17/05/2026
নাম : ফাতিমা তুজ্জোহরা
রোল : 38
ব্যাচ : TA-13
স্বপ্ন আমার বুকের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা,
কষ্টের জলে ভেসে ওঠা এক প্রত্যয়ের রেখা।
মানুষ সফলতার গল্প শুনতে ভালোবাসে।
অলীক হলেও সেখানে আলো থাকে, আশ্বাস থাকে।
কিন্তু ব্যর্থতার তিক্ত বাস্তব,
যা বুকের ভেতর নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ ঘটায়,
সেটা খুব কম মানুষই শুনতে চায়।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আদৌ ছিল কি না,।
নিজেও জানি না।
কিন্তু ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার সুবাদে একদিন হেড স্যার বলেছিলেন,
“স্কুল থেকে ওর একার নামই দিয়েছি ক্ষুদে ডাক্তার ক্যাম্পে।
সবাই দোয়া করো, একদিন সে সত্যিই ডাক্তার হবে।”
সেই ছোট্ট একটা বাক্য
তীরের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ঢুকে গিয়েছিল অন্তরের অবগাহনে।
আমার ভেতরে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিল।
স্যারদের অক্লান্ত চেষ্টা, বিশ্বাস আর যত্নে
সেই বীজ ধীরে ধীরে মহীরুহ হওয়ার স্বপ্ন দেখত।
বায়োলজি তখন থেকে আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করল।
বায়োলজির প্রতিটি সূত্র, প্রতিটি অধ্যায়,,
আমার কাছে শুধু তথ্য ছিল না,
এগুলো ছিল প্রাণের ভাষা,
আত্মবিশ্বাসের নিঃশব্দ স্পন্দন।
শিক্ষকেরা আদর করে ডাকতেন “নক্ষত্র”।
অভাবনীয় সাফল্যে স্কুল–কলেজের গণ্ডি পার করলাম।
ফুল মার্কসের ধারাবাহিকতায়
ফলাফলের পাতায় ঝরে পড়ত সফলতার আলো।
কিন্তু হঠাৎ মেডিকেল রেজাল্ট,
একটি সাদা কাগজ,
বারো বছরের সব অর্জনকে
মুহূর্তে সাহারার মরুভূমির মতো উড়িয়ে দিল।
এতদিনের হাসি, আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন,
সব এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল।
দুনিয়াটাকে মনে হচ্ছিল
হেমলকের পেয়ালা ঠোঁটে নিয়ে বেঁচে থাকার মতো।
প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে নিয়ে সংশয়,
নিজের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন।
আমার টানা বারো বছরের টপ ফলাফলের আনন্দ
ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল একটিমাত্র রেজাল্ট শিট,
যেটা আমার কাছে মৃত্যুর ফরমানের মতো ভারী ছিল।
তবু সময় থেমে থাকেনি।
বুকে পাথর বেঁধে, দাঁতে দাঁত চেপে
প্রতিটি পরীক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছি।
মরণ কামড় দিয়েছি প্রতিটি এক্সামের প্রশ্নে।
নিজেকে কুরবান দেওয়ার মতো কঠিন মুহূর্ত পার করেছি।
সব পরীক্ষায় ভালো করেও
মন থেকে মুছতে পারিনি সেই তীক্ষ্ণ ব্যথা।
জাবি, ডেন্টাল, এগ্রি,
সবখানেই টপ পজিশন।
আলহামদুলিল্লাহ!
শেষে ভর্তি হলাম
Biochemistry & Molecular Biology-তে।
কিন্তু মন আটকে ছিল সেই সাদা এপ্রনের স্বপ্নে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম
শুধু ভর্তি আর কাগজপত্রের জটিলতায়!ক্লাসে,বসে থাকলেও
মন পড়ে ছিল হাসপাতালের করিডোরে।
বুঝে গিয়েছিলাম,
এই আকর্ষণ থেকে আমি পালাতে পারব না।
সাদা এপ্রনের তীব্র নেশা
আমাকে ছেড়ে আসতে বাধ্য করেছিল
ভার্সিটির সব জমকালো আয়োজন।
সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে
আবার শুরু করলাম সেকেন্ড টাইমের প্রস্তুতি।
এই সময়টা ছিল
নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাওয়ার গল্প।
প্রতিটি দিন যেত,
আর মনে হতো,
আমি এ যুদ্ধে ক্ষয়ে যাচ্ছি!ব্ল্যাকহলের গহহবরে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি!ন্যানো সেকেন্ড এ মনে হত,
আর লড়তে পারছি না নিজের সাথে!
