24/01/2026
আজ শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের প্রধান ১৬ জন ত্যাগী বা সন্ন্যাসী শিষ্যের তৃতীয় পর্বে পূজনীয় স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজ কে নিয়ে।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ‘মানসপুত্র’ এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পূর্বাশ্রমে রাখালচন্দ্র ঘোষ নামে পরিচিত এই মহান সাধককে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর উচ্চ আধ্যাত্মিক শক্তি ও রাজকীয় গাম্ভীর্যের জন্য ‘রাজা মহারাজ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। একাধারে তিনি ছিলেন মহাযোগী এবং দক্ষ প্রশাসক, যিনি রামকৃষ্ণ সংঘকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর জীবন ও বাণী আজও অসংখ্য মানুষের কাছে আধ্যাত্মিক চেতনার আলোকবর্তিকা।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (Introduction)
পূর্বাশ্রমের নাম: রাখালচন্দ্র ঘোষ।
জন্ম: ২১ জানুয়ারি, ১৮৬৩।
জন্মস্থান: শিকরা-কুলীনগ্রাম (বসিরহাট, চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ)।
পিতা: আনন্দমোহন ঘোষ (জমিদার)।
গুরু: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
বিশেষ উপাধি: শ্রীরামকৃষ্ণের 'মানসপুত্র' বা আধ্যাত্মিক সন্তান।
প্রাথমিক জীবন (Early Life)
রাখালচন্দ্র ঘোষ এক ধনী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ধীরস্থির এবং ভক্তিপ্রবণ। বাল্যকাল থেকেই ঈশ্বরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পড়াশোনার জন্য তিনি কলকাতায় আসেন এবং সেখানেই নরেন্দ্রনাথ দত্তের (পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দ) সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। এই বন্ধুত্বই তাঁকে পরবর্তীতে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে নিয়ে আসে।
শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্য ও দীক্ষা (Meeting Sri Ramakrishna)
রাখালচন্দ্র যখন দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আসেন, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে দেখেই চিনতে পারেন এবং বলেন যে রাখাল তাঁর 'ব্রজধামের গোপাল'।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে নিজের পুত্রের মতো স্নেহ করতেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য বিশেষ যত্ন নিতেন।
ঠাকুরের নির্দেশে তিনি কঠোর সাধনভজন করতেন।
ঠাকুর বলতেন, "রাখালের স্বভাবটি ঠিক যেন বাচ্ছার মতো—সদা ইষ্টতে মগ্ন।"
সন্ন্যাস ও কর্মজীবন (Monastic Life & Leadership)
১৮৮৬ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণের পর, বরাহনগর মঠে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম হয় 'স্বামী ব্রহ্মানন্দ'।
প্রথম অধ্যক্ষ: স্বামী বিবেকানন্দ যখন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনি স্বামী ব্রহ্মানন্দকে এই সংঘের প্রথম প্রেসিডেন্ট বা অধ্যক্ষ নির্বাচিত করেন। স্বামীজি তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং বলতেন, "আমি হলাম চালিকাশক্তি, কিন্তু রাজা (ব্রহ্মানন্দ) হলো সংঘের ধারক ও পালক।"
সংগঠক: তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় রামকৃষ্ণ মিশন একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ও সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। পুরী, ভুবনেশ্বর এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে মঠ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
উপদেশ ও শিক্ষা (Teachings)
স্বামী ব্রহ্মানন্দের উপদেশগুলো অত্যন্ত সহজ-সরল কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর প্রধান শিক্ষার বিষয় ছিল 'ধ্যান' এবং 'মনঃসংযম'।
তিনি বলতেন, "কাজের ফাঁকে ফাঁকে মনকে ঈশ্বরের দিকে ফেরাতে হবে। তা না হলে কাজের ভিড়ে ঈশ্বরকে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"
তিনি জপ ও ধ্যানের ওপর খুব জোর দিতেন। তাঁর মতে, আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি হলো নিয়মিত অভ্যাস।
তাঁর উপদেশাবলী "ধর্মপ্রসঙ্গে স্বামী ব্রহ্মানন্দ" নামক বইটিতে সংকলিত হয়েছে, যা সাধক ও ভক্তদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
গ্রন্থাবলী (Works)
স্বামী ব্রহ্মানন্দ নিজে খুব বেশি বই লেখেননি, তবে তাঁর বলা কথা এবং উপদেশগুলি ভক্তরা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।
ধর্মপ্রসঙ্গে স্বামী ব্রহ্মানন্দ (Dharma Prasange Swami Brahmananda): এটি তাঁর উপদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সংকলন। এতে সাধন-ভজন, মনঃসংযম এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি লাভের উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
এছাড়াও তাঁর লেখা কিছু চিঠিপত্র ও কথোপকথন বিভিন্ন সময়ে 'উদ্বোধন' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিরোধান (Passing Away)
স্বামী ব্রহ্মানন্দ ১৯২২ সালের ১০ এপ্রিল মহাস সমাধি লাভ করেন। তাঁর জীবন ও বাণী আজও অসংখ্য মানুষকে আধ্যাত্মিক পথের সন্ধান দিয়ে চলেছে।