18/04/2026
২০০১ সালে কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়িতে ঘটে যায় এমন এক সংঘ'র্ষ, যা ভারতের দম্ভের জবাব হয়ে আজও স্মরণীয়। সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও সীমান্তরক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ।
মাত্র ৮ জন বিডিয়ার (বিজিবি) সদস্য প্রতিরোধ করেছিল ভারতীয় বিএসএফের বাংলাদেশের সীমান্তে আ'ক্র'মণ।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামের একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম বড়াইবাড়ি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামটিতেই ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ঘটে যায় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম র'ক্ত'ক্ষ'য়ী সংঘ'র্ষ।
ওই সংঘ'র্ষে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ১৬ জন সদস্য নি'হত হন এবং বাংলাদেশের তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) ৩ জন সদস্য প্রাণ হা'রান। বড়াইবাড়ি গ্রামের ঠিক অপর পাশেই ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত অবস্থিত।
ঘটনা শুরু হয় সিলেটের পদুয়ায়। সেখানে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশের ভেতরে একটি ক্যাম্প স্থাপন করে এবং আরেক ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা চালায়।
বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) এর আপত্তি উপেক্ষা করে বিএসএফ নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। তখন বিডিআর নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করে। এতে উ'ত্তে'জনা বাড়ে।
২০০১সালে রাত ৩টার দিকে ভারতীয় দু'র্ধ'র্ষ কমান্ডো ক্যাটস আই ও বিএসএফ-এর প্রায় ৪০০ সদস্যের যৌথ-বাহিনী বাংলাদেশের বড়াইবাড়ি ক্যাম্প দ'খল করতে আসে।
১৮ এপ্রিল ভোররাতে বড়াইবাড়ি গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা তাদের কৃষিজমিতে সেচের কাজ দেখতে যান। এ সময় তারা দেখতে পান, ধানক্ষেতে বহু সশস্ত্র সৈন্য চলাফেরা করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রামবাসীদের কাছে হিন্দি ভাষায় জানতে চান-বিডিআরের ক্যাম্প কোথায়। তখনই গ্রামবাসীরা বুঝতে পারেন, তারা ভারতের বিএসএফের সদস্য।
বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে বিএসএফ ঢুকে পড়ার খবর দ্রুত বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে পৌঁছে দেন একজন কৃষক। তিনি যখন বিডিআর ক্যাম্পে পৌঁছান, তখন সেখানে মাত্র আটজন বিডিআর সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন,“ক্যাম্পে গিয়ে আমি বিডিআর সদস্যদের জানাই যে বিএসএফ আমাদের এলাকায় ঢুকে পড়েছে। তারা সঙ্গে সঙ্গে অ'স্ত্র নিয়ে প্রস্তুতি নেয়।
কিছুক্ষণ পর প্রস্রাবের জন্য বাইরে বের হয়ে পুকুরের ওপার পাড়ে বিএসএফ সদস্যদের দেখতে পাই। দৌড়ে ক্যাম্পে ফিরে এসে খবর দিতেই সঙ্গে সঙ্গে গো'লা'গু'লি শুরু হয়। চারদিক থেকে শত শত গু'লি ছোড়া হচ্ছিল। আমিও তখন অ'স্ত্র তুলে নিই।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া তীব্র গো'লাগু'লির শব্দে প্রক'ম্পিত হয়ে ওঠে বড়াইবাড়ি গ্রাম ও আশপাশের এলাকা।
প্রচণ্ড সংঘ'র্ষে আত'ঙ্কিত গ্রামবাসীরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বিএসএফরা বড়াইবাড়ী বিডিআর ক্যাম্প দখ'ল করার জন্য পূর্বদিক থেকে গু'লীব'র্ষণ শুরু করে। বিএসএফ গু'লীব'র্ষণ করলেও বিডিআর ১০ মিনিট এই গু'লির জবাবে কোন প্রকার পাল্টা গু'লি না করে চুপচাপ থাকে।
