09/03/2026
ইসলামী প্রেক্ষাপটে ব্যবসা এবং আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবসার মধ্যে পার্থক্যটা আসলে কোথায়? আধুনিক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোতে আপনি একটি পন্য বা সেবা তৈরি করেন সর্বোচ্চ মুনাফা লাভ করার জন্য।
ইসলাম বিষয়টিকে ঠিক উল্টোভাবে দেখে।
ইসলামে আপনি মুনাফা অর্জন করেন সমাজকে সেবা করার জন্য।
দুর্ভাগ্যজনক যে, মুসলমান হিসেবে আমরা ব্যবসার এই নৈতিক দর্শন হারিয়ে ফেলেছি।
কিন্তু আমরা এটি হারালাম কীভাবে? কেন আমরা একটি বিকৃত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে শুরু করলাম যেখানে সবকিছুই কেবল মুনাফা বাড়ানোর বিষয়ে পরিণত হলো?
গত পাঁচ শতাব্দী ধরে আধুনিক বিশ্ব পুরোপুরি একটি ইউরোপ-কেন্দ্রিক জ্ঞান ও ক্ষমতার ধারণার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো তাদের স্বর্ণশিখরে থাকাকালীন বিশ্বের প্রায় ৮৫% এলাকা দখল করে নিয়েছিল; তারা স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস ও প্রান্তিক করে দিয়েছিল। ইসলামী বিশ্বের যেসকল প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থাগুলো শতাব্দী ধরে সমাজকে পরিচালিত করেছিল, সেগুলো হারিয়ে গিয়েছিল।
ফলে তারা তাদের নিজেদের আদলে একটি নতুন পৃথিবী গড়ে তোলে।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কমে গেলেও, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য ঠিকই থেকে গেছে।
আজও আমরা সেই একই কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই শিক্ষা নিচ্ছি।
আর এই বিশ্বদর্শন মূলত দুটি মৌলিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমটি হলো - পাশ্চাত্য সভ্যতা সবচেয়ে উন্নত এবং এটিই মানব অগ্রগতির চূড়ান্ত শিখর। তাই প্রগতি মানেই হলো পাশ্চাত্যের মতো হওয়া।
দ্বিতীয়টি হলো - পাশ্চাত্যের জ্ঞান এমনকি ঐশ্বরিক ওহীর (Divine Revelation) চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
এই ভিত্তি থেকেই মানুষের স্বভাব এবং সমাজ সম্পর্কে নতুন সব তত্ত্ব তৈরি হতে থাকে।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী পশ্চিমা দার্শনিকদের একজন ছিলেন রনে দেকার্ত (René Descartes), যিনি জ্ঞানের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন।
তার বিখ্যাত উক্তিটি হচ্ছে — "I think, therefore I am."
এই বক্তব্যের মাধ্যমে দেকার্ত নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিটি 'ওহী' থেকে সরিয়ে 'মানুষের যুক্তি'র ওপর নিয়ে আসেন।
তিনি যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এমন এক পশ্চিমা বিশ্বাসের পথ প্রশস্ত করেন যেখানে মনে করা হয় যে জ্ঞান আল্লাহর সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, তিনি একজন ব্যাপ্টাইজড ক্যাথলিক ছিলেন, কিন্তু তিনি মহাবিশ্ব এবং স্রষ্টা সম্পর্কে মানুষের চিন্তা করার ধরণটি আমূল বদলে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে এই পরিবর্তনটি চার্লস ডারউইনের মতো মানুষদের মাধ্যমে আরও ঘনীভূত হয়। তার বিবর্তনবাদ বা 'যোগ্যতমের টিকে থাকা' (survival of the fittest) তত্ত্বটি সমাজের জন্য একটি রূপক হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষ মনে করতে শুরু করল জীবন মানে প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা নয়।
অথচ কুরআনে পারস্পরিক সহযোগিতা বা কো-অপারেশনকে অপরিহার্য বলা হয়েছে।
এক পর্যায়ে ধর্মের নৈতিক শিক্ষাগুলোকেও উল্টে দেওয়া হলো।
বাইবেলে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল যে “সম্পদের মোহ সকল অনিষ্টের মূল”।
ইসলামের অবশ্য এ বিষয়ে আরও সূক্ষ্ম ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যা নিয়ে আমরা ইনশাআল্লাহ পরে আলোচনা করতে পারি।
কিন্তু জর্জ বার্নার্ড শ-এর মতো আধুনিক চিন্তাবিদরা বিষয়টি উল্টে দিয়ে বলেন যে, “সম্পদের অভাবই হলো সকল অনিষ্টের মূল”।
সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই চিন্তাবিদদের কারণেই সম্পদ এবং ব্যবসা সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলাতে শুরু করল।
অর্থনীতি এবং ব্যবসায় এটি শেষ পর্যন্ত মুনাফা এবং আত্মতৃপ্তি সর্বোচ্চ করার দৌড়ে পরিণত হলো, যাকে আমরা এখন 'ইউটিলিটি' বা উপযোগিতা বলি।
বিংশ শতাব্দীতে এসে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান দাবি করলেন যে, “ব্যবসার একমাত্র দায়িত্ব হলো তার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মুনাফা সর্বোচ্চ করা”।
সহজ কথায়, ব্যবসার কাজ স্রেফ টাকা বানানো।
এর পেছনে আরও অনেক যুক্তি আছে, তবে আমরা বর্তমানে যেভাবে কাজ করি তার ভেতরের ধারণাগুলো বোঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
বিগত ১০০ বছরে বিংশ শতাব্দীর ব্যবসা ইসলামের বিশ্বদর্শন থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
ইসলামের নিজস্ব একটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি আছে যেখানে ব্যবসাকে দেখা হয় আল্লাহর পথে চলার এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি মাধ্যম হিসেবে।
রাসূলুল্লাহর (সা.) শিক্ষা হলো—যেসব উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী তাদের আধ্যাত্মিকতা এবং নৈতিকতাকে গুরুত্ব সহকারে নেন, তাদের জন্য সরাসরি জান্নাতে যাবার উপায় রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিখ্যাত সেই হাদিসে বলেছেন: "একজন সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (পরকালে) নবীগণ, সত্যবাদীগণ এবং শহীদদের সাথে থাকবেন।"
কিন্ত ব্যবসা এখন আর সত্য, গুণ, নিরাপত্তা বা কল্যাণের জন্য সম্পদ অর্জনের জায়গা নেই; বরং এটি স্রেফ ব্যক্তিস্বার্থে মুনাফা বাড়ানোর একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে।
গত ৩০-৪০ বছরে যখন কর্পোরেট দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং শোষণের বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়তে শুরু করল - বিশেষ করে বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর আসক্তিকর পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা, কিংবা তেলের খনির নানা কেলেঙ্কারি, তখন কর্পোরেট ইমেজ বা ভাবমূর্তি উদ্ধারের জন্য একটি নতুন শব্দ আবিষ্কৃত হলো। আমরা সবাই সেই শব্দটির সাথে পরিচিত: CSR (Corporate Social Responsibility) বা কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এর বিপরীতে কুরআন মানুষ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে শুরু হয়।
মানুষ, ব্যবসা এবং বৃহত্তর সমাজ নিয়ে কুরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন প্রতিটি আত্মার সহজাত মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেয়।
যেমন সূরাহ ইসরা এর ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেন –
۞ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِىٓ ءَادَمَ وَحَمَلْنَـٰهُمْ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ وَرَزَقْنَـٰهُم مِّنَ ٱلطَّيِّبَـٰتِ وَفَضَّلْنَـٰهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍۢ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًۭا
আর অবশ্যই আমরা আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সাগরে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উত্তম রিযক দান করেছি আর আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।
আমাদের প্রত্যেককে অনন্য প্রতিভা দেওয়া হয়েছে। সুরা আল-ইসরা-তে মানুষের নিজস্ব স্বভাব বা 'শাকলাহ' (unique disposition) সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই প্রতিভাগুলো কল্যাণের কাজে ব্যবহার করার জন্য।
আমাদের কাজ হলো এগুলো খুঁজে বের করা এবং এই উপহারগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীতে আল্লাহর নূর বা আলোর প্রতিফলন ঘটানো।
আর এই প্রতিভা ও উপহারগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজের জায়গা বা ব্যবসার চেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে? কারণ আমাদের জাগ্রত জীবনের অধিকাংশ সময় আমরা কর্মক্ষেত্রেই কাটাই।
