28/05/2025
বাংলা চিত্রকলার ইতিহাসে এক দীপ্তিমান নাম—শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। যিনি কেবল এক জন চিত্রশিল্পী নন, বরং ছিলেন এক দুর্দান্ত সৃষ্টিশীল দূরদ্রষ্টা, যার হাতে রচিত হয়েছিল আধুনিক বাংলার শিল্পচেতনার ভিত।
জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর, তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার কেন্দুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা তমিজউদ্দিন আহমদ ছিলেন পুলিশ বিভাগে কর্মরত, আর মাতা জয়নাবুন্নেছা ছিলেন এক নিঃশব্দ অনুপ্রেরণার প্রতীক—এক গৃহিণী, যিনি সন্তানের প্রতিভাকে চিনতে পেরেছিলেন সময়ের আগেই। নয় ভাইবোনের সংসারে জয়নুল ছিলেন সবার বড়, আর ছোটবেলা থেকেই তিনি আঁকাআঁকিতে মগ্ন থাকতেন, যেন রঙ-তুলি ছিল তাঁর স্বপ্নের ভাষা।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে যান, শুধু গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। তাঁর মা, শিল্পের প্রতি ছেলের অগাধ ভালোবাসা দেখে নিজের গলার সোনার হার বিক্রি করে তাঁকে ভর্তি করান সেই আর্ট স্কুলে। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেন জয়নুল। ১৯৩৮ সালে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেবছরই নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।
বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষচিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে। তাঁর আঁকা দুর্ভিক্ষের দৃশ্যপট যেন হয়ে ওঠে এক নির্মম সময়ের জীবন্ত সাক্ষ্য—যেখানে মানুষ আর মানবতা মিশে গেছে কষ্টের রেখায়।
ভারত বিভাজনের পর পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে তিনি উপলব্ধি করেন, এই ভূখণ্ডে চিত্রশিল্পের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোডে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের একটি জীর্ণ কক্ষে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট’। পরবর্তীকালে সেটিই রূপ নেয় আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। তিনি ছিলেন এর প্রথম অধ্যক্ষ এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি তিনি লোকশিল্পের রক্ষক হিসেবেও ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর প্রচেষ্টায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘লোকশিল্প জাদুঘর’ এবং ময়মনসিংহে গড়ে ওঠে ‘জয়নুল সংগ্রহশালা’। জীবদ্দশায় তিনি তিন হাজারেরও বেশি চিত্রকর্ম এঁকেছেন বলে অনুমান করা হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে—সংগ্রাম (১৯৫৯), বীর মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১) এবং ম্যাডোনা (১৯৭১)। এ ছাড়া তাঁর আঁকা দীর্ঘ স্ক্রলচিত্র নবান্ন (১৯৬৯) ও মনপুরা-৭০ (১৯৭৪) শিল্পানুরাগীদের মধ্যে আজও প্রশংসিত।
তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৮ সালে পান পাকিস্তান সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’। ১৯৬৮ সালে ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্ররা তাঁকে ‘শিল্পাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেয় ‘জাতীয় অধ্যাপক’-এর মর্যাদা।
এই গুণী শিল্পী ১৯৭৬ সালের ২৮ মে ঢাকায় পরলোকগমন করেন। তাঁকে সমাহিত করা হয় চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে। যেন শিল্প ও সাহিত্যের দুটি দীপ্ত তারকা পাশাপাশি বিশ্রাম নিচ্ছেন এই বাংলার মাটিতে।