখানে কোন ধর্মের মানুষ দিয়ে কোন ধর্মের মানুষের গালে চড় মারা হলো? তবে, এখনও শেষ নয়।
অগত্যা কমলা হবির খাঁর বাড়িতেই ফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, কমলা তাদের কাছে যা পেল তা সে নিজের বাড়িতে কোনোদিন পেত না।
কমলা হবির খাঁকে একদিন বললো, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। যে ধর্ম চিরদিন আমাকে জীবনের সব ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে, অবজ্ঞার আস্তাকুড়ের পাশে আমাকে ফেলে রেখে দিয়েছে, সে ধর্মের মধ্যে আমি তো দেবতার প্রসন্নতা কোনোদিন দেখতে পেলুম না। সেখানকার দেবতা আমাকে প্রতিদিন অপমানিত করেছে সে কথা আজও আমি ভুলতে পারি নে। আমি প্রথম ভালোবাসা পেলুম, বাপজান, তোমার ঘরে। জানতে পারলুম হতভাগিনী মেয়েরও জীবনের মূল্য আছে।’ – আবারও প্রশ্ন, কোন ধর্মের অনুসারীকে ছোট করা হলো? না এখনও শেষ নয়।
তারপর দেখা যায়, কমলা এবং হবির খাঁর মেজ ছেলের মধ্যে প্রেম হয়। কমলা হবির খাঁকে অনুরোধ করে তাকে মুসলমান কোরে নিতে। তার নাম হয় মেহেরজান। কোনো ধর্ম ত্যাগ করার মধ্যে ঘটে চূড়ান্ত প্রত্যখ্যান। এখানে সটি কোন ধর্মের পক্ষে এবং কোনটির বিপক্ষে ঘটলো?
শেষাংশে দেখা যায়, মেহেরজানের (কমলার) কাকাতো বোন সরলার বিয়ে হয়। তাদের বরযাত্রী বাহিনীও ঠিক একই ভাবে, একই জায়গায় ডাকাত দিয়ে আক্রান্ত হয়। এবার তাদের মাঝে দেখা দেয় হবির খাঁর অর্ধচন্দ্র পতাকা বাঁধা বর্শার ফলক হতে মেহেরজান। সরলাকে উদ্ধার কোরে সে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসে। আর বোলে আসে, ‘আমার বোন যদি কখন দুঃখে পড়ে তবে মনে থাকে যেন তার মুসলমান দিদি আছে, তাকে রক্ষা করবার জন্যে।’
আমি পাঠককে অবশ্যই গল্পটা পড়ে নিতে অনুরোধ করবো। ‘মুসলমানীর গল্প’ নিচে লিংক দিলাম।
পাঠক, এবার একটু থেমে চিন্তা করুন, যদি রবীন্দ্রনাথ এমন ধরনের কথা এবং ঘটনাগুলো উল্টো কোরে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে ঘটাতেন তাহলে আমাদের মুসলমানদের মর্যাদা রক্ষার পাট্টাদারগন কি বলতেন, কি করতেন?
রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে, তাঁর সমস্ত জীবন থেকে, এমন অনেক উদাহরন দিতে পারি। কিন্তু দিচ্ছি না, এই ভেবে যে, যিনি বোঝার তিনি এই একটি গল্প থেকেই বুঝে নিতে পারবেন। আর যিনি বোঝার নন তিনি শত গল্পেও বুঝবেন না, যতক্ষন তার রক্তপিপাসা না মেটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করার জন্যও রবীন্দ্রনাথকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। পূর্বাবাংলার বিরুদ্ধে, মুসলমান প্রজাদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটিরও বিরোধিতা করা হচ্ছে এই ‘মুসলিম বিদ্বেষী, পূর্ববাংলা বিদ্বেষী, বিজাতীয় রঠার’ লেখা তাই। (রবীন্দ্রনাথ যদি বিজাতীয় হন, তবে নজরুলকে কোন যুক্তিতে আমরা জাতীয় দাবি করতে পারি সেটিও পাঠক চিন্তা কোরে দেখবেন।) পাঠক খেয়াল করবেন এরা সব সেই একই দল বা উপদলের লোকজন। এদের জ্ঞান এবং সংস্কৃতির মাপ সম্পর্কে নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে আপনার ধারনা হয়েছে। তাই আপাতত ওইসব অপপ্রচারের উত্তর দিচ্ছিনা।
শেখ মিজান
-১১ অক্টোবর ২০২৬