08/07/2025
টুকরো স্মৃতি ও কমরেড জ্যোতি বসু!
কমরেড জ্যোতি বসুর ১১২তম জন্মদিন। তাঁর প্রতি জানাই আমার বিপ্লবী শ্রদ্ধা। সত্যি কথা বলতে কি তাঁর মন্ত্রীসভার একজন সদস্য ছিলাম ১০ বছর, তারপর আরও কয়েক বছর পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য হিসেবে একসঙ্গে কাজ করার মতো দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলাম আমি।
আমার জীবনের এর থেকে গর্বের আর কিছু হতে পারে না। যে মানুষটির নাম শুনে আসছিলাম একেবারে ছোট বেলা থেকে সেই মানুষটির সঙ্গে এক সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ পাব স্বপ্নেও ভাবিনি। এর মাঝে কত যে অভিজ্ঞতা তারই একটু শেয়ার করতে চাইছি তার ১০৭ তম জন্মদিন উপলক্ষে। সত্যি কথা বলতে কী তাঁর সাথে আমি প্রথম কথা বলার বা সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে ছিলাম ১৯৬৮ সালে। সেই সময় জলপাইগুড়িতে এক ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল। তার কিছুদিন আগেই প্রথম যুক্ত ফ্রন্ট সরকারের পতন হয়। আমি তখন ছাত্র। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হল জ্যোতি বাবুকে একটি ভাঙা জিপে করে জলপাইগুড়িতে নিয়ে যাওয়ার। রাস্তায় অল্প স্বল্প কথা। সেটাই ছিল আমার কাছে অনেক গর্বের। জ্যোতি বাবুকে নিয়ে কমরেড সুবোধ সেন সহ অন্যান্য নেতারা বন্যা বিধ্বস্ত জলপাইগুড়ি ঘুরিয়ে দেখান হল। তিনি খালি পায়ে সব দেখলেন। শিলিগুড়িতে ফিরে উনি আমাকে বললেন তুমি গণশক্তির জন্যে সবটা লিখে পাঠাও। ওটাই ছিল আমার গণশক্তিতে প্রথম লেখা।
এরপর ৭০দশকের দিনগুলি। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন মাল থেকে সভা করে ফিরে শিলিগুড়িতে যে বাড়িতে জ্যোতি বাবুর ওঠার কথা জ্যোতি বাবু তার নাম ভুলে গেছিলেন। অগত্যা একজন সাংবাদিকের সঙ্গে যান PWD বাংলোতে। গার্ড জ্যোতি বাবুকে ঢুকতেই দেবে না। এই সাংবাদিক তখন ওকে বললেন জানো কাকে আটকাচ্ছে। দু'দিন পরে উনিই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। জ্যোতি বাবুর সঙ্গে দার্জিলিং যেতে যেতে অনেক গল্প শুনতাম। একবার জ্যোতি বাবু যখন বিরোধী দলের নেতা তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দার্জিলিং বেড়াতে গেছিলেন। তখন রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডু দার্জিলিঙে জ্যোতি বাবুকে সস্ত্রীক রাজভবনে চা খাবার আমন্ত্রন করলেন। জ্যোতি বাবু যখন সেখানে পৌঁছলেন সিকিউরিটি তাঁকে রাজভবনে ঢুকতে দিল না। জ্যোতি বাবু স্ত্রীকে নিয়ে সোজা রতনলাল ব্রাহ্মণের বাড়িতে চলে গেলেন। রাজ্যপাল খবর পেয়ে গাড়ি আর পুলিশ পাঠিয়ে আবার ডেকে এনে ওই সিকিউরিটিকে বললেন, জানো ক'দিন পরে উনিই মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন? এসব কথা জ্যোতি বাবুর কাছ থেকেই শোনা। জ্যোতি বাবুর কাছ থেকে তাঁর শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ এর সঙ্গে দেখা করার ঘটনাও শুনেছিলাম। আবার জলপাইগুড়ির রাজবাড়িতে তাঁর দাদার বিয়ে ও রাজবাড়ীর অনেক ঘটনাও শুনেছিলাম তার কাছ থেকে। অনেক কথাই তাঁর অনেক লেখাতে বেরিয়েছে। কিন্তু অনেক কথা তাঁর না বলা।
জ্যোতি বাবুর যেদিন জন্মদিন ৮ জুলাই, সেদিন সৌরভ গাঙ্গুলিরও জন্মদিন। একবার আমার সঙ্গে সৌরভ গেছিল জ্যোতি বাবুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। জ্যোতি বাবু সৌরভকে বলছিলেন, শুধু একদিনেই আমাদের জন্মদিন নয়, তিনিও সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র। লন্ডনে ছাত্র জীবনে তিনি নিয়মিত ক্রিকেট খেলা দেখতেন। এরপর জ্যোতিবাবু সৌরভকে একের পর এক সেই সময়ের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নাম বলে, বললেন তোমরা মনে কর আমি ক্রিকেট খেলার খবর রাখি না?
