25/12/2023
আমি মানিক রায়...
বয়স প্রায় উনত্রিশের কাছাকাছি। কলকাতায় রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবাদর্শে চালিত একটি প্রতিষ্ঠানের আবাসিক কেন্দ্রে থেকে পড়াশোনা। ইতিহাসে গ্রাজুয়েট। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে আমি। সুন্দরবন-লাগোয়া ঝাড়খালীতে হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর ধারে একটি কুঁড়ে ঘরে বড় হয়েছি। ছাত্রজীবনে একাধিকবার পড়াশোনা বন্ধ করে জীবিকায় মনোনিবেশ করতে হয়েছে। মীন ধরা, মাছ ধরা, গাছের ফল খুঁটে বিক্রি করা, মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া, কাঠ কেটে বিক্রি করা ইত্যাদি করেছি অনেক কিছুই। অবশ্য এর মধ্যে নতুনত্ব কিছুই নেই। ঠিক এভাবেই বেড়ে উঠছে আজকের ঝড়খালীতে অনেক গরীব, শিক্ষা সম্পর্কে অ-সচেতন অভিভাবকের ছেলে-মেয়ে। বাঘের আক্রমণে প্রচুর মানুষের আহত বা নিহত দেহ চোখের সামনেই পড়ে থাকতে দেখেছি। কিছু মানুষের উপর বাঘের আক্রমণের খবর পেয়েছি, কিন্ত তাদের দেহও চোখে দেখার সুযোগ হয়নি, তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি। এমনকি, আমার পরিবারের তিন সদস্যের উপরেও বাঘের আক্রমণের এমন ঘটনা ঘটেছে। তিন জনের মধ্যে দুই জনের দেহ চোখের দেখা দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্ত আর এক জনের দেহ তো দেখতেই পাইনি। এমন ঘটনা আমাদের এখানে অসংখ্য পরিবারের সদস্যদের সাথেও ঘটেছে এবং প্রতিনিয়ত ঘটছে, যেগুলি আমার একদমই অজানা নয়। ১৫ ও ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৩-এও একই ঘটনা ঘটেছে, একজনের নিথর দেহ বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসা গেছে, আর একজনের দেহ চোখে দেখার সুযোগও কারো হয়নি।
ছোটবেলা থেকেই একটা চিন্তা মনের মধ্যে প্রায়ই উঁকি মারত, গ্রামের মানুষের জন্য সীমিত সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি কি করা যেতে পারে। কারণ, মধু সংগ্রহ, কাঠ কাটা, মীন ধরা যাদের জীবিকা, এই অঞ্চলে তাদের অনেকেই সাপ, বাঘ বা কুমিরের কবলে অকালে মারা যান। অনেকে হয়তো কলকাতা বা অন্য কোথাও চলে যান জীবিকার খোঁজে। এই ধরনের পরিবারের ছেলেমেয়েরা হয়ে পড়ে দিশাহারা, অভিভাবকহীন। সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ে মোবাইল-বাহিত অপসংস্কৃতি, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয়। আমার মনে হয়েছে, এখনকার এই প্রজন্মকে দিশা দেখানোর জন্য চাই নতুন উদ্যম, তাদের চাই মূল্যবোধের শিক্ষা।
সে-জন্যই আমি এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া অভিভাবকদের সাথে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই এক চিলতে একটি চালাঘরে ছোট্ট একটি কোচিং সেন্টার শুরু করেছি, যেখানে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত নিয়ম মেনে চলে মনঃসংযোগ তথা ধ্যান বা মেডিটেশন, শরীরচর্চা এবং বিভিন্ন বিষয়ের পঠন-পাঠন।
এই ছোট্ট ঘরেই মাঝে মাঝে পাঠচক্র, তর্কসভা, কুইজ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয় সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। সৃজনশীলতার বিকাশের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হয় নিয়মিতভাবে। ছাত্ররা যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু আর্থিক অনুদান দেয়, অনেকেই দিতে পারে না।
আকস্মিক অনুপস্থিতির জন্য ‘ফাইন’ দিতে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের, সেই ফাইনের টাকায় ওদেরই জন্মদিন পালন করা হয়। আর ওদের গিফট হিসাবে খাতা-কলম দেওয়া হয়। যদি কিছু টাকার কম পড়ে তাহলে নিজেই যতটা পারি দিই।
