07/10/2026
অধ্যায় ৯
যদি আবার পড়ে যাও?
তুমি ফিরে এসেছ।
কয়েকদিন নিয়মিত নামাজও পড়েছ, কুরআন খুলে অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছ, চোখের পানি ফেলে তাওবা করেছ। নিজেকে পরম বিশ্বাসে কথা দিয়েছিলে—
“এবার থেকে আমি আর পুরোনো পঙ্কিল জীবনে ফিরব না, যেকোনো মূল্যে ভালো হয়ে যাব!”
কিন্তু হঠাৎ কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে, মনের এক সামান্য দুর্বলতায়—তুমি আবার সেই পুরোনো গুনাহেই আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে!
তারপর?
হয়তো তোমার ভেতরটা এক নিমেষেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। বুক চিরে আক্ষেপ বের হয়ে আসবে—
“আমি আবারও হেরে গেলাম!”
“আমি তো রবের কাছে শক্ত ওয়াদা করেছিলাম, আর কখনো ভুল করব না!”
“আমার সেই কান্নার তাওবা কি তবে কোনো কাজেই আসল না?”
আর শয়তান ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে তোমার কানে সবচেয়ে বিষাক্ত কথাটা ফিসফিসিয়ে বলবে—
“দেখলি তো, তোকে দিয়ে আর হবে না! তুই তো ভণ্ড, তোর তাওবা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার নয়!”
না!
দয়া করে এই জায়গাটিতে এসে থেমে যেও না।
কারণ, মাঝপথে একবার বা বারবার পড়ে যাওয়াটা তোমার চরম পরাজয়ের শেষ প্রমাণ নয়। বরং পড়ে যাওয়ার পর আর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা না করাটাই হতে পারে তোমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর বিপর্যয়।
একটা ছোট শিশু যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, সে কতবার ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়! কখনো কি দেখেছ, পড়ে গিয়ে সে মাটিতে শুয়ে ভেবেছে—
“আমি আর কোনোদিন হাঁটার চেষ্টা করব না”?
না।
সে কান্নাকাটি করে, আবার কোনো কিছুর ভরসা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, আবার চেষ্টা করে, আবার পড়ে। আর এভাবেই একদিন সে শক্ত পায়ে হাঁটতে শেখে।
তুমিও আত্মিক জীবনের সেই পথিক।
তুমি দুর্বল হয়ে পড়েছ—কিন্তু তাই বলে কি রবের দিকে ফেরার পথ ছেড়ে দূরে পালিয়ে যাবে?
তাওবা ভেঙে গেছে বলে কি তাওবার দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে?
কখনো নয়।
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২২২
একটু গভীরভাবে খেয়াল করো—
তিনি শুধু তাঁদের ভালোবাসার কথা বলেননি, যারা জীবনে কখনো কোনো ভুল করেনি।
তিনি ভালোবাসেন “তাওবাকারীদের”—যারা ভুলের পর ফিরে আসে, নিজের পাপ স্বীকার করে এবং সংশোধনের চেষ্টা করে।
তাই তুমি যদি আজ আবার পড়ে গিয়ে থাকো—
আজই আবার ফিরে এসো।
আজই ভুল হয়ে থাকলে, এখনই ওযু করে সিজদায় লুটিয়ে তাওবা করো। নিজেকে ভুলেও বলো না—
“কাল থেকে নতুন করে ঠিক হয়ে যাব!”
কারণ শয়তানের একটি ফাঁদ হলো—গুনাহের পর মানুষকে হতাশ করে দেওয়া। সে চায়, ভুল করার পর তুমি যেন বিশ্বাস করে ফেলো—
“আমার আর কোনো ক্ষমা নেই!”
কখনো শয়তানের এই প্রবঞ্চনাকে বিশ্বাস কোরো না।
অবশ্যই গুনাহকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেবে না। পাপকে ভয় করবে, নিজের অন্তরের দুর্বলতার জায়গাগুলোকে চেনার চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি আবার পড়ে যাও—
আবার উঠবে।
আবার ওযু করবে।
আবার জায়নামাজে দাঁড়াবে।
আবার রবের কাছে ক্ষমা চাইবে।
আর আবার জীবনকে শুধরে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে।
হয়তো তুমি হতাশ হয়ে ভাবছ—
“আমি তো একই গুনাহ বারবার করছি, আমার তাওবার কি কোনো দাম আছে?”
