15/06/2023
খুলনার কথকতা - পর্ব ৪৭। ১৫ জুন ২০২৩
'নবাব আলীবর্দি খাঁ-র আমলের ২৭৫ বছর পুরনো মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির'
[বৃহত্তর খুলনার অলিতে-গলিতে, প্রান্তরে-নদীতে, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, ঐতিহ্য-কিংবদন্তীতে, মনীষীদের জীবনকথায় ছড়িয়ে রয়েছে অনেক অজানা গল্প। সেই গল্প হলেও সত্যি ঘটনাগুলোকে সক্কলকে জানাবার উদ্দেশ্যে আমাদের এই সাপ্তাহিক ব্লগ - খুলনার কথকতা। লিখছেন সুস্মিত সাইফ আহমেদ]
'এসেছি বাঙালী পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে
এসেছি বাঙালী জোড়বাংলার মন্দির বেদী থেকে'
(আমার পরিচয়, সৈয়দ শামসুল হক)
ছোটবেলায় যখন এই কবিতাটি পড়েছি, তখন ভাবতাম জোড়বাংলা বলতে কবি দুই বাংলার সব মন্দিরকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু যখন বড় হলাম আর ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া শুরু করলাম, তখন বুঝলাম জোড়বাংলা মূলত নবরত্ন, পঞ্চরত্ন, একচালা, মঠ ইত্যাদি-র মতো একটি মন্দির নির্মাণরীতি। দুটো একচালা ঘরকে পাশাপাশি যুক্ত করে দিলে যেমনটা দেখায়, জোড়বাংলা মন্দির ঠিক সেরকম। মধ্যযুগের শেষভাগে এই স্থাপত্যরীতির মন্দির নির্মাণ লোকপ্রিয়তা পায়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর কিংবা পাবনাতে শতাব্দীপ্রাচীন অনন্যসুন্দর জোড়বাংলা মন্দির এখনো স্বমহিমায় রয়েছে। আর রাজবাড়ি জেলার নলিয়া জোড়বাংলা মন্দিরগুলো মৃত্যুর প্রহর গুণছে। খুলনা শহরের বুকেও একটি ঐতিহ্যবাহী জোড়বাংলা মন্দির এখনো টিকে আছে। নবাব আলীবর্দি খাঁ-র রাজত্বকালে ১৭৪৯ সালে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত। আজকের লেখা এই ২৭৫ বছর পুরনো জোড়বাংলা মন্দিরটি নিয়ে।
মধ্যযুগের কোন এক সময়ে টেরাকোটার স্বর্ণখনি পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় বাস করতেন ঈশান বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ছেলে নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণবঙ্গ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন এবং খুলনার মহেশ্বরপাশায় থিতু হন। তৎকালীন শাসকবর্গের কাছ থেকে তিনি 'মল্লিক' উপাধী লাভ করেন। মল্লিক বংশ মহেশ্বরপাশা-র আদি বাসিন্দা। নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় তথা মল্লিকের অধস্তন প্রজন্ম গোপীনাথ মল্লিক। তিনি ছিলেন চাঁচড়ার (পরবর্তীতে অভয়ানগরের) রাজা নীলকণ্ঠ রায়ের সামসময়িক। গোপীনাথ মল্লিক কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। তাই নিজ বাসভবনের পাশে গোবিন্দের নামে আলঙ্করিক টেরাকোটা সমৃদ্ধ একটি মন্দির নির্মাণ করেন তিনি। এটিই মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির।
গোপীনাথ মল্লিক-ই মহেশ্বরপাশা জোড় বাংলা মন্দিরের নির্মাতা, এই বিষয়ে নিঃশংসয় হওয়া যায় মন্দিরের পূর্ব দেয়ালের উপরিভাগে স্থিতিত লিপিফলক দেখে। যদিও এই লিপিফলকের অর্ধাংশ খুঁজে পাওয়া যায় না, তবুও অবশিষ্টাংশের পাঠোদ্ধার - 'প্রশস্তি। শ্রী গোপীনাথোনামা ক্ষিতিসুর সুতকে বৃষ্ণিরাশৌ দিনেশে শ্রীহরি'।
মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দিরটি দক্ষিণামুখী। যদিও বর্তমানে দক্ষিণ বারান্দার প্রবেশপথে পিলারের ভগ্নাবশেষ ছাড়া কিছু নেই, তবু ধারণা করা যায় এককালে মন্দিরে তিন ভাঁজবিশিষ্ট খিলান প্রবেশপথ ছিল। এই খিলান তৈরীর জন্য দুটি কলাম-ও ব্যবহৃত হয়েছিল যা খাঁজকাটা নকশাবিশিষ্ট এবং চৌকেন্দ্রিক সূচালু। মূল মন্দিরের বাইরের অংশের পরিমাপ বর্গাকার। এর মধ্যবর্তী স্থানবরাবর দেয়ালের সাহায্যে কক্ষটিকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মূল গর্ভগৃহের দক্ষিণাংশে রয়েছে বারান্দা। দক্ষিণের বারান্দা পেরিয়ে উত্তরাংশে আছে মূর্তিকোঠা। মন্দিরের জানলার খিলানগুলোতে আছে খাঁজকাটা নকশা। মন্দিরের বাইরের পূর্ব-পশ্চিম দিকের কার্নিশ পেডিমেন্ট আকৃতির আর উত্তর-দক্ষিণ দিকের ধনুক বক্রাকার। এছাড়া মন্দিরের চারপাশের দেয়ালের কার্নিশের নিচে একাধিক পরতবিশিষ্ট অলংকৃত পট্টিধাপ আছে। পূর্ব,পশ্চিম ও উত্তরের দেয়ালে প্রলেপের আস্তরণের উপর এ অলংকৃত পট্টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর দক্ষিণদিকে এমন বৈশিষ্ট্য থাকলেও এ অংশ প্রলেপমুক্ত।
