24/09/2026
বিক্রমপুর হাজার বছরের গৌরব, নদী আর মানুষের ভালোবাসায় গড়া এক জীবন্ত ইতিহাস।
🌿 গল্প: “বিক্রমপুরের মাটিতে মুন্সিগঞ্জ”
অনেক অনেক বছর আগে, যখন আজকের মুন্সিগঞ্জ নামটিও মানুষের মুখে শোনা যেত না, তখন এই ভূখণ্ড পরিচিত ছিল বিক্রমপুর নামে।
পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী আর ইছামতীর জলধারা ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। বর্ষায় চারদিক যখন পানিতে ভরে যেত, তখন নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান বাহন। নদীর বুকে পালতোলা নৌকা আর তীরে সবুজ ধানক্ষেত—বিক্রমপুরের প্রকৃতি যেন নিজের হাতেই একটি ছবি এঁকে রেখেছিল।
এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন ও বিচরণ করেছেন বহু জ্ঞানী, সাধক, রাজা ও কীর্তিমান মানুষ। অতীশ দীপঙ্কর—বিক্রমপুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান—জ্ঞান ও বৌদ্ধ দর্শনের আলো নিয়ে সুদূর তিব্বত পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তাঁর নাম আজও বিক্রমপুরের গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
সময়ের স্রোতে রাজা-রাজড়াদের যুগ পেরিয়ে এল মুঘল ও ব্রিটিশ শাসন। জনপদের নাম ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলাতে বদলাতে একসময় গড়ে ওঠে মুন্সিগঞ্জ জেলা। কিন্তু মানুষের মুখে ‘বিক্রমপুর’ নামটি থেকে যায় ভালোবাসার এক পরিচয় হিসেবে।
মুন্সিগঞ্জের ইতিহাস শুধু রাজা বা জমিদারের ইতিহাস নয়। এটি কৃষকের ইতিহাস, মাঝির ইতিহাস, মাটির ঘ্রাণে বেড়ে ওঠা মানুষের ইতিহাস। এখানকার ইলিশ, পদ্মার পাড়ের জীবন, নৌকা, খাল-বিল, নারকেল-সুপারি আর শীতের পিঠা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নিজস্ব এক সংস্কৃতি।
আর আছে ইদ্রাকপুর কেল্লা—মুন্সিগঞ্জ শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন। নদীপথের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত এই দুর্গ আজও দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে।
মুন্সিগঞ্জের আরেকটি পরিচয় তার আলু। মাটির নিচে জন্ম নেওয়া সেই আলু একসময় দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের বিশেষ পরিচয় তৈরি করেছে। পাশাপাশি রয়েছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ—যার স্বাদ ও খ্যাতি মুন্সিগঞ্জের নামকে দেশের সীমানার বাইরেও পরিচিত করেছে।
আজকের মুন্সিগঞ্জ আধুনিক হয়েছে। সড়ক হয়েছে, সেতু হয়েছে, শহর বড় হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখনও মনে হয়—হাজার বছর আগের সেই বিক্রমপুর যেন খুব দূরে নয়।
বিক্রমপুরের মাটি তাই শুধু মাটি নয়—এটি ইতিহাসের পাতা।
নদীগুলো শুধু নদী নয়—এগুলো সময়ের সাক্ষী।
আর মুন্সিগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়—এটি বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত অধ্যায়।