23/06/2026
শিবলী সাদিক (সরাসরি ইনবক্স থেকে নেওয়া)
"ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন"
নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
— সূরা আল-বাকারা : ১৫৩
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, "আপনি কি নিজেকে সফল মানুষ মনে করেন?"
আমি তখন চুপ করে থাকি! কারণ সত্যি বলতে, সফলতা কাকে বলে আমি আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
তবে আমার জীবনের গল্পটা বলতে পারি...
মালিয়ান দহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দাটা আজও হয়তো আমাকে মনে রেখেছে। ছোট্ট সেই ছেলেটা, যে প্রতিবার পরীক্ষায় প্রথম হতো, তার নাম ছিল শিবলী সাদিক।
খাতায় যখন স্যার ৮০, ৯০ কিংবা ১০০ নম্বর লিখতেন, দূরে দাঁড়িয়ে আমার মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতেন। সেই চোখের পানিতে ছিল গর্ব, ভালোবাসা আর হাজারো দোয়া।
২০০০ সালে ভর্তি হলাম আমলাগাছী বিএম উচ্চ বিদ্যালয়ে। চারপাশে মেধাবী ছাত্রদের প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা। তাদের মাঝেও আল্লাহর রহমতে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলাম।
সার্টিফিকেটটা বাবার হাতে তুলে দিতেই তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
"বাপ, তুই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করলি।"
কিন্তু আমি জানতাম, আমার জীবনের গল্পটা এখানেই অন্যদিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা খুব দ্রুত একটা কঠিন সত্য বুঝে যায়-
স্বপ্নের দাম অনেক, কিন্তু বাস্তবতার দাম আরও বেশি।
কলেজ শেষ হওয়ার পর একদিন বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়ালাম।
গলা কাঁপছিল, কিন্তু সিদ্ধান্ত ছিল দৃঢ়।
আমি বললাম, "আমি আর পড়াশোনা করব না।"
মা কেঁদে ফেললেন। খবর পেয়ে জ্যাঠা, চাচা, গ্রামের মুরুব্বিরা সবাই চলে এলেন। বড় আব্বা শুধু একটা প্রশ্ন করলেন,
"পড়বি না কেন, বাপ?"
আমি সাতটি কারণ বলেছিলাম—
🔰 বাবা ১৯৭২ সালে কলেজ পাশ করেও বেকার।
🔰 মা আমাদের মানুষ করতে নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছেন।
🔰 বোনের বিয়ে দিতে হবে, যৌতুকের জন্য জমি বিক্রি করতে হবে।
🔰 আমি পড়লে বাবাকে আরও জমি বিক্রি করতে হবে।
🔰 দেশে লেখাপড়া শেষ করেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই।
🔰 না পারব শহরে ছোট কাজ করতে, না পারব গ্রামে কৃষিকাজে ফিরতে।
🔰 তাই সিদ্ধান্ত নিলাম—এখনই ঢাকায় গিয়ে কাজ করব।
সব শুনে বড় আব্বা শুধু বললেন, "ছেলের সিদ্ধান্ত খারাপ না।" তারপর উঠে চলে গেলেন।
সেদিন বুঝেছিলাম—
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়া মানে অনেক সময় নিজের কলম ভেঙে পরিবারের জন্য কাস্তে হাতে তুলে নেওয়া। আমিও তাই করেছিলাম।
গ্রামের মাটি পায়ে মেখে, চোখের পানি লুকিয়ে ঢাকার পথে রওনা দিলাম। পকেট প্রায় শূন্য। কিন্তু বুকভরা সাহস। ২০০৫ সাল থেকে শুরু হলো আমার জীবনযুদ্ধ।
তেজগাঁও নাখালপাড়ার একটি পেপসি কোম্পানিতে চার মাস চাকরি করলাম। এরপর পুরান ঢাকার একটি বই প্রকাশনীতে দুই বছর চার মাস কাজ করলাম। একদিন বস বললেন, "টাকা থাকলে বই ছাপাও, না থাকলে গার্মেন্টসে যাও।"
আমি গার্মেন্টসে চলে গেলাম। টেক্সটাইল ডাইং বিভাগে সাত মাস, এরপর কাটিং সেকশনে তিন বছর পাঁচ মাস, পরে আবার ডাইং বিভাগে নতুন দায়িত্ব। সেই সময় প্রাইমারি শিক্ষকদের বেতন ছিল প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। আমার মাসিক আয় ছিল তিন হাজার আটশ থেকে চার হাজার টাকার মতো।
তবুও কখনো লজ্জা লাগেনি। কারণ সেই ঘামের টাকায়—
বোনের বই কেনা হতো,
বাবার জমি রক্ষা পেত,
মায়ের মুখে হাসি ফুটত।
আমি সফলতা বলতে ত্যাগকেই বুঝি।
আল্লাহ সাক্ষী, আমার উপার্জনের টাকা দিয়ে আমি যা করতে পেরেছি—
বাবাকে জমি বিক্রি করতে দিইনি।
মাকে সেলাই আর টিউশনির কষ্ট থেকে মুক্ত করেছি।
বড় বোনের বিয়ে নিজের টাকায় দিয়েছি।
ছোট বোনকে ফিজিক্সে অনার্স পড়িয়ে সরকারি চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেছি।
গ্রামের চাচারা বলতেন, "আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সফল ছেলে শিবলী।" কিন্তু আমি কখনো নিজেকে সফল ভাবিনি। আমি শুধু দেখেছি—