আমরা সূরা বাকারাতে পড়ি যে, আল্লাহ আমাদের তাঁর প্রতিনিধি বা 'খলিফা' হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।
সুরাহ বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেন –
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَـٰٓئِكَةِ إِنِّى جَاعِلٌۭ فِى ٱلْأَرْضِ خَلِيفَةًۭ ۖ قَالُوٓا۟ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ ٱلدِّمَآءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّىٓ أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ
আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন ‘নিশ্চয় আমি যমীনে খলীফা সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাওকে সৃষ্টি করবেন যে ফাসাদ ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আর আমরা আপনার হামদসহ তাসবীহ পাঠ করি এবং পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা জানি, যা তোমরা জান না’।
আমাদের সীমিত মানবিক সক্ষমতা দিয়ে আল্লাহর গুণাবলি ও নামগুলোর প্রতিফলন ঘটানোই আমাদের কাজ, যাতে আমরা পৃথিবীতে তাঁকে চিনতে পারি।
সুরাহ আয-যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেন –
وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।
কুরআনের প্রখ্যাত ব্যাখ্যাকারী ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন যে—আল্লাহর ইবাদত করার অর্থ হলো মূলত আল্লাহকে চেনা বা তাঁর 'মারিফাত' লাভ করা।
সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বদর্শনে ব্যবসাকে দেখা হয় আল্লাহর পথে চলার একটি রাস্তা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে।
ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী তাঁর 'কিতাবুল কাসব'-এ বলেছেন যে, আমরা সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
আমাদের সবাইকে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করতে হয়। যেমন, আমাদের মোবাইল ফোনটি তৈরি করতে হলে কাউকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়েছে, কাউকে সেটা জোড়া দিতে হয়েছে, আবার কাউকে সেটা পরিবহন করতে হয়েছে।
সবাইকে একসাথে কাজ করতে হয়। ইমাম আল-গাজ্জালীও তাঁর 'এহয়াউ উলুমিদ্দীন'-এর ১৩তম খণ্ডে পারস্পরিক সহযোগিতার এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ব্যবসার মাধ্যমে একে অপরকে জানার এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সবকিছুর শুরু হয় আমাদের ভেতর থেকে।
আমরা যখন ব্যবসা করি, তখন আমাদের অধিকাংশেরই চিন্তা থাকে বাইরের জগৎ এবং লেনদেন নিয়ে। কিন্তু আসলে এটি শুরু হয় আমাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে।
আমরা কী করছি এবং কেন করছি, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। যান্ত্রিকভাবে কেবল ব্যবসা করা বা টাকা উপার্জনের পেছনে না ছুটে চিন্তা করুন আপনার ব্যবসার উদ্দেশ্য কী? আপনি কী অর্জন করতে চাচ্ছেন? আপনার লক্ষ্য বা 'মিশন' কী?
আমাদের যে সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রয়োজন, তা সিস্টেম বা ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে শুরু হয় না।
এটি শুরু হয় নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে।
প্রথম ধাপ হলো আত্ম-উন্নয়ন বা 'তাজকিয়া'—অর্থাৎ নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং নিজের প্রবৃদ্ধি ঘটানো। আমাদের নিয়তকে বিশুদ্ধ করতে হবে এবং আমাদের উপার্জনকে আমাদের নৈতিকতার সাথে মেলাতে হবে।
আর এটি করার জন্য আমাদের ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। একবারে অনেক বেশি কিছু করার চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই।
শুধু মনে রাখবেন যে, ব্যবসা কেবল পার্থিব লাভের জন্য নয়; এটি আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর একটি পথ।
____
মূল - Omar DaCosta-Shahid (লিঙ্ক প্রথম কমেন্টে)