31/07/2025
জাগো সিলেটঃ একটি স্বপ্ন, একটি আন্দোলন
প্রিয় সিলেটবাসী, আমাদের এই মাটি আর মানুষ বাংলাদেশের বাকি অংশ থেকে কিছুটা আলাদা। আমাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভাষা এবং নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বরাবরই আমরা এক বিশেষ পরিচিতি বহন করে আসছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গৌরবময় ইতিহাস, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধি আর বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিশাল সংখ্যক প্রবাসীর আয়ে সিলেট বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রার ২৫%-এরও বেশি যোগান দেই আমরা সিলেটি প্রবাসীরা, শতকরা ৯০ ভাগ চা উৎপাদন করি, মৎস্যসহ খাদ্য উৎপাদনেও ভূমিকা রাখি, আর গ্যাস, পাথর, বালুর মতো প্রাকৃতিক সম্পদের প্রধান যোগানদাতা আমরা।
কিন্তু আমাদের এই অসামান্য অবদান সত্ত্বেও, আমরা সিলেটিরা দীর্ঘকাল ধরে নানাভাবে বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার হয়ে আসছি। উন্নয়ন, সুযোগ আর সম্মান, যা আমাদের প্রাপ্য, তা থেকে আমরা সবসময়ই বঞ্চিত হয়েছি। এই অসাম্য আর অসম্মানের বিরুদ্ধে সিলেটের ইতিহাসে কিছু মানুষ রয়েছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে সিলেটিদের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তাদেরই প্রথম সারিতে আছেন জনাব বাবরুল হোসেন বাবুল- একজন নিঃস্বার্থ যোদ্ধা, যিনি শুধু সংগ্রামই করেননি, জন্ম দিয়েছেন এক অদম্য চেতনার।
স্কুলজীবন থেকেই তিনি সিলেটবাসীর অধিকার নিয়ে সচেতন এবং সোচ্চার ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ। তিনি সিলেট এম.সি কলেজে এম.এ এবং একইসাথে সিলেট ল কলেজে এল.এল.বি’র ছাত্রাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম দিককার সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের একজন হিসেবে তিনি বারোপুঞ্জি সাব-সেক্টরের কমান্ডার অব ফ্রিডম ফাইটার্স হিসেবে ৮০০ মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি নিজে আহত হন এবং হারান তাঁর আপন দুই ভাই। স্বাধীনতার পর তিনি সিলেটের প্রথম পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পরপর দুইবার। তিনি তখন ছিলেন পুরো বাংলাদেশের কনিষ্ঠতম জনপ্রতিনিধি। পরবর্তীতে তিনি সিলেটের প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবেও স্বতন্ত্রভাবে বিজয়ী হন। এই সিলেটি সন্তানই “জাগো সিলেট” মতবাদের প্রবক্তা।
“জাগো সিলেট” কোনো সংগঠনের নাম নয়- এটি একটি চেতনাপ্রবাহ, একটি আন্দোলন, একটি গণজাগরণের ডাক। এটি সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য, অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষার এক অবিচল প্রতিশ্রুতি। যেখানে সিলেটের মানুষ নিজের অধিকার নিজের কণ্ঠে তুলে ধরবে; যেখানে উন্নয়নের ন্যায্য অংশ পাবে সিলেট; যেখানে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে থাকবে বৃহত্তর সিলেটের দৃঢ় অংশগ্রহণ এবং যেখানে এই অঞ্চলের সম্পদ ও সম্ভাবনার যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
“জাগো সিলেট” কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদের কথা বলে না বরং অত্যন্ত সমৃদ্ধ কিন্তু অবহেলিত, বঞ্চিত সিলেটি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা বলে- যাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ইতিহাস। এই অঞ্চল শুরু থেকেই প্রবাসী আয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, পর্যটন, কৃষি ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সিলেট বিভিন্নভাবে বারবার অবহেলিত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। এসমস্ত অন্যায় ও বৈষম্যর প্রতিবাদের প্রয়োজনে জন্ম নিয়েছে “জাগো সিলেট”।
আমরা চাই- ন্যায্যতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সম্মান ও অংশীদারিত্ব।
জাগো সিলেট সবসময় মনে করে, এই বঞ্চনার একমাত্র সমাধান হলো- সিলেটকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তর করা। দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর ধরে "জাগো সিলেট" এই দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। এই প্রাদেশিক কাঠামোর মাধ্যমেই আমাদের সাংবিধানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, উন্নয়ন হবে সমতাভিত্তিক, এবং সিলেটিদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি প্রতিজন সিলেটির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম।