আমার বইয়ের প্রতিটি পাতা জানে
নিঃশব্দে ঝরে পড়া চোখের জলের শব্দ,
আশা আর হতাশার একাত্ম মেলবন্ধন।
আমার সেকেন্ড টাইমের প্রতিটি দিন আমাকে শিখিয়েছে,
কীভাবে নিঃশব্দে মরতে মরতে
আবার উঠে দাঁড়াতে হয়,
কীভাবে অপমান, ব্যর্থতা, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ—
সব একসাথে বয়ে নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকতে হয়।
অবশেষে এল
মেডিকেল এক্সামের প্রতীক্ষিত দিন।
মাথা ব্ল্যাংক নিয়ে এক্সাম হলে ঢুকে,
তীব্র মাথা ঘোরানো নিয়ে
ঢুলতে ঢুলতে বেরিয়ে এসেছিলাম হল থেকে।
এবং,
আমার রব্ব আমাকে আর ফিরাননি খালি হাতে।
এক্সপেকটেশনের চেয়েও বেশি দান করেছেন।
আলহামদুলিল্লাহ।
বাসার কাছে পড়ার সুযোগ
চান্স পাওয়ার আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সবশেষে আমি কৃতজ্ঞ
আমার শিক্ষকদের বিশ্বাসের কাছে,
আম্মু–আব্বুর নিঃশব্দ ত্যাগ ও দোয়ার কাছে,
আর সব শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক প্রার্থনার কাছে।
সবার কাছে একটাই দোয়া চাই
যে গুরদায়িত্বের জন্য
আমার রব আমাকে মনোনীত করেছেন,
আমি যেন সেই দায়িত্ব
সততা, নিষ্ঠা আর মানবিকতা দিয়ে
ভালোভাবে পালন করতে পারি।
ডাক্তার হওয়া শুধু পেশা নয়
এটা মানুষের কষ্টকে
নিজের শক্তিতে রূপ দেওয়ার
সবচেয়ে বড় আমানত।
এই আমানত যেন আমার রব্ব আমাকে
সম্পূর্ণভাবে পালন করার তাওফিক দেন।
আমীন।
শতামেক — তপস্যার মহাকাব্য
শতামেক-
নিছক শিক্ষায়তন নয়,
এ এক শ্বাসরুদ্ধ হেমাটোলজিক আকাঙ্ক্ষার মহাকাব্য,
নিশীথের নিস্তব্ধতায় নিউরোনাল স্মৃতিতে উৎকীর্ণ
অধ্যবসায়ের অনন্ত উপাখ্যান।
প্রবেশাধিকারে অধিষ্ঠিত কেবল তারাই
যাদের হৃদপিণ্ডে স্পন্দিত অবিচল চৈতন্যের কার্ডিয়াক রিদম,
যাদের দৃষ্টিতে দীপ্ত অম্লান ভিশন,
আর শিরায় সঞ্চারিত দুর্দমনীয় অ্যাড্রেনাল সংকল্প,
যারা বহন করে অনিঃশেষ সাধনার সেরিব্রাল অনলশিখা।
এই করিডোর প্রত্যক্ষ করেছে,
অসংখ্য নিঃশব্দ সারভাইভাল স্ট্রাগলের হিস্ট্রি,
চূর্ণ স্বপ্নের মাল্টিপল ফ্র্যাকচার্ড ইল্যুশন,
ক্লান্ত আত্মার নির্মম সাইকোলজিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন,
যার প্রতিটি পালসে উৎকীর্ণ থাকে
অধ্যবসায়ের ক্লিনিক্যাল ছন্দোলিপি।
মাতৃপ্রার্থনা হয়ে ওঠে ইমিউন শিল্ড,
পিতৃনীরব দৃঢ়তা,এক স্টেবল ভেক্টর অফ সাপোর্ট,
আর আত্মরক্তে রঞ্জিত সাধনা
একটি লাইফলং ওথ অফ সারভাইভাল।
এই ত্রয়ী মিলিয়েই জন্ম নেয়
পরম রিকভারি ও চূড়ান্ত ভিক্টরি
শতামেক—
যার প্রতিটি ইটের উপাখ্যান খোদিত অধ্যবসায়ের অনন্ত প্রতিফলন,
যেখানে রক্তঝরা নিঃশ্বাসও হয়ে ওঠে অনলশিখার অবিনাশী প্রতিধ্বনি।
বিনম্র শ্রদ্ধা সেই সাদা অ্যাপ্রনের নিঃশব্দ বীরদের প্রতি
যারা ক্লান্তি, যন্ত্রণার অন্ধকার এবং নিঃশব্দ ছায়ার মধ্যেও রক্ষা করে অনলশিখার দীপ্তি,
যাদের ধৈর্য, নীরব সাহস এবং করুণ স্পর্শ খোদিত হয় ইতিহাসের অমর মহাপটভূমিতে।
শেষ হোক ক্লান্তি ও নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি,
আর জন্ম হোক এক অনন্ত বিজয়ের অধ্যায়,
যেখানে শতামেকের অনলশিখা অধ্যবসায় এবং
সাদা অ্যাপ্রনের নিঃশব্দ বীরদের তপস্যা মিলিয়ে
রচিত হয় অপার্থিব, অমোঘ, অলিখিত চিরন্তন জয়ের মহাকাব্য।