শোনো, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমন এক বান্দার কথা জানিয়েছেন, যে গুনাহ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছে; আবার গুনাহ করেছে, আবার ক্ষমা চেয়েছে। আল্লাহ তার বান্দার এই স্বীকৃতি ও ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি উল্লেখ করে তাকে ক্ষমা করেছেন। এই ঘটনা একবার নয়, পুনরাবৃত্তির সঙ্গেও বর্ণিত হয়েছে।
— সহিহ মুসলিম, ২৭৫৮
এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ ইচ্ছা করে গুনাহ করতে থাকবে আর তাওবার ওপর নির্ভর করবে।
বরং এর শিক্ষা হলো—
সত্যিকারের তাওবা করে কেউ যদি দুর্বল হয়ে আবার পড়ে যায়, তাহলে সে যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়; আবার ফিরে আসে।
তাই এবার শুধু মুখে তাওবা করেই দায়িত্ব শেষ কোরো না। নির্জনে বসে নিজেকে শক্ত প্রশ্নগুলো করো—
“আমি আসলে বারবার কোথায় আর কখন দুর্বল হয়ে পড়ছি?”
“কোন পরিবেশে বা কোন সঙ্গীদের সাথে থাকলে আমার পাপের ইচ্ছা জাগে?”
“মোবাইলের কোন অ্যাপ বা গোপন কোন অভ্যাসের কারণে আমি বারবার হোঁচট খাচ্ছি?”
গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরালেই সবসময় যথেষ্ট হয় না; কখনো কখনো জীবনের অভ্যাস ও পরিবেশের পথটাও বদলাতে হয়।
যে খোলা দরজা দিয়ে বারবার গুনাহ তোমার জীবনে প্রবেশ করছে, সেই দরজাটা বন্ধ করতে হবে।
যে পরিবেশ তোমাকে পাপের দিকে টানে, সেখান থেকে দূরে সরে যেতে হবে।
যে অভ্যাস তোমাকে দুর্বল করে, সেটাকে বদলাতে হবে।
আর সবচেয়ে বেশি যা দরকার—
আল্লাহর সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা আরও গভীর করতে হবে।
কারণ তুমি শুধু ভয় পেয়ে গুনাহ ছাড়তে চাও না।
তুমি এমন একজন মানুষ হতে চাও—যে তার রবকে সত্যিই অন্তর দিয়ে ভালোবাসে।
তাই যদি আবারও কখনো পড়ে যাও—
নিজের অস্তিত্বকে ঘৃণা করে একা বসে থেকো না।
নিজের গুনাহকে ঘৃণা করো, আর তোমার রবের দিকে ফিরে এসো।
আজ হয়তো অনুশোচনায় চোখে পানি নেই।
আজ হয়তো মনটা খুব ক্লান্ত ও দুর্বল।
ভেতরে হয়তো তীব্র লড়াই চলছে।
তবুও তুমি ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াও!
কারণ তোমার জীবনের গল্পের শেষ অধ্যায়টা কোনো একটি পড়ে যাওয়ার মাধ্যমে লিখে ফেলা হয়নি।
তুমি পড়ে গেছ—
কিন্তু তুমি এখনও শেষ হয়ে যাওনি!
আজই আবার নতুন করে ফিরে এসো।
আবার পথচলা শুরু করো।
তবে এবার আগের চেয়ে আরও বেশি সতর্কতা নিয়ে।
হয়তো একদিন অনেক দূরে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখবে—
যে পাপাচারটা একসময় তোমাকে বারবার মাটিতে আছড়ে ফেলত, আজ তুমি রবের রহমতে তার চেয়ে বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছ।
তখন বুঝতে পারবে—
পড়ে যাওয়ার পর হেরে না গিয়ে “আবার উঠে দাঁড়ানোর” সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই ছিল তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্তগুলোর একটি।