12/10/2025
ওদের দুবেলা পুষ্টিকর খাবার দূরে থাক, ভরপেট খাবারই হয়তো অমিল। দশ ফুট বাই দশ ফুটের দমচাপা একটা আস্তানায় বেড়ে ওঠা। বাবা মায়ের মনোযোগ পাওয়া কঠিন। শ্রমজীবী মানুষ, উদয়াস্ত খেটে উদরান্নের সংস্থান, সন্তানকে সময় দেওয়ার মত 'বিলাসিতা' করার উপায় নেই।
তাহলে? এই শিশুদের মনে কে জাগাবে স্বপ্ন, একটু ভালো থাকার? চারিদিকের এই নোংরা আবিল পরিবেশে একটু আলো, একটু বাতাস কে যোগাবে এই অবরুদ্ধ শৈশব, কৈশোরকে? নিজেকে একটু মেলে ধরার? সমাজে এত বৈষম্য, এত হৃদয়হীনতার কঠিন মাটি ফুঁড়ে সেই প্রাণের অঙ্কুরের চোখ মেলে চাওয়া, টিকে থাকা যে বড্ড কঠিন!
সেই কঠিন চ্যালেঞ্জটাই নিয়েছিল 'প্রচেষ্টা'- আজ থেকে তেরো বছর আগে। পায়ে পায়ে সেই কঠিন রাস্তাটা পেরিয়ে এসে আজ উদযাপিত হল ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। আমরা উপহার পেলাম, একেবারে খুদে থেকে অশীতিপর গুণী শিল্পীদের আন্তরিক পরিবেশনায় এক মনোরম সন্ধ্যা, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুকাল।
উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিদের 'প্রচেষ্টা'র কিশোর কিশোরীরা পুষ্পস্তবক দিয়ে স্বাগত জানানোর পর শুর হয় অনুষ্ঠান। উদ্বোধন নৃত্যের পর শ্রী অনিন্দ্য রুদ্র ভারী চমৎকার এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে তুলে ধরলেন বাচ্চাদের 'বন্ধু' হয়ে ওঠার সহজতম উপায়টা- তাদের গল্প বলার, তাদের গল্প শোনার। তাদের মনের কিনার ধরে হাঁটার। তিনি একটি আনন্দ সংবাদ দিলেন- প্রচেষ্টার শিশুরা একটি লাইব্রেরি পেতে চলেছে। সবাইকে নতুন পুরোনো বই দান করে সেটিকে সমৃদ্ধ করার আহ্বানও জানালেন।
এবার সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার থিমটি ছিল *নারীশক্তি* । তথ্যসমৃদ্ধ এক মূল্যবান এবং মনোগ্রাহী ভাষ্যকে নারীর শক্তি, নারীর ক্ষমতা, নারী নির্যাতন, পণ, গার্হস্থ্য হিংসা , অ্যাসিড আক্রমণ ইত্যাদি পর্বে বিভক্ত করে তুলে ধরেন প্রচেষ্টা'র অন্যতম রূপকার, প্রাণভোমরা রেখা ব্যানার্জি। একেকটি পর্বের সঙ্গে ছিল শিশু, বালক বালিকা কিশোর কিশোরীদের অনবদ্য নৃত্য- সেই নৃত্য ছন্দে কখনও ছিল ক্রোধের দৃপ্ততা, কখনও ছিল যন্ত্রণার মূর্চ্ছনা, আবার কখনও ভালোবাসা আর মাধুর্যের অনুপম দীপ্তি। যাঁরা এদের অকল্পনীয় ধৈর্য আর ভালোবাসার সঙ্গে তালিম দিয়েছেন, তাঁদের কুর্নিশ! আর বাচ্চারা যে কতটা আনন্দিত, সে তাদের পারফরম্যান্স দেখলেই বোঝা যায়!
এবার আসি *বিকেলে ভোরের ফুল* এর শ্রদ্ধেয়া শিল্পীদের কথায়। সন্ধ্যা মুখার্জির একটি বিখ্যাত গান গেয়ে মঞ্চকে মুগ্ধতায় স্তব্ধ করে রাখলেন যিনি, বয়েস তাঁর মাত্র ৮৭! এরপর যিনি মঞ্চে উপস্থাপিত করলেন স্বরচিত অনবদ্য এক পরিবেশনা, তাঁর বয়সও বড্ড কম-৮৫ ! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর যখন কৌরব রমণীরা হাহাকার করতে করতে তাঁদের একান্ত প্রিয়জনদের খুঁজে চলেছেন, সেই আবহে মাতা গান্ধারীর একক সংলাপের এক অনির্বচনীয় উপস্থাপনা। চিরকাল যিনি সত্য ন্যায় ও ধর্মের অনুশীলন করে এসেছেন, তিনি সমস্ত অবরুদ্ধ আবেগ, ক্ষোভ, দুঃখ ক্রোধ ঢেলে দিয়েছেন এই সংলাপে। শত পুত্রহারা জননী এবার চিরাচরিত ধর্মের নিরপেক্ষতা থেকে মুহূর্তের জন্য সরে এসে প্রথম এবং শেষবারের মত অভিসম্পাত করেছেন শ্রীকৃষ্ণকে। কেন তিনি 'অন্যায় কৌশলে' বিকর্ণকেও হত্যা করালেন, যিনি দ্রৌপদীর লাঞ্ছনায় একমাত্র প্রতিবাদী ছিলেন! কৃষ্ণকে তিনি বললেন, যদুবংশ ধ্বংস হোক! চিরতরে যুদ্ধ শেষ হয়ে ধর্ম সংস্থাপিত হোক! তাঁর স্বরচিত এই সংলাপে আমরা অন্য গান্ধারীকে পাই। কী বৈদগ্ধ্য, কী সাবলীলতা, কী কণ্ঠসম্পদ, কী একাগ্রতায় তিনি কোন মঞ্চ আবহ ছাড়াই ফুটিয়ে তুললেন সন্তানহারা জননীর বেদনা ক্রোধ! বহু বহুদিন মনে রাখার মত এই একক অনুষ্ঠান আবার দেখার, শোনার ইচ্ছা জাগে।
- ভাস্বতী দাশগুপ্তা
Rekha Banerjee Kanan Das Roy Paramita Das Maitreyee Banerjee Tapas Basu Iti Sarkar