11/10/2024
স্মৃতির স্মৃতিচারণ
-ইসতিয়াক আহমেদ
শুরুর শুরুটা সবসময় কঠিনই হয়ে থাকে। প্রদর্শকহীন অনিশ্চিত পথে হেঁটে সফলতা পাওয়া যে কতটা কঠিন, তা যাঁরা ঐ বন্ধুর পথ অতিক্রম করেছেন, শুধুমাত্র তাঁরাই ভাল জানেন।
তেমনি একজন বিরল প্রতিভার অধিকারী বৃটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর প্রথম বাঙালি মুসলিম কমিশন্ড অফিসার স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) এম. আফাজুর রহমান। প্রচার বিমুখ এই চৌকস পুরুষটি তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ কর্মদক্ষতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম সব কিছুর মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়। সামগ্রিকভাবে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশকে জানতে হলে এম আফাজুর রহমান সম্পর্কে জানাটা জরুরী । বাংলাদেশ ডায়রি, বিসিএস গাইড, বাংলাদেশ পরিচিতি সহ বিভিন্ন পুস্তকে তাঁর সমৃদ্ধ জীবন-ইতিহাস স্থান পেয়েছে।
সীমিত জ্ঞানের পরিধি নিয়ে তাঁকে নিয়ে লেখার প্রয়াস দু:সাহস বৈকি। তবু এই ক্ষণজন্মা পুরুষের বিশালায়তন জীবনালেখ্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও কিছু লেখার নৈতিক দায়বোধ থেকেই এই লেখায় ব্রতী হলাম ।
ধার্মিক পিতা মরহুম হাজি আবদুল মজিদের সু্যোগ্য সন্তান এম আফাজুর রহমানের জন্ম ১৯১৪ সালের ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলাধীন ফটিকছড়ি থানার সমৃদ্ধ জনপদ নানপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। সামগ্রিক ভাবে ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন। বঙের সাথে আত্মার কি অপরুপ মিলবন্ধন। বাংলার পরিবর্তনের বার্তা নিয়েই পহেলা নববর্ষে জন্ম এই ক্ষণজন্মার।পারিবারিক ঐতিহ্যগতভাবেই তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন ছিলেন। প্রচন্ড মেধাসম্পন্ন রহমান সাহেব রোসাংগিরি উচ্চ বিদ্যালয় হতে মেট্রিক ও চট্টগ্রাম কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিতিশীলতা তাঁকে উচ্চ শিক্ষা অর্জন থেকে বিমুখ করতে পারেনি।
মরহুম স্কোয়াড্রন লিডার এম, আফাজুর রহমান তাঁর বণার্ঢ্য কর্মজীবনে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে কর্মরত থেকে নানুপুর, ফটিকছড়ি তথা চট্টগ্রাম এলাকার মানুষদের বিপুল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন যেমন সত্য ঠিক তেমনি যোগ্যতার মূল্যায়নে বিন্দুমাত্র আপোষ করেননি। তাঁর প্রেরণা আর সঠিক দিক নির্দেশনায় অনেকেই জীবনের আলোর পথ খুঁজে পেয়েছেন।
তদানীন্তন ওয়াপদার উপপরিচালক , পারসোনাল ম্যানাজার-চট্টগ্রাম স্টীল মিলস, মহাব্যবস্থাপক-পাইলন গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ সহ বিভিন্ন সরকারি উচ্চ পদে কর্মরত থাকাকালীন যোগ্য লোক নির্বাচন করে একদিকে যেমন শত শত লোকের রুটি-রুজির সংস্থান করেছেন ,অপরদিকে প্রশাসনিক দক্ষতায় প্রতিষ্ঠান সমূহকে নিয়ে গেছেন সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে। সততা, কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব তাঁকে প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। পরিবারের সদস্যরাও আজকে তাঁর নির্মোহ সততার গর্বিত উত্তরাধিকার।
তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখতে গিয়েও উপন্যাসসম হয়ে যাবে। ১৯৪০ সালে তিনি ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সে জয়েন করেন। ১৯৪৫ সালে পদোন্নিত পেয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
১৯৬১ সালে Squadron Leader হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পূর্বে Adjutant Recruiting Officer, Staff Officer (Personnel); Officer Commanding Administrative Wing etc. at Group H.Q, Air H.Q, and General H.Q, Air Force Recruiting Officer হিসেবে যখন প্রয়োজন পড়েছে প্রশাসনের অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।
কর্মজীবনে ভারত,পাকিস্তান ইংল্যান্ড, ফ্রান্স , সৌদি আরব, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেও নীরবে মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করে গেছেন। একদিকে পাকিস্তানীদের প্রশাসনিক নজরদারি, অন্য দিকে নিখাদ দেশপ্রেম। এই দুয়ের বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয়ের মাধ্যমে কৌশলে দেশের সেবা করেছেন। তাঁর এই অসীম সাহসীকতা ও চাতুর্যপূর্ণ দ্বৈত ভুমিকা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রশংসিত হয়, যার স্বীকৃতি স্বরূপ দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পর তাঁকে নবগঠিত পূর্বাঞ্চলীয় এরিয়ার যুদ্ধাপরাধ তদন্ত বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল প্রবল। নীরবে অনেক মানুষকে শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যার ধারাবাহিকতা তাঁর সুযোগ্য সন্তানরা বজায় রেখে চলেছেন।
নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ, নাজিরহাট আলিয়া মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি ডিগ্রী কলেজ ও নানুপুর লায়লা-কবির ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আফাজুর রহমান সাহেবের অবদান অনস্বীকার্য। কথিত আছে, বিশিষ্ট দানবীর, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক আলহাজ্ব রফিকুল আনোয়ার (এমপি) সাহেব তাঁর শরণাপন্ন হয়ে নানুপুরবাসীর জন্য কিছু করে যাওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করলে তিনি এতদঞ্চলে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার পরামর্শ প্রদান করেন। কারণ কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত নাজিরহাট কলেজে পুরুষরা যেতে পারলেও মহিলারা উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। তখনই রফিক সাহেব তাঁর মা-বাবার নামে নানুপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং ১৯৯১ সালে স্থাপিত হয় নানুপুর লায়লা-কবির কলেজ।
এম আফাজুর রহমান সাহেব যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘকালীন পরিচালনা পরিষদের সম্মানিত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, তার মধ্যে নানুপুর মজহারুল উলুম গাউছিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়, নানুপুর লায়লা কবির ডিগ্রি কলেজ অন্যতম।
১৯৯২ সালের ১লা জুন এই জনপদের জননায়ক সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। নানুপুর স্কুল মাঠে তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা, আন্তরিক ভালবাসা ও পরম কৃতজ্ঞতাবোধের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তাঁর উত্তম জীবনাদর্শ, গভীর স্বদেশপ্রেম, মানুষের জন্য ভালবাসা আর সমাজের প্রতি দায়বোধ আমাদের জন্য নিসন্দেহে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সমাজকল্যাণে নিবেদিত প্রতিটি উদ্যোগ তাঁর মেধা, শ্রম, আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী।
আল্লাহ উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের আলা মকাম দান করুক। আমিন।। (ঈষৎ পরিমার্জিত)