26/05/2026
গতকাল ছিল সাম্য, দ্রোহ আর প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। বাঙালির আবেগ, অনুভূতি আর চেতনার এক অনন্য বাতিঘর তিনি। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য তাঁর কলম যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধারালো তরবারি হয়ে গর্জে উঠেছে, ঠিক তেমনি বিরহ আর ভালোবাসার সুরে আমাদের ব্যাকুল হৃদয়কে করেছে আর্দ্র। এক হাতে বাঁশের বাঁশরী আর অন্য হাতে রণতূর্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর মতো এমন কালজয়ী ধূমকেতুর আগমন আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি।
নজরুল মানেই এক চিরকালীন তারুণ্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতিবাদ। শোষিত, বঞ্চিত আর অবহেলিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি বারেবারে ব্রিটিশ রাজরোষে পড়েছেন, কারাবরণ করেছেন, রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়েছেন। কিন্তু কোনো শিকল, কোনো কারাগার তাঁর মেরুদণ্ড আর আপসহীন চেতনাকে দমাতে পারেনি। বরং কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই তিনি গেয়ে উঠেছেন শিকল পরার গান। তাঁর সৃষ্টি শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত লড়াই।
একই সাথে নজরুল ছিলেন এক অনন্য সমন্বয়ের কারিগর। তাঁর সৃষ্টিশীলতার জগৎ ছিল সীমাহীন। একদিকে তিনি যেমন বাংলা ভাষায় চমৎকার সব ইসলামি গজল, হামদ ও নাত রচনা করে মুসলিম মানসে এক নতুন জাগরণ এনেছেন, ঠিক অন্যদিকে সমান দক্ষতায় বুনেছেন কালজয়ী শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভজন। ধর্মের এই সুতীক্ষ্ণ বিভেদকে তুচ্ছ করে তিনি নিজেকে প্রকৃত অর্থেই এক অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের চেয়ে বড় আর কিছু ছিল না, তাই তো তিনি উচ্চকণ্ঠে গাইতে পেরেছিলেন—"গাহি সাম্যের গান / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।"
আজকের এই জটিল ও অস্থির সময়ে নজরুলের সাম্যবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাদের বড্ড বেশি প্রয়োজন। ক্ষমতার লোভ আর সামাজিক বৈষম্যের ভিড়ে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, কীভাবে সব ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে হয়। গতকালের সেই বিশেষ দিনটিকে মনে রেখে কবির প্রতি জানাই আমাদের অন্তহীন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শত বছর পরেও তাঁর ভাঙনের গান আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে সাহস জোগায়, আর তাঁর প্রেমের গান আমাদের ভালোবাসতে শেখায়। তাঁর চেতনা বেঁচে থাকুক আমাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ে, আমাদের মননে ও যাপনে। শ্রদ্ধাঞ্জলি, হে চিরবিদ্রোহী কবি!