14/05/2026
আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইসলামের ইতিহাসে এমন এক মহান সাহাবী, যাঁর জীবন ছিল আমানতদারিতা, বিনয়, ঈমান, সাহসিকতা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি নিখাদ আনুগত্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং সেই দশজন সাহাবীর একজন, যাঁদের দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন “এই উম্মাহর আমিন” বা “এই জাতির বিশ্বস্ত ব্যক্তি” হিসেবে।
তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আমির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ, তবে তিনি আবু উবাইদাহ নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি কুরাইশ বংশের ফিহর গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর চরিত্র শৈশব থেকেই ছিল মার্জিত, শান্ত, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। মক্কার সমাজে তিনি একজন সম্মানিত ও সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন, তখন আবু উবাইদাহ (রা.) প্রথমদিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের একজন, যারা ইসলামের কঠিন প্রাথমিক সময়ে ঈমান গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের পক্ষ থেকে কঠোর নির্যাতন শুরু হয়। কিন্তু তিনি সত্য থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। তিনি বুঝেছিলেন, এই দুনিয়ার কষ্ট সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি চিরস্থায়ী।
মক্কার কঠিন সময়ে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র স্বভাবের, কম কথা বলতেন, কিন্তু কাজের মাধ্যমে নিজের ঈমান ও চরিত্র প্রকাশ করতেন।
বদর যুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই যুদ্ধে তাঁকে এমন এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, যা ইতিহাসে বিরল।
তাঁর নিজের পিতা মুশরিকদের পক্ষে যুদ্ধ করছিল এবং বারবার তাঁর সামনে এসে তাঁকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছিল।
আবু উবাইদাহ (রা.) প্রথমে তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন তাঁর পিতা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে এবং তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন তিনি বাধ্য হয়ে মোকাবিলা করেন।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়, তাঁর কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ঊর্ধ্বে ছিল।
উহুদের যুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা ছিল অবিস্মরণীয়।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আহত হন এবং তাঁর মুখমণ্ডলে বর্মের দুটি লোহার রিং ঢুকে যায়।
সাহাবীরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
আবু উবাইদাহ (রা.) এগিয়ে এসে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিজের দাঁত দিয়ে সেই লোহার রিং দুটি টেনে বের করেন, যাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) কষ্ট কম পান।
এই কাজ করতে গিয়ে তাঁর নিজের সামনের দাঁত ভেঙে যায়।
কিন্তু তিনি এতে কোনো দুঃখ অনুভব করেননি; বরং এটিকে তিনি সৌভাগ্য মনে করতেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কষ্ট কমাতে পেরেছেন।
এই ঘটনা তাঁর গভীর ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য নিদর্শন।
তিনি ইসলামের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই অসাধারণ সাহসিকতা দেখান।
তবে তাঁর প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততায়।
একবার নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, “আপনি আমাদের সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত মানুষ পাঠান।”
তখন নবী করিম (সা.) বললেন, “আমি তোমাদের সঙ্গে এমন একজনকে পাঠাব, যিনি সত্যিই অত্যন্ত বিশ্বস্ত।”
সাহাবীরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন, কাকে নির্বাচন করা হবে।
শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু উবাইদাহ (রা.)-কে নির্বাচন করেন এবং বলেন, “প্রত্যেক জাতির একজন আমিন থাকে, আর এই উম্মাহর আমিন হলো আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ।”
এই ঘোষণা তাঁর মর্যাদাকে চিরস্থায়ী করে দেয়।
খিলাফতের যুগেও তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম ছিল।
খলিফা আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.) তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।
সাকিফার বৈঠকে আবু বকর (রা.) এমনকি বলেছিলেন, মুসলমানরা চাইলে আবু উবাইদাহ (রা.)-কে খলিফা নির্বাচন করতে পারে।
এটি তাঁর যোগ্যতা ও মর্যাদার বড় প্রমাণ।
পরবর্তীতে খলিফা উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা.)-ও তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন।
উমর (রা.) একবার বলেছিলেন, “যদি আবু উবাইদাহ জীবিত থাকতেন, তাহলে আমি তাঁকেই খলিফা মনোনীত করতাম।”
সিরিয়া বিজয়ে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ।
তিনি মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতিদের একজন ছিলেন এবং অসাধারণ নেতৃত্ব, ধৈর্য ও কৌশলের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয়ের পথে পরিচালিত করেন।
তাঁর অধীনে মুসলিম বাহিনী বহু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বিজয় করে।
কিন্তু এত বড় বিজয়ের পরও তাঁর জীবনে অহংকারের কোনো ছাপ ছিল না।
তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন।
একবার উমর (রা.) তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে প্রায় কোনো আসবাবপত্র নেই—শুধু একটি চাদর, একটি পানির পাত্র এবং কিছু সাধারণ জিনিসপত্র।
উমর (রা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
আবু উবাইদাহ (রা.) তখন বলেন, “আমাদের জন্য তো আখিরাতই যথেষ্ট।”
এই কথার মধ্যে তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাতমুখী জীবনের প্রতিফলন দেখা যায়।
তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ও অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
শামের অঞ্চলে যখন ভয়াবহ প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, তখন উমর (রা.) তাঁকে সেখান থেকে চলে আসতে বলেন।
কিন্তু তিনি মুসলিম সৈন্যদের ছেড়ে নিজে নিরাপদে চলে যেতে চাননি।
তিনি বলেছিলেন, “আমি আমার সৈন্যদের ছেড়ে পালাতে পারি না।”
অবশেষে সেই মহামারীতেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
তাঁর মৃত্যুতে মুসলিম উম্মাহ গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে।
আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত মর্যাদা ক্ষমতা বা সম্পদে নয়; বরং আমানতদারিতা, বিনয়, ঈমান ও আত্মত্যাগে।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন মানুষ কিভাবে নীরবে, বিনয়ীভাবে এবং নিখাদ আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর পথে জীবন কাটাতে পারে।
তাঁর জীবন আমাদের আরও শেখায়, সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব নয়; বরং মানুষের জন্য দায়িত্ব, ত্যাগ ও আন্তরিকতা।
ইসলামের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্মরণীয় থাকবে সেই সাহাবী হিসেবে, যিনি ছিলেন এই উম্মাহর আমিন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশ্বস্ত সঙ্গী, ইসলামের বীর সেনাপতি এবং তাকওয়া ও বিনয়ের উজ্জ্বল প্রতীক।
আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ (রা.)-এর জীবন মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্ত শিক্ষা—যে হৃদয়ে আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতি থাকে, সেই হৃদয়কে দুনিয়ার কোনো শক্তি পরাজিত করতে পারে না।
#ইসলামেরপথ #ইসলামেরকথা #ইসলামিক