01/05/2026
একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি — নূরজাহান
আজ লিখছি সেই মানুষটির কথা, যার স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “নূর-এ-জাহান মেমোরিয়াল স্কলারশিপ”—
আমার প্রিয় ফুফুজান, নূরজাহান।
তার জন্মতারিখ জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সাল বলতেন না; বরং ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে বলতেন—
“ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর আমার জন্ম।” অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা জেলার গাজীপুর মহকুমার প্রাচীন জনপদ কাপাসিয়ায়, মোঃ আব্দুল মোতালেব ও সূর্য বানুর ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সন্তান—এবং পুরো পরিবারের বড় মেয়ে।
পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায়, জীবন তার জন্য খুব সহজ ছিল না। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হলেও সময়ের বাস্তবতা ও সমাজের কঠিনতা তাকে শৈশব থেকেই দায়িত্বশীল করে তোলে। কৈশর কাটে একটি নতুন দেশের জন্ম দেখতে দেখতে—তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধেরও একজন নীরব সাক্ষী।
পরবর্তীতে তার বিয়ে হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্যের সাথে, যিনি অবসর গ্রহণ করেন মেজর পদে। সেই সুবাদে তিনি পরিচিত হন মিসেস নায়েব আলী বা “মেজরনি” নামে—যে নামে আজও অনেকে তাকে স্মরণ করেন।
সংসার জীবনে তিনি ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ। রান্নায় ছিল অসাধারণ দক্ষতা—দেশি-বিদেশি নানা ধরনের খাবার তৈরি করতে পারতেন অনায়াসে। পাশাপাশি সেলাই, বুননসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পে ছিল পারদর্শিতা। ছাদ বাগান ও কৃষিকাজের প্রতিও ছিল তার গভীর ভালোবাসা। স্বনির্ভরতা যেন তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
তিনি যেমন ছিলেন ধার্মিক, তেমনি ছিলেন পরোপকারী। তার কাছ থেকেই আমি প্রথম শিখেছি চাশতের নামাজ, এশরাক, আউয়াবীন ও তাহাজ্জদের নামাজের গুরুত্ব। শুধু নিজে আমল করেই থেমে থাকেননি—অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন।
নিজ গ্রাম এলাকায় একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন এবং একটি মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। শিক্ষার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর ও আন্তরিক। নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন—ভাতিজা, ভাইস্তাসহ অনেককে তিনি শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করতে আর্থিক ও মানসিকভাবে সহায়তা করেছেন।
মানুষের কষ্টে তিনি কষ্ট পেতেন। কেউ বিপদে পড়লে, নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াতেন। শুধু পরিবার নয়—তার এলাকায় অসহায় ও কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বহু নজির রয়েছে। কারো দুঃখ লাঘবে তিনি হাজার নয়, লাখ টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছেন—নিঃস্বার্থভাবে, নীরবে।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও থেমে থাকেননি। তিনি ছিলেন কিডনি রোগে আক্রান্ত, বয়সও হয়ে গিয়েছিল—তবুও ঢাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে না থেকে ছুটে বেড়িয়েছেন ময়মনসিংহে, মসজিদ ও মাদ্রাসার কাজের জন্য।
রাতের বাসে ঢাকা আসা, আবার ভোরে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া—এই নিরলস ছুটে চলা সত্যিই আমাদের প্রজন্মকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের লক্ষ্য, নিজের দ্বীন, কিংবা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অবিরাম এগিয়ে যেতে হয়।
জীবনের শেষ দিনে নিজের অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে অন্যের খোঁজখবর নেওয়া—এটাই ছিল তার স্বভাব।
তিনি ছিলেন এক জনদরদি নারী, এক আলোকবর্তিকা—যিনি একটি পরিবারকে, একটি প্রজন্মকে দাঁড়াতে সাহায্য করেছেন।
অসংখ্য স্মৃতি রেখে, অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগিয়ে
২০২৬ সালের ১৪ মার্চ তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
তার স্মৃতি যেন শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে—
বরং তার আলো ছড়িয়ে পড়ুক নতুন প্রজন্মের মাঝে,
শিক্ষার মাধ্যমে, মানবিকতার মাধ্যমে।
লিখেছেন
--------------------
M A Mannan
Founder & Advisor
Noor e Jahan Memorial Scholarship-নূর এ জাহান মেমোরিয়াল স্কলারশিপ