27/12/2024
শীতের সকালের মক্তব: স্মৃতির সরল রঙিন অধ্যায়
শীতের সকাল মানেই ছিল আমাদের ছোটবেলার মক্তবের দিনগুলো। কুয়াশায় ঢাকা গ্রাম, হিমেল হাওয়া আর ঘাসে জমে থাকা শিশিরের মাঝেই শুরু হতো আমাদের মক্তবের যাত্রা। মায়ের কড়া ধমকে ঘুম ভেঙে যেত। ঘুম-জড়ানো চোখে আলগা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে উঠোনে বের হলে শরীরে ঠান্ডার শিহরণ খেলে যেত। মা কখনো মাটির চুলায় গরম দুধ বানিয়ে দিতেন, আর কখনো হাতে তুলে দিতেন গাছ থেকে নামানো খেজুরের রস।
মক্তবে যাওয়ার জন্য সবাই একসাথে পথে নামতাম। গায়ের পুরোনো চাদর জড়িয়ে, হাতে কাঠি বা বাঁশের ছোট লাঠি নিয়ে দল বেঁধে চলতাম। কুয়াশার ভেতর দিয়ে পথ চলা ছিল অন্যরকম এক রোমাঞ্চ। কখনো পথে দেখা হতো রাখালের গরুর পাল, কখনো বা জলে ভেজা গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের ঝিকিমিকি।
মক্তবের উঠানে পৌঁছানোর পর এক নতুন দৃশ্য খুলে যেত। মাটির মেঝেতে পাতা পুরোনো চট বা বস্তার ওপর বসতাম আমরা। হাতে থাকত পাতলা স্লেট আর বাঁশের কলম। শিক্ষক মশাই সুরেলা কণ্ঠে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত শুরু করতেন। আমরা সবাই তাকে অনুসরণ করতাম। মক্তবের পরিবেশ ছিল নিঃশব্দ কিন্তু পূর্ণ ভক্তি ও মনোযোগে ভরা। মাঝে মাঝে শিক্ষক মশাই কোনো আয়াতের অর্থ বোঝাতেন, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
শীতের সকালের সেই মক্তবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল বিরতির সময়। মক্তবের পাশে কোনো গাছের নিচে সবাই মিলে বসে খেজুরের রস কিংবা পিঠা খেতাম। কেউ নিয়ে আসত খোলাজালি পিঠা, কেউবা নারকেল দিয়ে ভরা পুলি। সেই আনন্দ যেন এক সহজ, নির্ভেজাল সুখ।
আজকের দিনে সেই মক্তব আর নেই। ইট-পাথরের আধুনিক বিদ্যালয় এসেছে, কিন্তু মক্তবের সেই সরলতা আর ঐতিহ্য যেন হারিয়ে গেছে। ছোট ছোট গ্রামীণ ছেলেমেয়েরা আর মক্তবের উঠানে বসে তেলাওয়াত শেখে না।
তবু মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাই যখন ভাবি—কুয়াশার চাদরে মোড়া সেই শীতের সকালের মক্তবের স্মৃতিগুলো এখনো হৃদয়ের গভীরে গাঁথা। হয়তো জীবন অনেক বদলেছে, কিন্তু মক্তবের সেই দিনগুলো আজও আমার কাছে এক টুকরো শান্তির আশ্রয়।
#জাহিদ_ওসমান