25/07/2026
আপনাকে বলছি!📢
পরকালে আপনার সঙ্গী কে হবে? অন্তরের ভালোবাসাকে পুনর্মূল্যায়ন করুন।
📢 ভালোবাসা কার জন্য এবং কেন?
মানুষের হৃদয় কখনোই শূন্য থাকে না; সে কাউকে না কাউকে ভালোবাসবেই এবং কারও না কারও পদাঙ্ক অনুসরণ করবেই—এটি মানুষের ফিতরাত বা সহজাত স্বভাব।
তবে প্রশ্ন হলো, আধুনিক যুগে আমাদের হৃদয়ের স্থানটি দখল করে আছে কে?
আজকের সমাজে আমরা যদি চোখ মেলে তাকাই, দেখতে পাই এক গভীর আত্মিক দেউলিয়া। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আজ যাদের আদর্শ বানাচ্ছে, যাদের ভালোবাসায় নিজেদের রঙিন করছে, তারা বেশিরভাগই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ, বিনোদন কিংবা অসার প্রথার কাণ্ডারী। কারো পোশাক, কারো চালচলন কিংবা অনুকরণীয় চরিত্র নির্ধারিত হচ্ছে এমন সব দুনিয়াদার মানুষের দ্বারা, যাদের সাথে পরকালে আল্লাহর রহমতের কোনো সম্পর্ক নেই।
এর ফলে আমাদের সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে নেমে এসেছে এক গভীর মানসিক ও নৈতিক সংকট।
আমরা ভুলে গিয়েছি যে, কাল কেয়ামতের কঠিন ময়দানে মানুষের হাশর-নশর এবং জান্নাতের অবস্থান নির্ধারিত হবে তার অন্তরের মহব্বত ও অনুকরণের ওপর ভিত্তি করে।
ঠিক এই জায়গাতেই উঠে আসে প্রথম যুগের সেই মহান মানুষগুলোর গল্প—সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর কথা। যাঁদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কেবলই আল্লাহর প্রিয় হাবীব, মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁদের ভালোবাসা কেবল মুখে উচ্চারিত কোনো ভালোবাসার বুলি ছিল না; বরং তা ছিল আত্মত্যাগে উদ্ভাসিত এক সুগভীর অনুভূতির নাম। রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর বিরহ চিন্তা তাঁদের রাতের ঘুম হারাম করে দিত, চেহারার উজ্জ্বলতা কেড়ে নিত।
⏬
রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন,
"তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।"
📚সহীহ বুখারী হাদিস নং ১৫
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ৪৪
ইতিহাসের পাতায় এক অপূর্ব ইমানী ভালোবাসার উপাখ্যান সংরক্ষিত আছে। একদা সাইয়্যেদুনা ছাওবান (রা.)
অন্য বর্ণনামতে অন্য এক আনসারী সাহাবী—নবীজী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে হাযির হলেন। তাঁর চেহারা ছিল বিবর্ণ, চোখে ভাসছিল জল আর পুরো অবয়বে চেপে বসেছিল গভীর বিষাদের ছায়া।
দয়ার নবী (ছা.) তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে স্নেহের সুর কেটে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে তোমার? মন এত খারাপ কেন?"
সাহাবী অত্যন্ত আবেগপ্লুত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
"ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি যখন ঘরে থাকি, তখনো আমার অন্তরে আপনার ইয়াদ জাগ্রত থাকে। আপনার কথা মনে হলেই আমি আর স্থির থাকতে পারি না, সবকিছু ফেলে আপনার কাছে ছুটে আসি—শুধু এক নজর আপনাকে দেখার জন্য। আপনাকে দেখলে আমার ব্যাকুল হৃদয় শান্ত হয়, চোখ জুড়িয়ে যায়।
কিন্তু আজ একটি দুশ্চিন্তা আমার অন্তরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে! আমি ভাবছিলাম—আমরা তো একদিন মৃত্যুবরণ করব, আর আপনিও ওফাত লাভ করবেন। পরকালে আল্লাহ তাআলা আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান 'মাকামে মাহমুদে' সকল নবী-রাসূলদের সাথে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করবেন। আর আমি যদি আল্লাহর দয়ায় কোনোমতে জান্নাতে চলেও যাই, তবে তো আমার অবস্থান হবে অনেক নিচে। সেখানে তো আর আপনাকে চোখের সামনে দেখতে পাব না! আর যদি জান্নাতে গিয়ে আপনাকে দেখেই না পাই, তবে সেই জান্নাতের কী আনন্দ আমি উপভোগ করব?"
সাহাবীর এই নিঃস্বার্থ, পবিত্র এবং গভীর অনুভূতির কথা শুনে রাহমাতুললিল আলামীন কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, এই বিচ্ছেদ-বেদনা কতখানি সুগভীর আর ভালোবাসার মাত্রা কতটা নিখাদ।
⏬
পৃথিবীর কোনো শিক্ষক বা নেতা তাঁর অনুসারীকে এমন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় শান্ত করার ক্ষমতা রাখতেন না। তাই মালিকুল মুলক, পরম করুণাময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্বয়ং আসমান থেকে জিবরাঈল (আ.)-কে ওহী দিয়ে পাঠালেন। সাহাবীর সেই ব্যথিত হৃদয়ে শান্তিজল ঢেলে দিয়ে এবং পৃথিবীর সকল ইমানদারের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিয়ে নাজিল হলো পবিত্র কুরআনের এই অমর আয়াত...