জোড়বাংলা মন্দিরের গর্ভগৃহের উত্তরের দেয়াল বরাবর কেন্দ্রে আছে বিগ্রহ বেদী। এই বেদীতেই গোপীনাথ গোস্বামী ১৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে রাধাগোবিন্দ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। গোবিন্দ দেবের বিগ্রহটি ছিল কষ্টিপাথরের আর রাধারাণীর বিগ্রহটি ছিল পিতল নির্মিত। কিন্তু ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনী এই মন্দিরের বিপুল ক্ষতিসাধন করে এবং বিগ্রহ দুটি ভেঙে পাশের পুকুরে ফেলে দেয়। যুদ্ধশেষে গ্রামবাসীরা আদি বিগ্রহের ভাঙা টুকরোগুলো পুকুর থেকে তুলে এনে বিগ্রহ বেদীতে স্থাপন করেন। সেই আদি বিগ্রহের ভাঙা অংশ আজো সেবা পাচ্ছে এই মন্দিরে।
মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দিরটি নান্দনিক কারুকার্যে সজ্জিত ছিল এককালে। মন্দিরের নির্মাণকাজে জাফরি ইট এবং চুন ও ইটের গুঁড়োর মিশ্রণে তৈরী মশলা ব্যবহৃত হয়েছে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত জাফরি ইটগুলো ছিল ক্ষুদ্রাকৃতির এবং বহুমাপবিশিষ্ট। মন্দিরের টেরাকোটা নকশায় নিও ক্ল্যাসিক ত্রয়ী খিলানরীতি অনুসৃত হয়েছে। তবে এই টেরাকোটার নকশার অধিকাংশ আজ লুপ্ত। তবু এখনো সেখানে গেলে দেখা পাওয়া যাবে, মন্দিরের প্রবেশদ্বারে অঙ্কিত মুখোমুখি দুটি ঘোড়ার মুখাকৃতি যা ধুলগ্রাম মন্দিরের প্রবেশদ্বারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়া উল্লেখযোগ্য আরেকটি টেরাকোটা নকশা হলো রাম-রাবণের যুদ্ধ। এছাড়া অলংকৃত নকশার মধ্যে রয়েছে অভিজাত রাজপুরুষ ও রাজবালা, নানা পশু, ময়ূর, লতা-পাতা আর সর্বাধিক রয়েছে ফুটন্ত গাঁদাফুলের চিত্র। এছাড়া খোপযুক্ত ফালির মধ্যে প্রতিটি খোপে রয়েছেন একজন দেবতা।
এককালে জোড়বাংলা মন্দিরের যশখ্যাতি ছিল ভূয়সী। কিন্তু সেবাইতদের অবহেলা, স্থানান্তরে গমন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইত্যাদি কারণে মন্দিরটি আজ মৃত্যুর প্রহর গুণছে। মন্দিরের প্রথম দিককার সংস্কারক হিসেবে রাখালরাজ মল্লিক, ঠাকুররাজ মল্লিক, মনোরঞ্জন মল্লিক এবং সতীশচন্দ্র মিত্রের নাম পাওয়া যায়। বর্তমানে এই মন্দিরটি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের মহেশ্বরপাশা মৌজার দাগ নম্বর ৬২৮২ খতিয়ান নম্বর ১৪৫২ মোতাবেক হারাধন মল্লিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে রেজিস্ট্রিকৃত। তিনি মল্লিক বংশের উত্তরপুরুষ। কিন্তু আজ কুঁড়েঘরে থাকা মল্লিকদের তেমন সামর্থ্য নেই এই মন্দিরের বিশাল সংস্কার সম্পাদন করার। তাই অবিলম্বে যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি - এই মন্দিরটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি স্বীকৃতি এবং সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হউক!
বিপন্ন, মুমূর্ষু হলেও আজো খুলনার বুকে টিকে আছে ২৭৫ বছর পুরনো ভজনালয়। খুলনার রেলিগেট মোড় কিংবা মানিকতলা মোড় থেকে শহীদ জিয়া মহাবিদ্যালয়ের সন্নিকটে রিকশা দূরত্বে এই মন্দিরটি অবস্থিত। সকলের কাছে আহ্বান রইল এই মন্দির ঘুরে আসার। পুরাকীর্তি আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এঁর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতের দায়ও তাই আমাদের-ই।
তথ্যসূত্র:
১.খুলনার পুরাকীর্তি, ড.মিজানুর রহমান, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, প্রকাশকাল: ২০১৭, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৮
২.যশোহর খুলনার ইতিহাস (২য় খণ্ড), সতীশচন্দ্র মিত্র
বি:দ্র: এই মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে আমাদের বন্ধু প্লাটফর্ম KK Khulna একটি বিস্তৃত তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছে। ভিডিওটি দেখার অনুরোধ রইলো সকলের কাছে। https://youtu.be/HABuM8x4_rE
#খুলনার_কথকতা
#খুলনা_ইন্সটিটিউট