14/12/2025
দিল্লি, ডিসেম্বর ২০১২।
শহর এমন ঠান্ডা আগে কম দেখেছে—কিন্তু সেই শীতের রাতে যা ঘটেছিল, তা তাপমাত্রার নয়, বিবেকের কম্পন বাড়িয়েছিল।
রাত ১১টার পর, দক্ষিণ দিল্লির একটি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল বিশৃঙ্খলা। সাইরেন, চিৎকার, মিডিয়ার কল—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য আতঙ্ক শহরটাকে পুরো গ্রাস করেছিল।
সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই ডাকা হল একজন অফিসারকে।
আইপিএস ছায়া শর্মা।
একটা ফোন কল, আর তাঁর নিদ্রাহীন রাত শুরু।
দুইটি শরীর—নগ্ন, রক্তাক্ত, অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিহ্নে ভরা।
ঘটনার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়াচ্ছেন, গাড়ির জানালার বাইরে দিল্লির আলো ঝাপসা হয়ে যেতেই তাঁর ভেতরটা কঠোর হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু এ কেবল এক রাতের গল্প নয়।
এ গল্পের শুরু তারও বহু আগে।
একজন "ছোটোখাটো", "নরম", "বেশি যুবতী" পুলিশ অফিসারকে দেখে অনেকেই ভেবেছিল—
"এ কি পারবে?"
তিনি শুনেছেন।
মুখে হাসিখুশি রেখেছেন।
তারপর একের পর এক তদন্তে দেখিয়েছেন—
দেহের আকার নয়, সাহসের পরিমাণই পুলিশিংয়ের আসল মাপ।
একসময় দিল্লির ভাঙা মহল্লা, জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশের ডাস্টবিন, রাতের হাসপাতাল—এসব তাঁর নিত্য সঙ্গী।
গুম হয়ে যাওয়া বাচ্চা, পাচার হওয়া কিশোরী, মারধর খাওয়া নারী—তিনি শুনেছেন সব গল্পই।
প্রতিটা রিপোর্টের পেছনে তিনি দেখেছেন "মানুষ", "সংখ্যা" নয়।
কিন্তু ডিসেম্বর ২০১২-এর সেই রাত বদলে দিল সবকিছু।
নির্ভয়া কেস।
দেশ কেঁদে উঠেছিল।
রাস্তা নামল হাজার হাজার মানুষ।
কিন্তু তদন্তের রুমে বসে ছিলেন একজন নারী—
যার গলায় কোনো কাঁপুনি নেই,
চোখে কোনো ভয় নেই,
আর নিজের কাছে শুধু একটাই কথা—
"এই কেস ফেলে রাখলে চলবে না।"
৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিনি চিহ্নিত করলেন বাস, ড্রাইভার, টিম।
শহরের সিসিটিভিগুলো কাঁপা আলো দেখাচ্ছিল মাত্র—তার ভেতর থেকে তিনি চিনলেন সাদা বাসটার চলার পথ।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটেজ দেখে তিনি ধরলেন কোথায় থেমেছে বাস, কে উঠেছে, কে নেমেছে।
পুলিশ টিমরা ছুটল রাজস্থান, ইউপি, বিহার—
আর ছায়া শর্মা নিজে দাঁড়ালেন কন্ট্রোলের কেন্দ্রে।
মিডিয়া তেড়ে আসছে, রাজনীতি ঘুরছে, দেশ উত্তাল—
কিন্তু তাঁর ডায়েরির পাতায় লিখে তৈরি হল একেকটা নাম।
আর তিন দিন পর সে নামগুলো গ্রেফতার হয়ে গেল।
দেশ যেন নিঃশ্বাস নিতে পারল একটু।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ Delhi Crime সিরিজে আমাদের যা দেখানো হয়েছে, বাস্তব জীবন ছিল তার থেকেও বেশি ভারী।
তার আগেই তিনি ছিলেন ‘বেবি ফলক’ কেসের তদন্তে—
দুই বছরের শিশুর দেহে এমন নিষ্ঠুরতা, তিনি নিজেও কেঁপে গিয়েছিলেন ভিতর থেকে।
কিন্তু কাঁদেননি।
কারণ তাঁর চোখে জল মানে অপরাধীর সুযোগ।
তিনি ট্র্যাফিকিং চক্র ভেঙেছেন।
তিনি দিল্লি জুড়ে এমন নেটওয়ার্ক ধরেছেন যারা শিশুদের বিক্রি করে দিত।
তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে বাচ্চার কপালে হাত রেখে বেরিয়েছেন—আর বাইরে এসে নিজের টিমকে বলেছেন—
"এই শিশুর অপমানের জবাব চাই।"
যাদের চোখে পুলিশ মানে লাঠি আর সাইরেন,
তারা ছায়া শর্মাকে দেখে শিখল—
পুলিশ মানে মানবিকতা এবং দৃঢ়তা দুটোই।
তারপর তিনি গেলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে, আবার ফিরলেন ইকোনমিক অফেন্সেস উইং (EOW)।
ব্যাংক জালিয়াতি, কোটি টাকার প্রতারণা, মাফিয়াদের রুট—সব জায়গায় তাঁর সই মানে ছিল একটাই—
"চাপ কমাও না, কাজ কমাও না।"
তিনি পেলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
কিন্তু আসল পুরস্কার?
নির্ভয়ার মা যখন তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
“ম্যাডাম, ওদের ছাড়বেন না।”
সেই এক বাক্যই তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।
আজ Delhi Crime তাঁকে পৃথিবীর সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু যারা আসল কেসগুলো দেখেছে, তাদের কাছে তিনি কেবল একটাই—
দিল্লির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা আলো।
Source:
১. BW PoliceWorld (ডিসেম্বর ২৩, ২০২১) - "IPS officer Chhaya Sharma who cracked Nirbhaya case in 72 hours".
২. The Better India (ডিসেম্বর ০১, ২০২৫) - "The Real Story Behind Delhi Crime 3: How an IPS Officer Led India Through Its Toughest Cases".