“জাগো সিলেট” কেবল দাবি নয়, এটি বাস্তব পরিবর্তনের ইতিহাস। দীর্ঘ পথচলায় এই আন্দোলন বহু সাফল্য এনে দিয়েছে- প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব, শিক্ষা-উন্নয়ন, অবকাঠামো রক্ষা, এবং জাতীয় স্বার্থে সিলেটিদের কণ্ঠস্বর কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
জাগো সিলেটের অদম্য সংগ্রাম ও উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ:
জাগো সিলেটের সুদীর্ঘ পথচলায় অনেক কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সিলেট বিভাগ আন্দোলনঃ সিলেটিদের অনেকদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জনসভায় সিলেটকে বিভাগ করার দাবিতে জাগো সিলেটের ১০ হাজার কর্মী শুয়ে পড়ে বাঁধা সৃষ্টি করার ঘোষণা দিলে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেগম খালেদা জিয়া আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে সিলেটকে বিভাগ হিসেবে উপহার দেন।
২. রাষ্ট্রপতি এরশাদকে অবরোধ ও সিলেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণাঃ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ সিলেট মাদ্রাসা মাঠে জনসভার আগমন পথে আম্বরখানা পয়েন্টে তিন ঘন্টা জাগো সিলেট সমর্থক দ্বারা অবরুদ্ধ হলে তখন জাগো সিলেটের পক্ষের দাবি মেনে নেন। ২০ হাজার জনতার উপস্থিতিতে মাদ্রাসা মাঠে প্রেসিডেন্ট এরশাদ জনতার মধ্যে বসা জনাব বাবুলকে বক্তব্য রাখতে ডাকেন। জনাব বাবুল তার ভাষণে সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ দিনের দাবির কথা জানান এবং প্রেসিডেন্ট তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
৩. আখালিয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় হয়রানির প্রতিবাদঃ তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) আখালিয়া এলাকায় স্থানীয় মানুষদের শারীরিকভাবে হয়রানি এবং জুলুম করতো। এর প্রতিবাদস্বরুপ "জাগো সিলেট" এর সমর্থকরা সেখানকার পুরো বিডিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারকে ঘেরাও করেন এবং পানি ও বিদ্যুৎ সাপ্লাই বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে মানুষদের হয়রানি না করার শর্তে তারা দুঃখ প্রকাশ করে সমঝোতায় আসে। সেসময় এই খবর বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী গণমাধ্যম যেমন, বিবিসি, ভয়েস অব অ্যামেরিকাতে প্রকাশিত হয়েছিলো।
৪. সুরমা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণঃ ব্রিটিশ আমলে সুরমা নদীর উপর নির্মিত হয়েছিল "কিন ব্রিজ"। সেটি ছিল সিলেট শহরের প্রথম স্থায়ী সেতু। বহু বছর পর এই সেতুর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়, ফলে এর কাঠামো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছায় এবং চলাচলের জন্য এটি হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে "জাগো সিলেট" সেতুটি জরুরি ভিত্তিতে নতুন ব্রিজ নির্মাণের দাবিতে উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং গণসচেতনতা তৈরি করে। আন্দোলনের ফলস্বরূপ, তৎকালীন সড়ক ও জনপথ ও সেতু মন্ত্রণালয় সুরমা নদীর উপর দুটি ব্রিজ নির্মাণ করে।
৫. যুবকদের কর্মসংস্থানঃ "জাগো সিলেট” বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে, অসংখ্য সিলেটি যুবকদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী হয়।
৬. বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদকে পৌরসভায় রূপান্তরঃ ছাতক, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার পূর্বে এসব ইউনিয়ন পরিষদ ছিলো। "জাগো সিলেট" স্থানীয় মানুষদের নিয়ে জনমতের মাধ্যমে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করলে এগুলোকে পৌরসভায় রুপান্তরিত করা হয়।
