30/09/2026
ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াকফ সম্পত্তি ধ্বংস এবং মুসলিমদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের প্রতিবাদ
ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াকফ সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ধ্বংস এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। আজ ৩০ সেপ্টেম্বর এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উচ্ছেদ ও সড়ক সম্প্রসারণের অজুহাতে শতাব্দীপ্রাচীন মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “সম্প্রতি ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে শত শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের অংশবিশেষ যেভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগজনক। এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয় মুসলিমদের প্রতিবাদকে যেভাবে প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ, দমন-পীড়ন ও গ্রেফতারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা কোনো সুসভ্য রাষ্ট্রে কাম্য নয়। দেশটির উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের মতো একাধিক রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলার যে 'বুলডোজার নীতি' কার্যকর করা হচ্ছে, তা ভারতের নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।”
নেতৃবৃন্দ বলেন, “বর্তমানে ভারতের প্রায় ২১ কোটি মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এক নজিরবিহীন সামাজিক ও আইনি প্রান্তিককরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে মুসলিমদের নাগরিকত্ব, ধর্মীয় অধিকার ও ওয়াকফ সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে একের পর এক বিতর্কিত আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) নিয়ে বিতর্ক এবং সর্বশেষ ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫-এর মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের পরিধি বাড়ানো হয়েছে, যা মুসলিমদের ধর্মীয় ও সম্পত্তিগত অধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ। এসব পদক্ষেপ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সুরক্ষাবলয়কে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।”
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মৌলিক নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও আজ গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। প্রকাশ্য স্থানে ধর্মীয় আচার পালনে বাধা সৃষ্টি, পোশাকের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং গবাদি পশু পরিবহন বা বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক উগ্রপন্থীদের হামলা ও গণপিটুনির মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক। এর পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের কারণে কর্মক্ষেত্র ও আবাসন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও মুসলিমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায্য আইনি প্রতিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান ও ইতিহাস উপেক্ষা করা এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোর নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য ও সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক।”
নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভারত ঐতিহাসিকভাবেই একটি বহুত্ববাদী ও বহুধর্মীয় রাষ্ট্র। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট একক আদর্শের রাজনৈতিক বা সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার এই অপচেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ ও ওআইসি (OIC)-কে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জানমাল, সম্মান ও ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বৈষম্যমূলক ও দমনমূলক নীতি পরিহার করতে ভারত সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।”