22/07/2026
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ: নীরব সংকট এবং আমাদের করণীয়
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, তাদের ছুটি মিলে, কিন্তু স্বস্তি মিলে না। পরীক্ষা হয়, কিন্তু শিক্ষা হয় না। ক্লাস হয়, কিন্তু পড়া হয় না। পড়া যদিও বা হয়, কিন্তু মনে থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন, তীব্রভাবে বেঁচে থাকার সময়। কিন্তু কেন জানি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা মরে মরে বেঁচে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই জীবন সম্পর্কে তারা তীব্র হতাশ। এমনটা নয় যে তারা পারিপার্শ্বিকতা জানে না, বোঝে না, যার কারণে এমন হচ্ছে; বরং তারা জেনে-বুঝেও এই হতাশাটা অনুভব করে। তারা জানে যে, হতাশ হয়ে বসে না থেকে কাজ করলে তাদের জীবনটা সফল হবে, কিন্তু তারপরও তারা কাজটা করতে পারে না। আরও স্পষ্টভাবে বললে বলা যায়, সে কাজ করার স্পৃহা পায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও ছাত্রজীবন, এবং আমাদের স্কুল-কলেজের জীবনটাও ছাত্রজীবনই ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে যে হতাশা, সেই জিনিসটা স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে ছিল না। স্কুল-কলেজে যে শিক্ষাটা আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষাটা নিতে পারে না। দায়ভার নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার যে প্রচেষ্টা, সেটা করাই হয় না বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন মন-মানসিকতার মানুষ আসে। এসব মানুষদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আপাতদৃষ্টিতে জিনিসটা আমাদের কাছে অনেক ছোট মনে হচ্ছে, কিন্তু চার বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অনেক বড় একটা সময় যায় এই ব্যাপারটা মেনে নিয়ে বা ব্যাপারটার সঙ্গে মানিয়ে চলতে।
পরিবার-পরিজন এবং নিজের এলাকা ছেড়ে আসা শিক্ষার্থীরা “জীবন থেকে শিক্ষা” নেবে, নাকি “জীবনের জন্য শিক্ষা” নেবে, সেই জিনিসটাই বুঝতে পারে না।
দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যে বন্ধুবান্ধব বা সঙ্গ নির্বাচন করে, পরবর্তী সময়ে এসে তারা আফসোস করে, এবং এই নিয়ে আরেকটা হতাশার সৃষ্টি হয়। প্রতিদিনকার চলার মতো এই সাথী নির্বাচনও তাদের জন্য একটা মানসিক চাপের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
ছোটখাটো মানসিক চাপের ব্যাপারগুলো, যেহেতু তারা ‘বড় হয়ে গিয়েছে’, তাই পরিবারের সঙ্গেও শেয়ার করতে পারে না। আবার তাদের মনে হয়, পরিবার-পরিজন, মা-বাবা হয়তো চিন্তা করবে; এজন্য এই কথাগুলো তাদের সঙ্গে বলতে পারে না। মানসিক চাপে নত হয়ে গেলেও তাদেরকে দেখাতে হয় যে, জীবন আনন্দময়। তারা তাদের তারুণ্য উপভোগ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ জীবনে এসে শিক্ষার্থীরা আরও বড় ধরনের একটা টানাপোড়েনে পড়ে। চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হবে, এই চিন্তায় "তারুণ্য" যেন অকালবার্ধক্যে রূপান্তরিত হয়।
আর্থিক সংকট এবং আর্থিক সাহায্য নেওয়ার সংকোচ তাদের কুড়ে কুড়ে খায়। তবুও বলার কিছু থাকে না, কারণ বয়সটা এখন তাদের উপার্জন করার।
এতসব মানসিক চাপের মধ্যে থাকার পরও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা কনসালটেশনের ব্যাপারটাকে আমাদের দেশে এখনো সহজভাবে দেখা হয় না। হঠাৎ করে বাবা-মা যখন আবিষ্কার করেন, তাদের ছেলেমেয়েগুলো এরকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা খেই হারিয়ে ফেলেন। তাদের কাছে মনে হয়, এমন জীবন তো তারাও পার করে এসেছেন, কিন্তু তাদের তো এরকম অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছেন, "মনেরে আজ কহ যে, ভালো-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যেরে লও সহজে।"
জীবনকে আসলে সহজভাবে নিতে হবে। জীবনে উত্থান-পতন, সাফল্য আসবে, ব্যর্থতা আসবে। এবং জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রকে খুব ভালোভাবে অনুভব করে যেতে হবে। শুধু ভালো জিনিসগুলো প্রত্যাশা করে, খারাপ জিনিসগুলোকে পাশ কাটিয়ে এরকম চাওয়া থাকলে তো আর পুরো জীবনটা পাওয়া হবে না।
নেতিবাচকতা বা হতাশা জীবনে আসবেই, কিন্তু তাই বলে সেগুলোতে নিজেকে আটকে না রেখে যদি সামনের দিনের দিকে যাত্রা করা যায়, তবেই জীবনটা সুন্দর হবে, সহজ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এরকমভাবে তাদের চিন্তাধারা বদলাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সময়টুকু একজন শিক্ষার্থী অন্যের জন্য ব্যয় করে, সেই সময়টা যদি সে নিজের দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে নিজের শখ পূরণের দিকে ব্যয় করে, তবে জীবনের দুঃখ বা চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
সমাজ-সামাজিকতার পর্যবেক্ষণ দিয়ে নিজের জীবনকে দুর্বিষহ না করে যদি কেউ নিজের মন-মানসিকতা দিয়ে নিজের জীবন অতিবাহিত করে, তবে তাকে মানসিক চাপের এই নীরব সংকটের মধ্যে পড়তে হবে না।
শিক্ষার্থীদের চিন্তাধারাকে সঠিক পরিক্রমায় নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। তারুণ্য সুন্দর, তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে, অনুভব করতে দিতে হবে। নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ এই সময়টা যেন তারা মাদকের করাল গ্রাসে না পড়ে কিংবা অসৎ সঙ্গের কারণে তাদের স্বপ্ন যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে, সেই জিনিসটা নিশ্চিত করতে হবে।
রুফাইদা রহমান
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক
পাঠকবন্ধু
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়