৭. ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধের আদেশ প্রত্যাহারঃ যখন ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধের আদেশ আসে তখন "জাগো সিলেট" স্থানীয় জনগণ ও শ্রমিকদের নিয়ে সেই আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করে। পরবর্তীতে যেদিন বন্ধ হওয়ার কথা সেই দিনই সেই আদেশ সরকার চাপের মুখে প্রত্যাহার করে।
৮. কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সৈন্য স্থানান্তরঃ সিলেট শহরে আর্মির একটা গ্রুপ স্থানীয় ছাত্র-জনতার উপর অত্যাচার চালিয়েছিলো। স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর সামরিক বাহিনীর অযৌক্তিক আচরণের বিরুদ্ধে "জাগো সিলেট" আন্দোলন করে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও এর ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে সেই সকল সেনাসদস্যদেরকে শাস্তিস্বরুপ সিলেট থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে হাঁটিয়ে পাঠানো হয়।
৯. ঘরে ঘরে গ্যাস লাইনের ব্যবস্থাঃ আমাদের সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক গ্যাসে ভরপুর! অথচ খনি থেকে উত্তোলন করা সেই গ্যাস সরাসরি ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো, আর আমাদের নিজ সিলেট শহরেই গ্যাসের লাইন ছিল না। এই চরম বঞ্চনার বিরুদ্ধে "জাগো সিলেট"- এর তীব্র ও প্রবল প্রচেষ্টার ফলেই আজ ঘরে ঘরে গ্যাসের চুলা জ্বলছে।
১০. সিলেট ক্যাডেট কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারঃ তৎকালীন সিলেট রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজকে যখন কুমিল্লায় স্থানান্তরের সরকারি আদেশ আসে, তখন 'জাগো সিলেট' এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র গণবিক্ষোভ করে। ফলশ্রুতিতে সরকার তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সিলেট মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজকে পূর্বের জায়গায় বহাল রাখে এবং সেটি বর্তমানে সিলেট ক্যাডেট কলেজ রূপে চলমান রয়েছে।
১১. সিলেট শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠাঃ একসময় সিলেটের নিজস্ব শিক্ষা বোর্ড ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে সেই বোর্ড স্থানান্তর করে কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়। "জাগো সিলেট” এবং সেসময়কার সিলেটের সুশীল সমাজ একসাথে মিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর কাছে সিলেটে শিক্ষা বোর্ড নিয়ে আসার জোর দাবি জানায়। দীর্ঘ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে সিলেটে আবার শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা হয়।
১২. মাগুরছড়া গ্যাসকূপ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিপূরণ আদায়ঃ ১৯৯৭ সালে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টালের খামখেয়ালির কারণে মাগুরছড়া গ্যাসকূপে বিস্ফোরণ ঘটে। বিশাল বিস্ফোরণের কারণে প্রায় ১৭ দিন ধরে আগুন জ্বলেছিল। বিস্ফোরণে সেখানকার বনাঞ্চল, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ লাইন, রেলপথ, চা-বাগান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে স্থানীয়দের জন্য "জাগো সিলেট" আন্দোলনের ফলে অনেকটুকু ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হয়।
১৩. সিলেট রেলষ্টেশন আধুনিকীকরণঃ সিলেট রেলষ্টেশন যখন জরাশীর্ণ ছিলো তখন এর আধুনিকায়নের জন্য "জাগো সিলেট" আন্দোলন করে। যার ফলে ষ্টেশনটিকে আধুনিকায়ন করা হয়।
১৪. টিভি রিলে স্টেশন চালুঃ যখন সারাদেশে শুধুমাত্র বিটিভি চ্যানেল চালু ছিলো সেসময় সিলেটে টিভিতে বিটিভি দেখা খুব কষ্ট হতো কারণ ভালোমত সিগন্যাল পেতো না। জাগো সিলেটের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটে টিভি রিলে স্টেশন চালু করা হয়, যার ফলে মানুষের টিভি দেখার সমস্যার সমাধান হয়।
১৫. সিলেট টেক্সটাইল মিল পুনরুদ্ধারঃ অর্থনৈতিক সঙ্কটের অজুহাতে সরকারি মালাকানাধীন সিলেট টেক্সটাইল মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত জাগো সিলেটের আন্দোলনের মাধ্যমে প্রত্যাহার করা হয়।
জাগো সিলেটের এই অর্জনগুলো প্রমাণ করে, আমাদের সম্মিলিত সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না। তবে, এই সাফল্যগুলো ছিল অনেকটা সমস্যার উপরিভাগের সমাধান। আমরা বারবার দেখেছি, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার বৈষম্যের কারণে মূল সমস্যাগুলো থেকেই যায়। সিলেটের উন্নয়ন ও অধিকারের এই দীর্ঘ লড়াই আমাদের বারবার শিখিয়েছে যে, কেবল একটি স্থায়ী এবং মৌলিক প্রশাসনিক সংস্কারই পারে আমাদের সকল বঞ্চনার অবসান ঘটাতে। আর সেই সংস্কারই হলো প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা।
