04/09/2026
যা দিয়ে সংসারটা চলত, একদিন তারই মেয়াদ ফুরিয়ে গেল। নতুন পথ খুলে দিল প্রাকৃতিক পণ্য।
আমার নাম শিরিন সুলতানা। থাকি নাটোরের হালসা এলাকায়। আমাদের একটা পারিবারিক ফার্মেসি ছিল, স্বামীই চালাতেন। সেটার আয়েই সংসার চলতো। কিন্তু একদিন সব ওলটপালট হয়ে গেল, স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বারবার হাসপাতাল, চিকিৎসার চাপ, সব মিলিয়ে মানুষটা আর কাজ চালিয়ে যেতে পারলেন না।
ফার্মেসি বন্ধ, বিক্রি নেই। চোখের সামনে জমে থাকা প্রায় চল্লিশ লাখ টাকার ওষুধের মেয়াদ একে একে ফুরিয়ে গেল। কী অসহায় লাগত তখন, ভাষায় বলে বোঝাতে পারব না। ভয়াবহ এক আর্থিক সংকটে পড়লাম আমরা। সংসার চালানোর আর কোনো পথ দেখছিলাম না। ঠিক তখনই মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, যা হওয়ার হবে, এবার আমাকেই সামনে দাঁড়াতে হবে।
স্বামীর সেবা, সংসার, তার ওপর ফার্মেসির কাজ, সব একসঙ্গে হাতে তুলে নিলাম। কয়েকজন কর্মচারী আর ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে দায়িত্ব বুঝে নিতে থাকি। সত্যি বলতে, রাতের পর রাত ভয় আর অনিশ্চয়তা আমাকে ভেঙে দিত। তবু ভোর হলে আবার উঠে দাঁড়াতাম, কারণ ভেঙে পড়ার সুযোগটুকুও তখন আমার ছিল না।
এই সময়েই ব্র্যাকের একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের কথা জানতে পারি, যুক্ত হই সেখানে। শিখলাম কীভাবে ব্যবসা গুছিয়ে চালাতে হয়, নিয়ম মেনে চলতে হয়, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আগে ছিল শুধু চেষ্টা আর ইচ্ছা, এবার কাজগুলো আরও গোছানো হয়ে উঠল।
অনেকদিন ধরেই প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি আমার একটা টান ছিল। সেই টান থেকেই শুরু করি প্রাকৃতিক খাবারের ব্যবসা। প্রথমে বনের মৌচাকের মধু দিয়ে শুরু। পরে যোগ হলো সজনে পাতার গুঁড়া, বিটরুট পাউডার, ড্রাই ফ্রুটস, চিয়া সিড, সরিষা, আরও কত কী। প্রতিটা পণ্যের মান ঠিক রাখতে সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াজাত, সবই নিজে তদারকি করি। আমার সজনে পাতার গুঁড়া বিএসটিআই অনুমোদন পেয়েছে, মধু একাধিকবার উত্তীর্ণ হয়েছে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায়।
ফার্মেসিতেও এল অনেক পরিবর্তন। কর্মচারীদের সঙ্গে চুক্তিপত্র, অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফার্স্ট এইডের সুবিধা। প্রশিক্ষণে শেখা কাজে লাগিয়ে দশ লাখ টাকার একটা ঋণও নিই, যা ব্যবসাটাকে থিতু হতে সাহায্য করেছে।
কষ্ট এখনো আছে, হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি যাবেও না। তবু আজ আমার আয় বেড়েছে, সংসারের ভিতটা শক্ত, আর সবচেয়ে বড় পাওয়া, নিজের ওপর হারিয়ে ফেলা বিশ্বাসটা আবার ফিরে পেয়েছি। স্বপ্ন দেখি, আমার এই প্রাকৃতিক পণ্যগুলো একদিন স্থানীয় বাজার পেরিয়ে সুপারশপের শেলফেও জায়গা করে নেবে, ফার্মেসিটাও টিকে থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, জীবনের যুদ্ধ যতই কঠিন হোক, সঠিক দক্ষতা আর একটুখানি সহযোগিতা পেলে একজন নারী নিজের ভেতর থেকেই আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।
শিরিন সুলতানা
উদ্যোক্তা, হালসা, নাটোর