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالصُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا
"আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে যাদের ওপর আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন—নবীগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ। আর সঙ্গী হিসেবে এরা কতই না উত্তম!"
(সূরা আন-নিসা, আয়াত ৬৯)
আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলেন যে, জান্নাতের স্তর যত ওপরেই হোক না কেন, যারা দুনিয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রকৃত অনুগত থাকবে এবং সত্য অন্তরে ভালোবাসবে, পরকালে তাদের স্থান ভিন্ন হলেও তারা নবীদের সান্নিধ্য ও সহচর্যে একত্রিত হতে পারবে।
এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর, নবীজী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুচকি হেসে সাহাবীকে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী সুসংবাদটি শুনালেন। তিনি বললেন,
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
"মানুষ (পরকালে) তার সাথেই থাকবে, যাকে সে (দুনিয়ায়) ভালোবাসে।"
📚সহীহ বুখারী হাদিস নং ৬১৬৮
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ২৬৩৯)
এই একটি বাক্য কেবল তৎকালীন সাহাবীদের জন্যই সান্ত্বনা ছিল না; বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগত কোটি কোটি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এক মহামূল্যবান প্রতিশ্রুতির দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর মুখ থেকে এই কথাটি শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে আনন্দের যে হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন,
"আমরা ইসলাম গ্রহণের পর নবীজী (ছা.)-এর এই উক্তি—'তুমি যাকে ভালোবাসো পরকালে তার সাথেই থাকবে'—শুনে যতটা আনন্দিত হয়েছিলাম, জীবনে আর কোনো খবরে এত বেশি খুশি হইনি।
⏬
আনাস (রা.) বলেন: আমি নবীজী (ছা.), আবু বকর এবং ওমর (রা.)-কে ভালোবাসি; আশা করি তাঁদের প্রতি আমার এই ভালোবাসার উসিলায় আমি তাঁদের সাথেই জান্নাতে থাকব, যদিও আমি তাঁদের মতো আমল করতে পারিনি।"
📚সহীহ বুখারী হাদিস নং ৩৬৮৮
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ২৬৩৯)
⏬
সাহাবাগণ বুঝতেন, আমলের পাল্লায় হয়তো তাঁরা নবীদের সমকক্ষ হতে পারবেন না, কিন্তু 'মহব্বত বা নিখাদ ভালোবাসা'-এর এমন এক চাবি, যা জান্নাতের বন্ধ দরজাগুলোকে অনায়াসে খুলে দেয় এবং দূরত্বের ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দেয়।
আমাদের করণীয়...
সাহাবীর এই কান্না এবং আল-কুরআনের আয়াতটি আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গভীর চিন্তার খোরাক জোগায়। আজকের এই ফিতনার যুগে আমাদের নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করা দরকারঃ-
📌হৃদয়ের ভালোবাসাকে খাঁটি করা,
আমাদের দেখতে হবে আমাদের হৃদয়ে কার রেখাপাত সবচেয়ে বেশি। আমরা কি গান-বাজনা, খেলাধুলা কিংবা ফাহেশা কালচারের অনুসারীদের ভালোবাসছি, নাকি জান্নাতের সরদার নবীজী (ছা.) ও তাঁর প্রিয় সাহাবিদের ভালোবাসছি? কারণ হাদিসের স্পষ্ট বার্তা—আপনি যাকে ভালোবাসবেন, কাল কেয়ামতে তার সাথেই আপনার হাশর হবে।
📌ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণে আনুগত্য (ইত্তেবা) ভালোবাসা কেবল মুখে 'নবী প্রেম'-এর স্লোগান দেওয়ার নাম নয়। আল্লাহ তাআলা আয়াতটিতে পূর্বশর্ত দিয়েছেন "যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে"। অর্থাৎ, সুন্নাহর অনুকরণ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, হালাল রুজি এবং আখলাকের মাধ্যমে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে।
📌নফল ইবাদতের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এক সাহাবী (রাবিআ ইবনে কা'ব আল-আসলামী) যখন রাসূল (সা.)-এর কাছে জান্নাতে তাঁর সঙ্গ চেয়েছিলেন, তখন রাসূল (ছা.) তাঁকে বলেছিলেন,
"তাহলে তুমি অধিক পরিমাণ সিজদার (নফল সালাতের) মাধ্যমে আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করো।"
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ৪৮৯
আসুন, আমরা আমাদের হৃদয়কে দুনিয়ার অসার মোহ থেকে মুক্ত করি। আমাদের পরিবার, সমাজ এবং আমাদের সন্তানদের রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনী ও সুন্নাহর ওপর গড়ে তুলি। চোখের জল ফেলে প্রভুর দরবারে আকুতি জানাই...
হে আল্লাহ! আমাদের আমল হয়তো জান্নাতের উচ্চ মাকামে পৌঁছানোর মতো নয়, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তোমার হাবীবের জন্য যে মহব্বত রয়েছে, তার উসিলায় তুমি আমাদের হাশর তোমার প্রিয় নবীর সাথেই করো। আমীন।
উপরোক্ত লিখিত আলোচনায় যা কিছু সঠিক ও কল্যাণকর তা একমাত্র মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যা কিছু ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ তা আমার নিজের এবং শয়তানের পক্ষ থেকে।
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি।
✍️ সাগর হারুন রশিদ সালাফী
#পরিচালক
একটি হালাল রুজির ফান্ড