31/12/2025
৩১শে ডিসেম্বর: একটি অপসংস্কৃতির পর্যালোচনা
প্রতি বছর ৩১শে ডিসেম্বর এলেই আমাদের সমাজে এক ধরনের ব্যস্ততা ও উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়। অনেকের কাছে এটি আনন্দের রাত, অনেকের কাছে বছরের শেষ মুহূর্ত। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে এবং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত--এই রাতকে ঘিরে চলমান বাস্তবতা নিয়ে একটু ভাবা।
ইসলাম আমাদের আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"আল্লাহ তাদের অভিভাবক যারা ঈমান আনে, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে যান। আর যারা কুফরী করে তাগূত তাদের অভিভাবক, এরা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়(১)। তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।”
(সূরা বাকারা: ২৫৭)
এই আলো ও অন্ধকারের পার্থক্য বোঝাই একজন মুমিনের পরিচয়।
সুরা মায়িদা-৫১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন-
"হে মুমিনগণ! ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা নিজেরাই একে অন্যের বন্ধু! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে হিদায়াত দান করেন না।"
সংস্কৃতি নাকি অনুকরণ
থার্টি ফার্স্ট নাইট মূলত একটি বিজাতীয় সাংস্কৃতিক উদযাপন। এটি আমাদের ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের অংশ নয়, ইসলামি ইতিহাস বা ইবাদতের সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই।
ইসলাম অন্য ধর্মের মানুষের সাথে ন্যায়, সদাচরণ ও সহাবস্থান শিক্ষা দেয়। কিন্তু একইসাথে ধর্মীয় উৎসব ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন—
আবু উমামা আল বাহেলী (রায়িাল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল সল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেছেনঃ
"যে ব্যক্তি কোন জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে, আর যে যেই জাতিকে ভালবাসবে তাদের সাথে তার হাশর হবে।”
(আবু দাউদঃ ৪০৩১, মুসনাদ আহমদঃ ৫০৯৩)
এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সবকিছু গ্রহণ করার আগে একজন মুসলিমকে ভাবতে হয়--- এটা আমার ঈমান ও পরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
আতশবাজি ও পটকা: কষ্ট ও অপচয়
আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না, আমাদের সামান্য আনন্দ অন্য কারো জন্য কত বড় কষ্টের কারণ হতে পারে।
থার্টি ফার্স্ট নাইটে--
ছোট শিশু আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ও তাদের প্রাণহানি মতো দুর্ঘটনা ঘটে।
বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পায়।
হৃদরোগীদের জন্য উচ্চ শব্দ মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিবেশ ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়।
ইসলামে কাউকে কষ্ট দেওয়া অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো।(সূরা আহযাব:৫৮)
এ আয়াত দ্বারা কোন মুসলিমকে শরীয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্টদানের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “কেবল সে-ই মুসলিম, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে, কেউ কষ্ট পায় না আর কেবল সে-ই মুমিন, যার কাছ থেকে মানুষ তাদের রক্ত ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে নিরুদ্বেগ থাকে। (তিরমিযী: ২৬২৭)
এছাড়া, এই আতশবাজি ও পটকায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, যা মূলত অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।
নিশ্চয় যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রাবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।(সূরা বনি ইসরাইল: ২৭)
মদ:মাতলামি ও দুর্ঘটনা
এই রাতকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মদ্যপান ও মাতলামির ঘটনা বেড়ে যায়। এর ফল হিসেবে--
সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়,
নিরীহ মানুষ আহত বা নিহত হয় এবং
পরিবারগুলো চিরদিনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) মদকে সব অকল্যাণের মূল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
“হে বিশ্বাসীগণ! মদ, জুয়া আর মূর্তী ও ভাগ্য নির্ধারক তীর ঘৃণিত শয়তানী কাজ, তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সাফল্যমন্ডিত হতে পার।”(সূরা মায়িদা: ৯০)
নিজের আনন্দের জন্য অন্যের জীবন বিপন্ন করা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না।
শালীনতা ও নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন
থার্টি ফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক, তা হলো-
নৈতিক শালীনতার সীমা ভেঙে যাওয়া।
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই মর্যাদা, লজ্জা ও শালীনতার শিক্ষা দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) সতর্ক করে বলেছেন-
“কিছু নারী পোশাক পরেও উলঙ্গ—তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”(সহিহ মুসলিম)
এই বাণী আমাদের ভীত করার জন্য নয়, সচেতন করার জন্য।
তাহলে একজন মুমিন হিসেবে আমাদের কী করা যেতে পারে?
অপসংস্কৃতি ও বিধর্মীয় রীতিনীতি চর্চায় ইসলাম আমাদের নিষেধই দেয়নি, বরং বিকল্প পথও দেখিয়েছে।
এই রাত হতে পারে—
নিজের আমলের হিসাব নেওয়ার সময়,
ভুল থেকে ফিরে আসার উপলক্ষ,
ভবিষ্যতের জন্য ভালো কাজের নিয়ত করার মুহূর্ত।
উমাম ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেনঃ "তোমরা নিজেদের হিসাব নাও, হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে। (কিয়ামত দিবসের) মহা উপস্থাপনের জন্য নিজেদের সাজিয়ে নাও। যে ব্যাক্তি দুনিয়াতেই নিজের হিসাব নিবে কিয়ামতের দিন সেই ব্যাক্তির হিসাব হালকা হবে।"
বোনদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান:
উৎসবের নামে যেন কেউ কষ্ট না পায়,
আধুনিকতার নামে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়,
আনন্দের পথে হাঁটতে গিয়ে মানবিকতা যেন হারিয়ে না যায়।
হে বোনেরা আসুন,
একটি রাতকে আতশবাজির আলো নয়, আত্মসমালোচনার আলোয় আলোকিত করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ঈমানের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দিন।
আমিন।