এখানে বছরের সেরা ছাত্রর বা ছাত্রীর স্কলারশিপ দেওয়ার কথা ভেবেছি, তাদের দুই মাসের মাইনে মাফ করতে চেয়েছি, আর তাদের পরের বছরের সব বই, খাতা-কলম দিতে চেয়েছি। তাছাড়া এখানের ছাত্র-ছাত্রীরা বিদ্যালয়ে প্রথম হলেই বা ইউনিট টেস্ট বা একদম শেষ পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে সম্পূর্ণ নম্বর পেলেই পুরস্কার হিসাবে খাতা কলম দিতে চেয়েছি। এই বছরের ন্যায় প্রতি বছর তাদের পূজা দেখার জন্য জামা-কাপড় দিতে না পারলেও কিছু স্বল্প অর্থ তাদের হাতে দিতে চাই। এই বছরে আমি আমার নিজের সাধ্যমত একশত টাকা করে দিয়েছিলাম। তাদের খেলাধুলার কিছু সাজ-সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের নানা খেলা শেখানো হয়। যেমন- ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, লাফদড়ি, দৌড়, সাঁতার ইত্যাদি। আমিই যতটা পারি শেখাই। আর কম্পিউটার ও ক্যারাটেও অনতিবিলম্বে যুক্ত করার চিন্তা-ভাবনা করেছি। সকাল-সন্ধ্যা দুই বার প্রার্থনা হয়, সবাই বাবা-মা সহ বাড়ির সকল গুরুজনের প্রণাম করে যথাসময়ে প্রার্থনার আগে পড়তে চলে আসে। এসে তুলসী তলায় প্রণাম করে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শ্রীশ্রী ঠাকুর-মা-স্বামীজীকে প্রণাম করে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করে। যথাসময়ে প্রার্থনা শুরু হয়। সবাই একসাথে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে এক সুরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়, তারপর স্বদেশমন্ত্র পাঠ, তারপর মায়ের দুটো গান হয়, তারপর আবার পাঠ করা হয় এবং পাঠের আলোচনা হয়, তারপর আবার গান হয় একটা, এরপর হয় মেডিটেশন এবং অবশেষে জয় দিয়ে চল্লিশ মিনিটের প্রার্থনা শেষে সবাই পড়তে শুরু করে। মাসে একটা করে শিক্ষামূলক সিনেমা দেখানো হয়, আর একটা করে আলোচনা রাখা হয় ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং-এর জন্য। পরিকাঠামোরও উন্নতি করা হচ্ছে সাধ্যমত।
১১ই জানুয়ারি ২০২৩ সালে শুরু করেছিলাম খুব ছোট্ট করে। আস্তে আস্তে ছাত্র-ছাত্রী বাড়ছে। যখন দেখছি, তারা পড়াশোনা, খেলাধুলা, আর সবকিছুকেই ভালোবেসে বড় হয়ে উঠছে, তখন খুব ভাবতে ইচ্ছে করছে, তাদের হাত দিয়ে নতুন ভাবে গড়ে উঠুক ভবিষ্যত। নিজের প্রকৃতি, পরিবেশ আর মানুষকে ভালোবাসতে শিখুক সবাই।
আমরা আমাদের এই ছোট্ট প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছি ‘সুন্দরবন বিবেক উদয়’। প্রতিষ্ঠানটি এখনো রেজিস্ট্রেশন হয়নি, এখনই কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার জড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছে বা সামর্থ্য কোনোটাই নেই আমাদের।
আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চেনেন, আমাকে ভালোবাসেন, আমার এই কাজটির প্রতি আপনার সহমর্মিতা থাকে—সুবিধা-বঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া এই ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য কিছু আর্থিক অনুদান দিতে পারেন। কথা দিচ্ছি, অনুদানের প্রতিটি পাই-পয়সা এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থেই ব্যয় হবে।
আপনার প্রতি বিশেষ অনুরোধ, একবেলার সফরে এখানে এসে দেখে যান ঠিক কীভাবে সুন্দরবনের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আমরা কাজ করছি। আপনার উপদেশ ও পরামর্শ আমাদের পথ চলার পাথেয় হয়ে উঠুক।
বিনীত
মানিক রায়
ঠিকানা-
গ্রাম--ঝড়খালী ৪নং
মাস্টার পাড়া,
পোস্ট-ঝড়খালী বাজার,
থানা-বাসন্তী,
জেলা- দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা,
পিন-743312
মোবাইল নম্বর-6296733150
ইমেইল- [email protected]