কেন প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। এই এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জনসেবায় বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছেঃ
• ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও উন্নত শাসনঃ ঢাকা থেকেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রত্যন্ত এলাকার সমস্যাগুলো সময়মতো সমাধান হয় না, দেরি হয়। যদি প্রাদেশিক ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে প্রতিটি এলাকা নিজের দরকার অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এতে উন্নয়নের কাজও দ্রুত হবে।
• সম্পদের সুষম বণ্টন ও কার্যকর ব্যবহারঃ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চার ভাগের এক ভাগ আসে সিলেট থেকে। চা, গ্যাস, পাথর, বালু, ধান ও মৎস্যসহ অন্যান্য খাদ্য উৎপাদন এবং পর্যটনে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল। কিন্তু কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও ন্যায্য বণ্টন হয় না। প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব বাজেট ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব সম্পদকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারবে।
• আঞ্চলিক পরিচয় ও বৈচিত্র্যের স্বীকৃতিঃ বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি, ভাষা এবং ঐতিহ্য রয়েছে। এককেন্দ্রিক শাসনে এই বৈচিত্র্যগুলোকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া কঠিন। প্রাদেশিক কাঠামো আঞ্চলিক পরিচয় ও বৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাহায্য করবে, যা বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে আরও দৃঢ় করবে।
• গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবেঃ ক্ষমতা কেন্দ্রে কুক্ষিগত থাকলে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা কমে যায়। প্রাদেশিক স্তরে নির্বাচন ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ হলে জনগণ স্থানীয় সমস্যার ভিত্তিতে নেতা নির্বাচনের সুযোগ পাবে, যা জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে।
• রাজধানীর ওপর চাপ হ্রাসঃ বর্তমানে প্রায় সব প্রশাসনিক কার্যক্রম ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। এর ফলে ঢাকায় জনচাপ, যানজট, আবাসন সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দূষণ দিন দিন বাড়ছে। প্রাদেশিক সরকার হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিষেবা স্থানীয় পর্যায়ে চলে যাবে, এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে।
• আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা ও সুফলঃ বিশ্বের বহু দেশ (যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) তাদের বিশালতা বা বৈচিত্র্যের কারণে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ছোট দেশ যেমন নেপাল ও শ্রীলঙ্কাও বিকেন্দ্রীভূত শাসন বেছে নিয়েছে। এই ব্যবস্থা দক্ষ শাসন, সম্পদের সুষম ব্যবহার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও আঞ্চলিক পরিচয় সংরক্ষণে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
• কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিবন্ধকতাঃ বাংলাদেশ সচিবালয়ের মতো কেন্দ্রীয় অফিসগুলো থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার কারণে উন্নয়নের কাজে দেরি হয়। অনেক সময় এসব অফিস স্থানীয় সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারে না। আবার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এমপিরা নিজের এলাকায় বেশি উন্নয়নের সুযোগ নেন, ফলে অন্য এলাকার মানুষ পিছিয়ে পড়ে। যদি প্রাদেশিক ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে এসব জটিলতা কমবে এবং সব এলাকায় উন্নয়ন সঠিকভাবে করা যাবে।
সিলেট কেন আমাদের প্রদেশ হওয়া উচিত?
