01/11/2025
রামগতির ইটভাটা সংকট ও জলবায়ু বিপর্যয়: শাসনব্যবস্থা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
— মাছুম জুলকারনাইন
রামগতি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি ভঙ্গুর ভূখণ্ড, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান প্রতিদিনই পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। লবণাক্ত মাটি, নদীভাঙন, জলবায়ুর অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশগত ঝুঁকির তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে। এমন একটি সংবেদনশীল এলাকায় যদি উন্নয়ন বা শিল্প স্থাপন হয়, তা হওয়া উচিত ছিল কঠোর পরিবেশ নীতি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব চিত্র এক নির্মম ব্যঙ্গ—রামগতিতে মোট ৫১টি ইটভাটা কার্যক্রম, যার মধ্যে বৈধ মাত্র দুটি, বাকি ৪৯টি অবৈধভাবে চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিবেশনৈতিক লজ্জাস্থল, এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
ইটভাটা শিল্পের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ঘটে মাটি ও বায়ুর ওপর। ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে টপ সয়েল সংগ্রহ করা হয়, যা কৃষির জন্য অপরিহার্য। মাটি পুনর্গঠনে প্রকৃতির প্রয়োজন হয় প্রায় এক শতাব্দী, অথচ কিছু বছরের লোভ ও প্রভাবের কাছে সেই মাটি হাতেনাতে লুট হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু জমির উর্বরতা নয়, খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। উপকূলীয় অঞ্চল যেখানে ইতোমধ্যেই লবণাক্ততার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, সেখানে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়া মানে কৃষকের ভবিষ্যৎ ধ্বংস, খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তা এবং দারিদ্র্যের গভীরতা বৃদ্ধি।
অবৈধ ইটভাটার চিমনি থেকে অবিরাম নির্গত ধোঁয়া বাতাসে মিশে গঠন করছে বিষাক্ত বায়ুস্তর। সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম কণা (PM2.5/PM10) মানুষের ফুসফুস ধ্বংস করে। শিশুর শ্বাসনালী, বৃদ্ধের হৃদযন্ত্র এবং গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্য এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর দুই লক্ষাধিক মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। রামগতির মতো প্রান্তিক উপকূলে যেখানে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত, সেখানে এমন দূষণ সরাসরি জীবনসংকটে রূপ নেয়। ধূলা ও ধোঁয়ায় ভরা বাতাস, চোখ জ্বালা, কাশি, হাঁপানি—এসব এখানে নিত্যদিনের রোগে পরিণত হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ইটভাটা স্থাপনের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক, এবং আইন রয়েছে যাতে আবাসিক এলাকা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল কিংবা নদীর তীরের আশেপাশে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু কাগজের আইন আর মাঠের বাস্তবতার মাঝে অনেক দূরত্ব। যেখানে আইন তার শক্তি হারায় এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাদের অর্থ ও সম্পর্কের জোর দেখায়, সেখানে রাষ্ট্রের নৈতিকতা ও নাগরিক অধিকারের মৃত্যু ঘটে নীরবে। নিয়মিত মনিটরিং থাকলে, সাহসী প্রশাসন থাকলে, জনগণের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মূল্য যদি সত্যিই বিবেচ্য হতো, তাহলে এভাবে প্রকাশ্যে অবৈধতা চলতে পারত না।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশের উপকূল। লবণাক্ততা বাড়ছে, নদীভাঙন গ্রাস করছে বসতি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিনিয়ত মানুষকে উদ্বাস্তু করছে। এমন প্রেক্ষাপটে অবৈধ ইটভাটা মানে আশ্রয়হীন মানুষকে আরও আশ্রয়হীন করে দেওয়া। গাছ কাটা ও বন ধ্বংস করে কাঠ সংগ্রহ করা মানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা নষ্ট করা। প্রকৃতি সবসময় তার প্রতিশোধ নেয় ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
এই অপরাধের শেকড় শুধুই অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। যখন আইন থাকে কিন্তু প্রয়োগ হয় না, যখন পরিবেশ থাকে কিন্তু তার রক্ষক থাকে না, যখন মানুষের স্বাস্থ্য থাকে কিন্তু তার মূল্য থাকে না, তখন এমন অবৈধ সাম্রাজ্য দাঁড়াইয়েই যায়। এই নীরব আপস ও উদাসীনতার নামই সুশাসনের বিপরীত—এটি শাসনব্যবস্থার আত্মহত্যা।
রামগতির ইটভাটাগুলো শুধু ইট পোড়াচ্ছে না, ভবিষ্যৎ পোড়াচ্ছে। নদীর তীর ভাঙছে, ফসলের জমি ফুরিয়ে যাচ্ছে, বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে, আর মানুষ অদৃশ্য মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের স্বপ্ন তখনই ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে, যখন তা টেকসইতার ভিত্তিতে দাঁড়ায় না। আজ রামগতি ধুঁকছে; কাল দেশের অন্য উপকূলও একই পরিণতির মুখোমুখি হবে। প্রকৃতি কারো কাছে ঋণ রেখে যায় না। আমরা যদি তাকে ধ্বংস করি, সে আমাদের ফিরিয়ে দেয় দ্বিগুণ শক্তিতে।
সুতরাং অবিলম্বে কঠোর অভিযান, প্রযুক্তিগত বিকল্প যেমন পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহার, স্থানীয় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসব এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। উপকূলকে রক্ষা করা মানে দেশকে রক্ষা করা। আজ যাদের গলা চেপে এই অবৈধ ইটভাটা টিকে আছে, তাদের নীরবতা আগামী প্রজন্মের শ্বাসরোধ হয়ে উঠবে। পরিবেশের ক্ষতি কোনো স্থানীয় ব্যক্তি বা সরকারের ক্ষতি নয়; এটি জাতির ক্ষতি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতি।
শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সহজ—
অবৈধ লাভের সঙ্গে জনগণের স্বাস্থ্য, প্রকৃতি আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তার যুদ্ধ হলে, প্রকৃতি জয়ী হবে। কিন্তু সেই বিজয়ে আমরা থাকব না, থাকবে শুধু আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের ধ্বংসস্মারক।