19/08/2026
𝟭𝟵𝟰𝟲 𝗔𝘂𝗴𝘂𝘀𝘁 : বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজ্যপালের ‘১৯৪৬ চর্চা’ নিয়ে বিতর্ক
২০২৬-এর অগস্টে, ১৯৪৬-এর অগস্টের অভিঘাত।
আট দশক আগে দেশভাগপূর্ব গোষ্ঠী সংঘর্ষের বিভীষিকা স্মরণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী সভাকক্ষে ‘অগস্ট, ১৯৪৬-এর গণহত্যার স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক বক্তৃতা দিলেন রাজ্যপাল তথা আচার্য রবীন্দ্রনারায়ণ রবি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে শিক্ষক, ছাত্রসমাজে আমন্ত্রণপত্রটি ইতিহাসের একটি অন্ধকার পর্ব নিয়ে সচেতনতার উদ্যোগ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রশ্ন উঠছে, এ রাজ্যে বিজেপির আমলে সাংবিধানিক পদাধিকারী থেকে নেতা-মন্ত্রী, সকলেই কি ক্রমে ইতিহাসের ‘শিক্ষক’ হয়ে উঠছেন?
লোকভবন ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে সমাজমাধ্যমে প্রচারিত আচার্যের বক্তৃতা এ দিন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৪৬-এর ঘটনাবলি নিয়ে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন সরকার এবং শিক্ষাবিদদের বিরুদ্ধে নীরবতার অভিযোগ এনেছেন আচার্য। তিনি বলেছেন, ‘‘১৯৪৬-এর ঘটনা, দু’টো গোষ্ঠীর সংঘাত নয়। সুরাবর্দী ও তাঁর ধাঁচের লোকজন এটা করেছিল। ১৬-১৯ অগস্ট, চার দিনে দশ হাজার হিন্দু নিহত হন। হিন্দুদের উপরে মুসলিম লীগ সরকারের এই হিংসা পরে দেশভাগ করে। এটা ভারতীয় সভ্যতার উপরে নিষ্ঠুর হামলা।”
গোষ্ঠী সংঘর্ষে নিহতের হিসেব-নিকেশের রাজনীতি ইতিহাস চর্চায় সুবিচার করে না বলে একাধিক ইতিহাসবিদই এর পরে বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। তাঁদের মতে, ইতিহাসবিদদের মধ্যে ১৯৪৬-এ কলকাতার ঘটনাবলি অচর্চিত— এটা বলাও সম্পূর্ণ ভুল। কলকাতা, যাদবপুরের প্রাক্তন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস, বাংলাদেশের তাজিম মুর্শেদ প্রমুখ বিষয়টি নিয়ে গভীরে চর্চা করেছেন। কলকাতার সেই গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রাণহানি নিয়ে ইতিহাসবিদ বরুণ দে-র তত্ত্বাবধানে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন টোকিয়োর নারিয়াকি নাগাজাতো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধ্যাপক বলেন, “কোনও ইতিহাসবিদের বয়ানেই ১৯৪৬-এর হিংসার ছবিটি একতরফা নয়। জাপানি ইতিহাসবিদ নাগাজাতোকে তো আবার কখনওই পক্ষপাতদুষ্ট বলা যাবে না।” ইতিহাসবিদ সুগত বসু কৃষিপ্রধান বাংলার ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি চর্চা নিয়ে তাঁর গ্রন্থে সরাসরি নোয়াখালির হিংসা নিয়ে কাজ করেন। কলকাতার ’৪৬-এর ঘটনাও তখন তাঁর লেখায় প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “গোষ্ঠী সংঘর্ষের মতো মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের ধর্মপরিচয় খোঁজায় আমি বিশ্বাসী নই। হিন্দু বা মুসলিম না খুঁজে নজরুল বলেছিলেন, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার। মান্টোও একই কথা বলেন, ১৯৪৭-এ দেশভাগকালীন হিংসার সময়ে। এটুকু বলব, ১৯৪৬-এর সংঘর্ষ কখনওই একতরফা ছিল না। যেখানে যারা দুর্বল, তারা শিকার হয়েছিল। প্রথমে হয়তো হিন্দুরা মারা যান! চার দিনের হত্যালীলা শেষে বেশি মারা গিয়েছিলেন মুসলিমেরাই!”
সুরাবর্দি সরকারের দিকে আচার্য আঙুল তুললেও সুগত বলেন, “সুরাবর্দি তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নিশ্চয়ই বড় দায় থাকে। কিন্তু তিনি বা তাঁর লোকজন সরাসরি কলকাঠি নেড়েছেন, এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ মেলেনি। তা হলে গান্ধীজি কখনওই পরে নানা সময়ে সুরাবর্দির সঙ্গে থাকতেন না।”
রবির এই সভার আগেই এক বিবৃতিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ এবং সভাপতি সনাতন চট্টোপাধ্যায় এই ঘৃণাচর্চার নিন্দা করে বলেন, ‘‘আচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন খুশি আসুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ মতাদর্শগত মগজধোলাইয়ে ব্যবহার ঠিক নয়।’’ এসএফআই-এর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিও প্রতিবাদ জানিয়ে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দেয়। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূরও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একপেশে ইতিহাস চর্চা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ দিবসেও কলকাতা, যাদবপুর-সহ বিভিন্ন কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপি নেতাদের ইতিহাস নিয়ে বক্তৃতা দিতে দেখা গিয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবাশিস দাসের অবশ্য দাবি, “অনুষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছিল না।” ১৯৪৬-এর ইতিহাসচর্চা কেন ইতিহাসবিদদের দিয়ে করানো গেল না, এর সদুত্তর মেলেনি।