সিলেটের প্রাদেশিক দাবি কেবল একটি আবেগ নয়, এটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর ভিত্তি করে একটি যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী দাবি। এই যৌক্তিক দাবির পিছনে অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছেঃ
• ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য ও প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতাঃ সিলেট ছিল একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক অঞ্চল, যা ব্রিটিশ আমলে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৭৪ সালে সিলেটকে বাংলার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে পূর্ববাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়, যা সিলেটবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। এছাড়াও, ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে সিলেট অঞ্চলের কিছু এলাকা মোগল আমল ও ব্রিটিশ শাসনে করমুক্ত (লখিরাজ) ঘোষণা করা হয়েছিল- ধর্মীয় ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে সিলেট ঐতিহাসিকভাবেই বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের ঐতিহ্য বহন করে এসেছে। কিন্তু একাত্তরের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সিলেট বারবার অবহেলিত ও অসম্মানিত হয়েছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চারটি প্রদেশ করার সুপারিশ করলেও সেখানে সিলেটের নাম না থাকাটা বৈষম্যেরই ধারাবাহিকতা।
• মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান- আমাদের গৌরবঃ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিলেটবাসীর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম দিকের অর্থের বড় অংশই এসেছিল প্রবাসে থাকা সিলেটিদের কাছ থেকে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমাদের ভাই-বোনেরা যুদ্ধের তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। আর আমাদেরই গর্ব, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। ৪নং এবং ৫ নং সেক্টরে সিলেটি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তিকে মজবুত করেছে।
• অসামান্য অর্থনৈতিক অবদানঃ সিলেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ২৫% এরও বেশি যোগানদাতা সিলেট। দেশের প্রায় সম্পূর্ণ চা উৎপাদন হয় সিলেটে। তেল, গ্যাস, পাথর, বালু, ধান ও মৎস্য—এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের প্রধান যোগানদাতা সিলেট। ফেঞ্চুগঞ্জ ইউরিয়া সার কারখানা এবং ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি একসময় বাংলাদেশের শিল্পায়নে একক ভূমিকা রেখেছিল। এত অবদান থাকা সত্ত্বেও সিলেট উন্নয়নের দিক থেকে সবসময়ই পিছিয়ে ছিল এবং এখনও রয়েছে।
• সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যঃ সিলেটিদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা (সিলেটি নাগরী লিপি) এবং ইতিহাস রয়েছে। এই ভাষার স্বীকৃতি এবং স্বতন্ত্র সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য একটি প্রদেশ অপরিহার্য। এটি কেবল সিলেটিদের জন্য নয়, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
• প্রশাসনিক প্রস্তুতিঃ সিলেট বিভাগে বর্তমানে ৪টি জেলা এবং ৩৮টিরও বেশি উপজেলা রয়েছে। নিজস্ব বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, হাসপাতাল এবং রেললাইনসহ প্রায় সব কাঠামোগত সুবিধা বিদ্যমান। তাই একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে কার্যকর হওয়ার জন্য সিলেটকে নতুন করে কিছু গড়ার প্রয়োজন নেই।
প্রিয় সিলেটবাসী,
"জাগো সিলেট" শুধুমাত্র একটি আন্দোলনের নাম নয়, এটি আপনাদেরই স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি- আপনাদের এই সম্মিলিত স্বপ্ন, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের এক অনন্য দলিল। এই সুদীর্ঘ পথচলায় আপনারা যারা আমাদের পাশে ছিলেন, প্রতিবাদ করেছেন, আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন- "জাগো সিলেট" আপনাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।
আমরা বিশ্বাস করি, সিলেটকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তর করার মাধ্যমেই আমাদের আত্মমর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। এটি শুধু জাগো সিলেটের স্বপ্নই নয়, এটি প্রতিজন সিলেটির ন্যায্য অধিকার। আপনারা দেখেছেন, সিলেটিরা কখনোই তাদের ন্যায্য হিস্যা আন্দোলন ছাড়া পায় নি। আর বর্তমানে "জাগো সিলেট" সেই লক্ষ্যে এখনো আন্দোলন করে যাচ্ছে ও ভবিষ্যতেও করবে আপনাদেরকে সাথে নিয়ে। সিলেটের মানুষ দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে জানে। "জাগো সিলেট" কোনো আঞ্চলিক বিভেদ চায় না, বরং চায় ন্যায্যতা, অংশীদারিত্ব এবং সিলেটের সামগ্রিক উন্নয়ন।
আমরা মনে করি, সিলেটকে প্রদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কেবল সিলেটের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হবে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আপনাদের সহযোগিতা অপরিহার্য। আসুন, আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি এবং আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের এই সংগ্রামে একসঙ্গে এগিয়ে যাই। যতদিন আমাদের লক্ষ্য অর্জিত না হয়, ততদিন আমাদের এই আন্দোলন ও সংগ্রাম চলবেই!
জাগো সিলেট!