07/09/2026
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে রিকশা টেনে নিয়ে চলছিলেন সত্তোরোর্ধ্ব রইস মিয়া। বয়স আর অভাবের ভারে পিঠটা আগেই ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। সারাটা দিন খেটে যা উপার্জন হয়, তার একটা বড় অংশ চলে যায় স্ত্রীর প্রেসারের ওষুধে, আর বাকিটা দিয়ে কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চলে। তার নিজের ছেলেও যদি বেঁচে থাকত, তবে এতদিনে হয়তো এই বয়সেরই হতো।
সন্ধ্যার দিকে শহরের অভিজাত এলাকার এক শপিংমলের সামনে একটি ছেলে ও মেয়ে রইস মিয়ার রিকশা ডাকল। দুইজনেরই বয়স আঠারো-উনিশের বেশি হবে না, দামী পোশাক গায়ে।
"এই বুড়ো! গুলশান ২-এ যাবি? কত নিবি?"— ছেলেটি বেশ রুক্ষ সুরে বলল।
রইস মিয়া নরম গলায় বললেন, "বাবা, এই বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে গেছে, জল জমেছে। আর আমার শরীরটাও আজ ভালো ঠেকছে না... তাও চলো, আশি টাকা দিয়ে দিও।"
"আশি টাকা? মাথা খারাপ নাকি তোর?"— মেয়েটি ঝাজালো গলায় বলে উঠল। "নিজের বয়স দেখছিস? এই ভাঙা রিকশা টেনে আশি টাকা দাবি করছিস? ঠিকমতো চালাতে পারবি তো, নাকি মাঝরাস্তায় ফেলে দিবি?"
কথাগুলো রইস মিয়ার বুকে তীরের মতো বিঁধল। নিজের নাতনিদের বয়সী দুটো ছেলেমেয়ে তাকে এভাবে 'তুই' করে আর 'বুড়ো' বলে অপমান করছে। কিন্তু পকেটে স্ত্রীর ওষুধের জন্য জমানো টাকার ঘাটতি মনে পড়ে যেতেই তিনি কষ্টটা গিলে ফেললেন। মাথা নিচু করে বললেন, "চলে আসো বাবা, পৌছে দিচ্ছি।"
রাস্তায় হাঁটু পানি। পেছনের দুইজনের আড্ডা আর হাসাহাসির শব্দ আসছে, আর রইস মিয়া শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্যাডেল চেপে যাচ্ছেন। পায়ের রগগুলো যেন একবারে ছিঁড়ে আসছে, বুকের ভেতর হাঁপানির দম আটকে আসছে।
হঠাৎ এক গভীর গর্তে রিকশার চাকা আটকে গেল। শত চেষ্টা করেও রইস মিয়া আর রিকশাটি সামনের দিকে টানতে পারলেন না। বৃষ্টি আর চোখের পানি মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছিল তার ফাটল ধরা গাল দুটোতে।
পেছন থেকে ছেলেটি চেঁচিয়ে উঠল, "আরে ধুর! তোদের মতো অপদার্থ বুড়োদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না! এতক্ষণ ধরে সময় নষ্ট করলি!"
মেয়েটি রিকশা থেকে নেমে রইস মিয়ার দিকে কাদা ছিটিয়ে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। "একটা কাজের কাজ পারিস না, আবার আশি টাকা হাঁকানো হচ্ছিল!"— এই বলে ছেলেটি তার পকেট থেকে একশো টাকার একটা দুমড়ানো নোট রইস মিয়ার মুখের ওপর ছুড়ে মারল। নোটটা কাদা আর জমা পানির মধ্যে গিয়ে পড়ল।
তারা একটা নতুন ট্যাক্সি ডেকে চলে গেল। যাওয়ার সময় রইস মিয়া শুধু এক নজর তাদের দিকে তাকালেন। কোনো রাগ নেই, কোনো গালি নেই— শুধু একবুক নীরব কান্না।
হাঁটু পানিতে হাঁটু গেড়ে বসে কাদা থেকে সেই একশো টাকার ভিজে যাওয়া নোটটা তুলে নিলেন রইস মিয়া। চোখের সামনে ভেসে উঠল তার একমাত্র মৃত সন্তানের মুখটি। যদি আজ তার ছেলেও বেঁচে থাকত, হয়তো সেও এমন রিকশা চালকের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলত। কিন্তু এই শহরের আলো আর জাঁকজমকের নিচে কিছু মানুষের বিবেক যে এতটা ছোট হয়ে গেছে, তা ভাবতে ভাবতেই বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা কাদায় বসা রিকশাটি একাই একা ঠেলতে লাগলেন। শহরের ঝকঝকে রাস্তায় তখন বৃষ্টি থামলেও রইস মিয়ার চোখের শ্রাবণ থামেনি।