জ্যোতিবাবুর সঙ্গে দাজিলিঙে মন্ত্রী হিসেবে গেলে, আমি হিন্দীতে বক্তব্য রাখতাম। কারণ তখন নেপালি ভাষায় এত অভ্যস্থ ছিলাম না। একবার জ্যোতি বাবু আমাকে বললেন আমি বসে আছি তুমি নেপালিতে সাহস নিয়ে বলো। ভাষা না বললে ওরা কখনও তোমাকে নিজেদের লোক মনে করবে না। তারপর থেকে আমি নেপালিতে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করি। সাহস দিয়েছিলেন জ্যোতি বাবু। একবার জ্যোতি বাবুর সঙ্গে দার্জিলিং গেছিলাম লাল কুঠিতে DGHC র একটি সভাতে। আমার আপত্তি ছিল সভাটিতে আমার যাওয়ার। তখন সুবাস ঘিসিং-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ ছিল। জ্যোতি বাবু আমাকে বুঝিয়ে বললেন, কেন DGHC কে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। একে নিছক একটি পৌরসভা বা জেলা পরিষদ মনে করবে না। এর মধ্যে একটি জাতিগত আবেগ আছে, একে মর্যাদা দিতে হবে। DGHC না থাকলে আলাদা রাজ্যের দাবি মাথা ছাড়া দেবে।
এরপর তিনি গাড়িতে বসেই জাতি ও ভাষা সমস্যা ও আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে সহজ করে আমাকে বোঝালেন। আমরা ছোট ছোট নেতারা পুঁজিবাদ, সর্বহারা, বুর্জোয়া, শ্রেণী, প্রতিক্রিয়াশীল এ সব শব্দ উল্লেখ না করে বক্তৃতাই দেয় না। জ্যোতি বাবু বড়োলোক বা গরিব ছাড়া কিছু বলতেন না। সহজ করে বক্তৃতা দেওয়াটা ছিল তার শিল্প।
আরও অনেক অকথিত কথাও বলতে চাইছি, সব জ্যোতি বাবুর কাছ থেকে শোনা। একদিন জ্যোতি বাবু আমাকে ফোন করে বললেন, তোমাকে একটা ভাল খবর দেয়। প্রকাশ কারাতকে রাজি করিয়েছি আমি ছেড়ে দেব, বুদ্ধকে মুখ্যমন্ত্রী করব। আমি জানি না পদ ছেড়ে দেওয়াকে দুনিয়ার কোনও রাজ নৈতিক নেতা অকপটে ভাল খবর বলার মতো নৈতিক সাহস কেউ দেখিয়েছেন কী না ! দু'দিন হল একটি বড় অসুখ থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে আছি। সময় কাটছিল না। জ্যোতি বাবুর জন্মদিনকে নিয়ে কিছু অকথিত কথা সাহস নিয়ে পোষ্ট করলাম।
শেষ একটা ব্যক্তিগত কথার উল্লেখ করছি। একদিন শিলিগুড়িতে জ্যোতি বাবু আমাকে বললেন এত বার শিলিগুড়িতে আসি আমাকে কখনও তো তোমাদের বাড়িতে যেতে বলো না। আমি বললাম ভয়েই বলি না। একদিন বলেছিলাম রাতে আমাদের বাড়িতে খেতে, তিনি এসেছিলেন। আমার গর্ব আমি জ্যোতি বাবুর সঙ্গে কাজ করেছি, তার স্নেহ ও ভালবাসা পেয়েছি। আজকের দিনে আমি তাঁর প্রতি জানাই শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।
আর একটি কথাও বলতে চাইছি। আমি ১৯৮৮ সালে শিলিগুড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান হই। একদিন জ্যোতি বাবু আমাকে বললেন শিলিগুড়ির সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে ভবিষ্যতের শিলিগুড়ি নিয়ে আশু ও মধ্যে মেয়াদি একটি প্ল্যান তৈরি করার উদ্যোগ নিতে। জ্যোতি বাবুর উপস্থিতিতে সেই সভা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় শিলিগুড়ির সার্বিক উন্নয়ন যাত্রা। পরে একেই রূপ দেওয়া হয় Perspective Development Plan এ।
ছবিঃ
১. আমাদের বাড়িতে জ্যোতি বসু
২. আমার বাড়িতে জ্যোতি বসু
৩. DYFI কনফারেন্সে।
(অশোক ভট্টাচাৰ্য)