23/08/2026
অন্নপূর্ণা যোজনা ও অর্থ বরাদ্দের প্রশ্ন: স্বচ্ছতা কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ সুবিধাভোগীর কাছে ইতিমধ্যেই আর্থিক সহায়তা পৌঁছে গেছে এবং এই তালিকায় প্রতিনিয়ত নতুন নাম যুক্ত হয়ে চলেছে। সরকারের এই সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত পদক্ষেপটি একদিকে যেমন বহু মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, অন্যদিকে তেমনই এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে রাজ্য বাজেট এবং তার বাস্তব বরাদ্দ নিয়ে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য লাগাতার আর্থিক সহায়তা প্রদান কি বর্তমান বাজেটের বরাদ্দে সম্ভব?
হিসাবের খাতা খুললে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবার বা সুবিধাভোগী যদি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পান, তবে ১.৩4 কোটি মানুষের জন্য প্রতি মাসে সরকারের প্রায় ৪,০২০ কোটি টাকার প্রয়োজন। অর্থাৎ, বছর শেষে এই খরচের অঙ্ক দাঁড়িয়ে যায় প্রায় ৪৮,২৪০ কোটি টাকায়।অথচ বাজেটে ধরা হয়েছে মাত্র ৩৬,০০০ কোটি টাকা। এর সাথে যদি নতুন সুবিধাভোগীদের নাম যুক্ত হতে থাকে, তবে বার্ষিক খরচের এই সূচক আরও উর্ধ্বমুখী হওয়াটা স্বাভাবিক। তার মানে হচ্ছে বাজেটে টাকা নেই তবুও মহিলাদের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে 'আপনারা সব যোগ্যরা পাবেন'। এটা ঝুঁটা আওয়াজ হচ্ছে না তো।
সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে ঠিক এখানেই। রাজ্য বাজেটে এই নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার অঙ্ক যদি এই আনুমানিক ব্যয়ের চেয়ে অনেকটাই কম হয়, তবে হিসেব মেলার কোনো উপায় থাকে না। আর এই ফারাকই সাধারণ নাগরিক ও অর্থনীতিবিদদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উচিত বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও স্বচ্ছ এক হিসাব রাজ্যবাসীর সামনে তুলে ধরা।
জনগণের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক প্রশ্ন উঠছে:
প্রকল্পের জন্য আসলে মোট কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে?
এ যাবৎ ঠিক কত টাকা আনুষ্ঠানিকভাবে খরচ করা হয়েছে?
বর্তমানে প্রকৃত পক্ষে কতজন সুবিধাভোগী নিয়মানুগভাবে এই টাকা পাচ্ছেন?
অতিরিক্ত বরাদ্দ বা বাড়তি খরচের এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে অর্থ কোন বাজেট খাত থেকে আনা হবে?
মূল বাজেট যদি অপ্রতুল হয়, তবে কি কোনো সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত বাজেট আনা হবে, নাকি অন্য কোনো প্রকল্পের ফান্ড থেকে টাকা ঘুরিয়ে আনা হবে?
অফিসিয়াল খাতা-কলমের হিসাব না দেখে সরাসরি সরকারকে দোষারোপ করা বা ‘প্রতারণা’র তকমা দেওয়া কোনো যুক্তিসঙ্গত কাজ নয়। তবে ১.৩৪ কোটি সুবিধাভোগী, মাসিক ৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি এবং বাজেটের মূল বরাদ্দের মধ্যে যে আপাত অসামঞ্জস্য ফুটে উঠছে, তার জন্য সরকারের তরফ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া সাধারণ মানুষের প্রাপ্য।
কারণ, পরিশেষে মনে রাখা দরকার—এই অর্থ সরকারের নিজস্ব নয়, এটি সাধারণ করদাতার কষ্টার্জিত রাজস্ব। তাই এই অর্থ কীভাবে ও কোথা থেকে খরচ হচ্ছে, তা জানার অধিকার নাগরিকের রয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কোনো রাজনীতির বিষয় নয়; এটি স্রেফ গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার মূল শর্ত।