বোনের হাসি,
মায়ের চোখের শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু,
বাবার সম্মান বেঁচে যাওয়া।
আমার কাছে এটাই ছিল সফলতা।
তারপর এলো অমাবস্যার পরীক্ষা, বিয়ের পর জীবন বদলে গেল। একটি সন্তান নিয়ে আমি আমার সব বিশ্বাস, সব ভালোবাসা, সব সঞ্চয় পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম।
তারপর একদিন দেখলাম—
যাদের আপন ভেবেছিলাম, তারা পর হয়ে গেছে।
যাদের ভাই ভেবেছিলাম, তারা শত্রুর মতো আচরণ করছে।
আমার জীবনে নেমে এলো অমাবস্যার কালো অন্ধকার।
ঠিক তখনই আমি মনে করলাম নবীদের জীবনের কথা।
মনে পড়ল আইয়ুব (আ.)-এর ধৈর্যের কথা।
মনে পড়ল ইব্রাহিম (আ.)-এর তাওয়াক্কুলের কথা।
মনে পড়ল সেই আয়াত—
"হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল"
আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।
— সূরা আলে ইমরান : ১৭৩
আরও মনে পড়ল—
"নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদের ক্ষতি দ্বারা; আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।"
— সূরা আল-বাকারা : ১৫৫
আমি সিজদায় পড়ে গেলাম! কাঁদলাম।
তারপর নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিলাম।
জীবনের মাঝপথে আবার ঢাকায় ফিরলাম।
এবার নিজের জন্য নয়, আমার ছেলেটাকে মানুষ করার জন্য। এটাও এক যুদ্ধ, কবে শেষ হবে জানি না আল্লাহই ভালো জানেন। তবে জীবন আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—
যে পরিস্থিতিই আসুক; ধৈর্য ধরতে হবে, হতাশ হওয়া যাবে না, আর সবসময় শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
কারণ আমার রব বলেছেন—
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।"
— সূরা ইনশিরাহ : ৬
আমি জানি না সফলতা কাকে বলে। আমার স্বপ্ন ছিল—
বোনদের প্রতিষ্ঠিত করা,
বাবার সম্মান বাঁচানো,
মায়ের চোখের পানি মুছে দেওয়া।
আল্লাহ আমার সেই স্বপ্নগুলো কবুল করেছেন।
আজও পরীক্ষা চলছে। আমি তা মেনে নিয়েছি। কারণ কুরআন বুঝে পড়লে একটা সত্য স্পষ্ট হয়—
সুখ-শান্তি টাকায় পাওয়া যায় না।
সুখ-শান্তি পাওয়া যায় সিজদায়।
আজও আমার চোখে ভেসে ওঠে—
সূরা আল-আনফাল : ৩০
সূরা আলে ইমরান : ৫৪
কারণ মানুষ পরিকল্পনা করে, কিন্তু শেষ পরিকল্পনাটা আল্লাহই করেন।
আমি আজও বেঁচে আছি।
যতদিন হায়াত আছে, ততদিন লড়ব, ধৈর্য ধরব, শুকরিয়া আদায় করব আর প্রতিদিন দোয়া করব—
"রব্বি হাবলী মিনাস সালিহীন"
হে আমার রব, আমাকে নেক সন্তান দান করুন।
— সূরা আস-সাফফাত : ১০০
হে আল্লাহ, আমাকে সেই ধৈর্যশীলদের দলে রাখুন, যাদের সম্পর্কে তুমি বলেছ—
"ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন"
নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
— সূরা আল-বাকারা : ১৫৩
আমার চোখের পানি তোমার আমানত, হে রব।
তুমি ছাড়া কেউ তা মুছে দিতে পারবে না।
তুমি ছাড়া কেউ আমার গল্প পুরোটা বুঝবে না।
আল্লাহ, তুমি কবুল করো। আমিন।
অভিনন্দন ও গভীর শ্রদ্ধা, Shibli Sadik ভাই।
Amlagachhi BM High School Alumni Network -এর পক্ষ থেকে আপনার জীবনসংগ্রাম, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ, ধৈর্য এবং পরিবারের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে জানাই আন্তরিক সম্মান ও শুভেচ্ছা।
কুঁড়ে ঘর থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা এখনো শেষ হয়নি। লড়াই চলছে, পরীক্ষা চলছে, কিন্তু ধৈর্য, বিশ্বাস এবং আত্মত্যাগের প্রদীপ এখনো সমানভাবে জ্বলছে।
এই গল্প শুধু শিবলী সাদিকের ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি হাজারো মধ্যবিত্ত সন্তানের প্রতিচ্ছবি, যারা নিজের স্বপ্নকে কিছুটা পিছিয়ে রেখে পরিবারের স্বপ্ন, সম্মান এবং ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আপনার এই সংগ্রামী পথচলা আমাদের শিখিয়ে দেয়—সফলতা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের নাম নয়, কখনো কখনো প্রিয় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর নামও সফলতা।
আপনার এই অসাধারণ ত্যাগ ও অধ্যবসায়কে জানাই বিনম্র সালাম। আপনার গল্প আমাদের কমিউনিটির জন্য আজ অনুপ্রেরণা, আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা। ❤