বিডিআর চুপচাপ থাকায় ভারতীয় বাহিনী মনে করেছিল বিডিআররা হয়তো বিএসএফের ভয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়েছে। এই ধারনা করেই ভারতীয় বাহিনী পশ্চিম দিক থেকে অসতর্কভাবে বিডিআর ক্যাম্পের দিকে এগুতে থাকলে বড়াইবাড়ী বিওপির চারটি মেশিনগান একসাথে গর্জে উঠে। মিনিটে সাতশ গু'লী ছুঁড়তে পারা মেশিনগান থেকে অকস্মাৎ ব্রা'স ফা'য়ারের গু'লি খেয়ে ভারতীয় বাহিনী হকচকিয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালাতে থাকে।
বিডিআরের মেশিনগানের গু'লিতে অনেক হতা'হত হয়। দুর্ধ'র্ষ কমান্ডো ক্যাটস আইসহ বিএসএফ-এর ১৬জন সৈনিকের লা'শ বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে থাকে। কয়েকজন সেনাকে গ্রামের জনগণ ধরে গাছের সাথে বেঁ'ধেও রাখে। ভারত যদিও এতো হতা'হতের কথা স্বীকার করে নাই তবে অনেকের ধারনা এই যু'দ্ধে ভারতের প্রায় ৭০জন সৈন্য নি'হত হয়েছিল।
বড়াইবাড়িতে সংঘ'র্ষ চলাকালে ঢাকায় তৎকালীন বিডিআর সদরদপ্তরের নির্দেশে জামালপুর ও ময়মনসিংহ থেকে অতিরিক্ত বিডিআর সদস্য পাঠানো হয়। সকাল সাড়ে দশটার দিকে ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকে আসা বিডিআর সদস্যরা বড়াইবাড়িতে পৌঁছান। ১৮ এপ্রিল ভোর পাঁচটা থেকে সকাল এগারোটা পর্যন্ত একটানা গো'লাগু'লি চলে।
চার ঘণ্টা পর্যন্ত ওই ৮ জন সদস্য একাই প্রতিরোধ চালান। পরে আরও দুটি ক্যাম্প থেকে ২০ জন বিডিআর সদস্য এসে যোগ দেন। গ্রামের আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরাও বিডিআরের পাশে দাঁড়ান। সম্মিলিত প্রতিরোধে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়। এভাবে ১৮ এপ্রিল সারাদিন এবং রাত পেরিয়ে ১৯ এপ্রিল রাত পর্যন্ত থেমে থেমে গো'লাগু'লি অব্যাহত থাকে। বড়াইবাড়ি সংঘ'র্ষে বিএসএফের ১৬ জন সদস্যের মৃ'তদেহ বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে পাওয়া যায়।
সংঘ'র্ষের পর ২০ এপ্রিল বিএসএফ-এর ম'রদেহ এবং আটক সৈন্যদের বাংলাদেশ ফেরত পাঠায়। ২১ এপ্রিল দুই পক্ষ অ'স্ত্র সংবরণে সম্মত হয়। এই পরাজয় ভারতীয় বাহিনীর মাঝে এক ধরণের আ'ত'ঙ্ক তৈরি করে। অনেকেই বলেন, এই অভিজ্ঞতাই ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যতে সরাসরি সীমান্ত যু'দ্ধ থেকে বিরত রেখেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের দাবি, ওই ঘটনায় বিএসএফের নিহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। তবে অনেক মৃ'তদেহ ভারতীয় বাহিনী সীমান্তের ওপারে নিয়ে যায়। যে ১৬ জনের মৃ'তদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো বাংলাদেশের ভেতরে ধানক্ষেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দুঃ'খজ'নকভাবে, কোনো সরকার এই সাহসিকতা ও শহীদদের ত্যাগকে যথাযথভাবে সম্মান জানায়নি।
এই যুদ্ধের সময় বিডিআরের মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান।
ফজলুর রহমান আশা করেছিলেন এই অসম সৈনিক নিয়ে যু'দ্ধ জয়ের কারণে শেখ হাসিনা হয়তো তাকে বীর খেতাব দিয়ে পুরস্কৃত করবে। কিন্তু পুরস্কৃত তো দূরের কথা উল্টো তাকে পদ'চ্যু'ত করেছিল।
যু'দ্ধে বিডিআর’র সদস্য নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া, সিপাহী মাহফুজার রহমান ও সিপাহী আব্দুল কাদের শহীদ হন।
পরবর্তীতে শহীদ ৩ জনের স্মরণে ক্যাম্পের সামনে বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্মৃতি ফলক নির্মাণের উদ্বোধন করেন।
এটা প্রশ্ন আকারে করলে হবে:
কোনো সরকার কি এই সাহসিকতা ও শহীদদের ত্যাগকে যথাযথভাবে সম্মান জানাবে না ? নাকি ভারতীয় আধিপত্যের দাস হয়ে এই বিজয়ও আমরা উদযাপন করতে পারব না?