12/06/2025
স্বপ্নজয়ের গল্প: পর্ব-১
"নদীভাঙা ঘর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়"
মানুষ তার স্বপ্নের সমান , কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে প্রয়োজন অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর লড়াইয়ের মানসিকতা। সমাজের নানা প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু মানুষ নিজের অবস্থান বদলে দেয় শুধুমাত্র আত্মবিশ্বাস আর অধ্যবসায়ের জোরে। ঠিক তেমনই এক সাহসী স্বপ্নবাজের নাম হাফিজুর রহমান।
সুবিধা বঞ্চিত এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও, সে হাল ছাড়েনি। অর্থের অভাব, সুবিধার সীমাবদ্ধতা কিংবা সমাজের অবহেলা—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। নিজের কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ আর প্রবল মানসিক শক্তির মাধ্যমে সে পৌঁছে গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত শিক্ষার্থীর তালিকায়।
এই গল্প শুধু হাফিজুরের নয়, এটি হাজারো অনুপ্রেরণার গল্প, যারা অভাবকে দুর্ভাগ্য নয়, বরং সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করতে জানে। হাফিজুরের এই পথচলা আমাদের শেখায়—স্বপ্ন পূরণের জন্য দরকার সাহস, শ্রম এবং অগাধ বিশ্বাস।
হাফিজুর রহমানের সেই স্বপ্ন পূরণের গল্প পড়ুন তার নিজের লিখনির মাধ্যমে ;
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াল আকিবাতু লিল মুত্তাকিন।আসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিহিল কারীম।
أعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ... "
স্বপ্নের সিঁড়িতে প্রথম ধাপ:
উচ্চমাধ্যমিকে আমি কোনো প্রাইভেট পড়তে পারিনি—তবে ইংরেজি ও ICT বিষয় অনলাইনের ফ্রি ক্লাসেই প্রস্তুতি নিই।
একদিন ইউটিউবে স্বাধীন ভাইয়ার একটি ভিডিও দেখি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন গেঁথে যায় মনে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে লেগে ছিল একরাশ ভয় আর সংশয়। মনে হতো, “ভর্তি পরীক্ষা বুঝি শুধু শহরের ছেলেমেয়েদের জন্য—আমার মতো গ্রামের, গরিব ঘরের ছেলের পক্ষে সেটা সম্ভব না।”
আমি একসময় মাকে বলি—“আমি ভর্তি পরীক্ষায় যাব না। আমি পারবো না।” তখন মা বলেন—
“তুমি পারবে, আর তোমাকে যেতেই হবে।”
মায়ের এই সাহসী উচ্চারণেই ভেতরটা নাড়া দিয়ে যায়। তখনো আমি ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু মা ছিলেন অটল, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত জোর করেই আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় পাঠিয়ে দেন।
মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করি একটি ভালো কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার। সেই সময় মামাতো ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচিত হই দেশের স্বনামধন্য কোচিং প্রতিষ্ঠান “ফোকাস”-এর সঙ্গে, যা মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ও প্রশংসিত। তার মাধ্যমেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে আমি ভর্তি হই “ফোকাস”-এর রংপুর শাখায়। লক্ষ্য ছিল অনেক বড়, তবে পথটা ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। তবুও সেই দিন থেকেই শুরু হয় আমার নতুন প্রস্তুতি ও সম্ভাবনার পথচলা।
আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন দুই অসাধারণ মানুষ—শাহরিয়ার আলম স্বাধীন ভাইয়া ও পরিচালক আহনাফ আবিদ ভাইয়া। তাঁদের কথাগুলো কেবল উপদেশ ছিল না, ছিল আত্মার চেতনা। তাঁরা বলতেন, "স্বপ্ন দেখো বড় করে, প্রস্তুতি নাও যত্ন করে—তোমার পথ তুমি নিজেই রচনা করবে।" এই কথাগুলো এডমিশনের ক্লান্তি দূর করেছিল এবং আজও আমার প্রতিটি চ্যালেঞ্জে সাহস হয়ে দাঁড়ায়।
ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রামের গল্প:
আমি মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারাই। বাবা চেয়েছিলেন আমি মাদ্রাসায় পড়ি, আর মা সেই স্বপ্ন পূরণে ছিলেন অবিচল। আমরা তিন ভাই, এক বোন। বোনের বিয়ে হয় ২০১১ সালে, আর ছোট ভাই একজন প্রতিবন্ধী—যার যত্ন-সেবায় মাকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়।
২০১৭ সালে তিস্তা নদীতে আমাদের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যায়। তখন মনে হয়েছিল—জীবন বুঝি থেমে গেল। কিছুদিন মাদ্রাসায় অনিয়মিত ছিলাম, কিন্তু আবার ঘুরে দাঁড়াই আল্লাহর রহমতে। অষ্টম শ্রেণিতে আমি নিয়মিত ক্লাস করতে শুরু করি এবং একটি স্থানীয় কোচিং সেন্টারে পড়াশোনা চালিয়ে যাই।
আমি জানি, আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি—তার পেছনে আমার মায়ের সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসা ও দোয়া অমূল্য অবদান রেখেছে। মা শুধু স্বপ্ন দেখতে বলেননি, সেই স্বপ্নের পথে হাঁটতেও শিখিয়েছেন। আমার পাশে ছিলেন ফুফাতো ভাই, যিনি ডুয়েটের ছাত্র। তাঁর সাহচর্য ও উৎসাহ ছিল নির্ভরতার স্তম্ভ এবং আমার আইন অনুষদের স্বপ্নদ্রষ্টা।
আবিল ভাই সহ সকল ভাইকে ধন্যবাদ যারা এডমিশন সময়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষভাবে সাইদুল স্যার, মুহসিন স্যার, তানভীর স্যার, অর্ণব স্যারসহ সকল শিক্ষক ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ধন্যবাদ।
فَمَنۡ زُحۡزِحَ عَنِ النَّارِ وَ اُدۡخِلَ الۡجَنَّۃَ فَقَدۡ فَازَ ؕ
অতএব যে জাহান্নাম হতে বিমুক্ত হয় এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট হয় মূলত সেই সফলকাম।
সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন আমি যেন কৃতিত্বের সাথে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পারি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সেবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
অনুজদের প্রতি আমার বার্তা:
তোমার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন সঠিক গাইডলাইন ও আশ্রয়স্থল। এডমিশন সময়ে বিভিন্ন চিন্তা মাথায় আসবে, মনে হবে আমাকে দিয়ে এসব হবে না আমি কি পারব? কঠোর পরিশ্রম ও শেষ পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে। ইংশা আল্লাহ তোমার চান্স হবে।
বিশ্বাস রাখো হৃদয়ে,
দেখা হবে বিজয়ে।
-------------------------
মো. হাফিজুর রহমান
আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
--------------------------------
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: ৫৩৬তম
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: ১৭৬৬তম
গুচ্ছ: ৪৮৪৯ তম
গ্রাম: শিবদের চর (নয়ারহাট)
ইউনিয়ন: ছাওলা
পীরগাছা, রংপুর