বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই এর তিরোধানের পর থেকে আখড়া বাড়ির সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল লালন মাজার শরিফ ও সেবা সনদ কমিটির মাধ্যমে। লালন অনুসারী প্রকৃত বাউলদের সাধন ভোজন দীক্ষা, দক্ষিণা অনুষ্ঠান (দোল পূর্ণিমা ও পহেলা কার্তিক) প্রভৃতি তদারকি তারাই করত। পরবর্তীতে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নেয়া হয়, পাকিস্তান শাসন আমলে আইয়ুব খানের সরকার লালন ফকিরের গান সংগ্রহ ও গবেষণার জন্য লালন মাজার চত্বরে লালন লোক
সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে লালন একাডেমী করা হয়। পরবর্তিতে এরশাদ সরকারের শাসনামলে ১৯৮৪ সালে কুষ্টিয়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম,বাউলদের মাজার থেকে পিটিয়ে বের করে দিয়ে লালন মাজার দখল করে নেয়। সে সময়ের লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির সভাপতি ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু সাঁই (প্রয়াত) এর ভাষ্য মতে ১৯৮৪ সালের ১৭ই অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি ফকির লালন সাঁই এর মাজারে ধর্মসভা ও বে-শরিয়তি পথ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্যে তওবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ঐ সময় উপস্থিত বাউল ফকিররা জেলা প্রশাসকের আদেশ অমান্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে জেলা প্রশাসক লাঠি চার্জের নির্দেশ দেন। রিজার্ভ পুলিশ লালন ভক্তদের বেদম প্রহার করে মাজারের সীমানা থেকে বের করে দেয়। বাউলদের আদি সংগঠন লালন মাজার শরীফ ও সেবা সনদ কমিটির তৎকালীন সভাপতি ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু সাঁই,সাধারণ সম্পাদক ফকির শামসুল আলম ও কোষাধ্যক্ষ ফকির ইয়াসিন সাঁই কে ভয় ভীতি দেখিয়ে জেলা প্রশাসক মাজারে রক্ষিত সিন্দুকের চাবি নিয়ে নেয়। পরবর্তিতে লালন মাজারের অধিকার ফিরে পেতে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতার পর ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি বাউলরা আইনের আশ্রয় নেন। কুষ্টিয়া সহকারী জজ আদালতে লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেন মন্টু সাঁই লালন মাজারে তাদের স্বত্ব ও অধিকার ফিরে পেতে মামলা দায়ের করেন,মামলার রায় ডিক্রিতে আদালত উল্লেখ করেন, ‘নালিশি সম্পত্তিতে বাদীগণের স্বত্ব স্বার্থ দখল থাকার ঘোষণা দেয়া গেল’। আদালতের রায়ের পর মাজার বাউলদের কাছে হস্তান্তর না করে বিবাদীরা জেলা জজ আদালতে আপিল করে। এ অবস্থায় ১৯৯৭ সালে লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটি নিম্ন আদালতে রায় বাস্তবায়ন করতে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করে। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। লালন একাডেমী তথা সরকার ২০০২ সালে হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে সর্বোচ্চ আদালত হাই কোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসক জামাল এ নাসের চৌধুরীর কাছে বাউলদের মাজার হস্তান্তর না করার বিষয় (সাংবাদিকদের কাছে) জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ মানতে আমরা বাধ্য। বিষয়টি আমার নজরে আসেনি,আমি দেখবো এবং তাদের কাছে হস্তান্তর করব। কবে হস্তান্তর করা হবে জানতে চাইলে সে সমায় তিনি কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেন নি। লালন ফকীরের মাজারের দখল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের রায় সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম এর মন্তব্য হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী সকলকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে লালন মাজারের দখল ও সত্ত্ব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা উচিৎ। লালন মাজারে বাউলদের নৈতিক ও ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে লালন আখড়ায় বাউলদের আইনগত অধিকারও স্বীকৃতি পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশিষ্ট লালন গবেষক প্রোফেসর আবুল আহসান চৌধুরী এর মতে,লালন মাজার বাউল সাধকদের দর্শন, সাধনা ও লালন সঙ্গীত চর্চার কেন্দ্র,তাদের তীর্থস্থান। ১০০ বছর ধরে বাউলরা সেখানে লালনের দর্শন ও সঙ্গীত চর্চা করে আসছে। মাজার পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ। লালন মাজার পরিচালনার দায়িত্ব বাউলদের কাছে না থাকলে নষ্ট হবে বাউল সংস্কৃতি। লালন মাজারের দায়িত্ব বাউলদের হাতে না থাকায় বাউলদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বিঘ্ন ঘটছে। লালন মাজার শরীফ ও সেবা সদন কমিটি দাবি মতে লালন পন্থী বাউল ফকীররা গুরুবাদী মানব ধর্মীয় অনুসারী বাউলদের তীর্থস্থান লালন মাজার অবিলম্বে বাউলদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সাঁইজীর মাজারে প্রকৃত লালন অনুরাগী বাউলদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রকৃত লালন দর্শন চর্চা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে হক-এর ঘর নামক সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার প্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা ফাখরুল আরেফিন খান নির্মাণ করেছেন ‘হক-এর ঘর’ নামক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। লালন অনুরাগী বাউলদের একত্রিত করা ও বাউলদের সম্পতি (লালন সাঁই এর আখাড়া বাড়ি ) তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদেরকে মানুষিক ভাবে প্রস্তুত করা ও তাদের আইন গত কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে বিভিন্ন রকম সহায়োতার সিধান্ত গ্রহন করেছে হকের ঘর সঙ্ঘ । হকের ঘর সঙ্ঘের এ উদ্দ্যগের সাথে বাংলাদেশের সুশিল সমাজের প্রতিনিধী বৃন্দ ও বিভিন্ন পেশাজিবী মহলের নেতৃবৃন্দ একমত পষন করেছেন এবং সম্পৃক্ত হয়েছেন। বাউলদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত হকের ঘর সঙ্ঘের বিভিন্ন রকম কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।